তুমি আসবে বলে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক ছোট্ট গ্রাম কৃষ্ণনগর। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাশফুলের গন্ধ, গাছে গাছে বসন্তের মৃদু হাওয়া, আর গলির মোড়ে বাজছে ঢাকের উৎসবমূলক তাল। এই গ্রামে বছর খানেক আগে থেকে শুরু হয় দুর্গাপূজা। গ্রামের প্রতিটি পরিবার হাতে হাতে লাল, হলুদ আর সাদা ফুল সাজিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকে পড়ে উৎসবের আমেজে।

কিন্তু সেই উৎসবের মধ্যেও কেউ কেউ থাকে একটু নীরব, একটু গভীর চিন্তায়। দেবযানী তার মধ্যে অন্যতম। আজকের দিনটা তার কাছে বিশেষ, কারণ এই দিনেই চার বছর আগে সে প্রথম দেখেছিল অনির্বাণকে।

প্যান্ডেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের নিচে বসে আছে সে, তার চোখ ভরা স্মৃতিতে। চার বছর আগের সেই পুজোর কথা মনে পড়ছে বারবার।

“দেব, তুমি আসবে তো আগামী বছর?” অনির্বাণের সেই প্রশ্ন আজও গর্জে ওঠে তার মনে। তখন তারা পুজোর বর্ণিলতা উপেক্ষা করে নদীর ধারে বসে ছিল, দুজনেই হাতে হাতে কফির কাপ।

অনির্বাণ ছিল ঢাকার এক তরুণ, তখন কানাডায় পড়াশোনা শুরু করার আগে গ্রামের একটা ছেলে। সে তখন বেশ আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক চিন্তার আর স্বপ্নের মালিক। আর দেবযানী? গ্রামের এক মেধাবী মেয়ে, ছোট্ট স্কুলে শিক্ষকতা করে আর রাতে পড়াশোনা করে স্নাতক করার স্বপ্ন দেখে।

“আমি আসব,” অনির্বাণ বলেছিল, “তোমার জন্য, তোমার অপেক্ষায়।”

তারপর শুরু হয়েছিল দীর্ঘ বিচ্ছেদের পালা।

অনির্বাণ চলে গিয়েছিল কানাডায় পড়াশোনা করতে। প্রথম বছর ফিরে এসেছিল মেসেজ পাঠিয়ে, ভিডিও কলে কথা বলে।
“তুমি ভালো আছো তো? আমি খুবই ব্যস্ত, কিন্তু আগামী পূজায় আসব।”

দেবযানী অপেক্ষা করেছিল। অপেক্ষার মতো কোনো শিক্ষা পায়নি সে আগে। প্রতিদিন সকাল হোক বা রাত, তার চোখ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেন সেই মুহূর্তটি এসে যায়।

দ্বিতীয় বছর, আবার মেসেজ,
“কানাডায় চাকরি পেয়েছি, একটু সময় লাগবে। আশা করছি শীঘ্রই আসব।”

কিন্তু তৃতীয় বছর থেকে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফোনে রিসিভ হয় না, মেসেজে সাড়া আসে না।
গ্রামের কেউ কেউ বলতো, ছেলেটি হয়তো ভুলে গেছে। কেউ আবার বলতো, বিদেশের মাটিতে সবাই হয়তো বদলে যায়।

কিন্তু দেবযানীর মনে কোনো কাঁটাচামচ লাগেনি।
“যে ভালোবাসা সত্য, সে কখনো মরেই না,” বলতো সে নিজেকে।

বাজার থেকে কাশফুলের মালা কিনে এসে দেবযানী বসেছিল প্যান্ডেলের পাশে সেই পুরনো অশ্বত্থ গাছের নিচে। চারপাশে উৎসবের গান, হাসি, আলো—সব কিছু যেন হারিয়ে গেছে তার চোখের সামনে। সে শুধু অপেক্ষা করছিলো।

“অনির্বাণ, তুমি আসবে তো?” ভেতরে ভেতরে কাঁদছিলো সে।

দেবযানীর বাবা আর মা একটু চিন্তিত হয়ে বলছিলেন,
“বাবা, মেয়েটা একটু বেশি অপেক্ষায় পড়ে যাচ্ছে। ওর বিয়ে করা দরকার,” মা বলল কাঁপতে কাঁপতে।

“তাই তো ভাবছি, মেয়ের জন্য বিয়ের কথাবার্তা শুরু করি,” বাবা বলল।

দেবযানী হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
“আমি তার জন্য অপেক্ষা করব! যতদিন হোক, যতদিন আমি বাঁচব!”

তার এই অটল দৃঢ়তা শুনে সবাই স্তম্ভিত।

সন্ধ্যা নামল। প্যান্ডেলে আলো ঝলমল করছিলো, আর ঢাকের গুঞ্জন ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
তখনই পেছন থেকে এক কাঁপানো কণ্ঠ শুনতে পেলো দেবযানী—
“দেবযানী...”

ফিরে তাকালো, অবিশ্বাসে চোখ বড় হয়ে গেলো তার।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অনির্বাণ—কানাডা থেকে ফিরে, হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে। তার চোখে দুঃখ, তার মুখে আফসোস।

দেবযানীর চোখে অশ্রু জমে গেল।
“তুমি... তুমি আসছ?”

অনির্বাণ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো,
“আমি অনেকদিন তোমার কাছে আসতে চেয়েছি। কিন্তু সুযোগ ছিল না। কানাডার বেকারত্ব, চাকরির ঝামেলা, সব মিলে ছুটছিলো না। তবু তোমার কথা ভোলা যায়নি কখনো। আজ ফিরে এসেছি, আর তুমি না বললে যাবো না।”

দেবযানীর মুখে এক মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটল।
“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি, অনির্বাণ। বিশ্বাস করো, এই ভালোবাসা চিরন্তন।”

প্যান্ডেলের আলো আর আশেপাশের উৎসবের গুঞ্জনের মাঝে দু’জন একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। যেনো চার বছর দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্ত ক্লান্তি, দূরত্ব এক মুহূর্তে মুছে গেল।

রাতের আকাশে চাঁদ হেসে উঠল, আর সেই চাঁদের আলোয় যেনো নতুন ভালোবাসার সূচনা হলো কৃষ্ণনগরের ছোট্ট গ্রামে।


সমাপ্ত........................................
53 Views
7 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: