হিজল বনের রূপকন্যা

মহির উদ্দিন ছিল গ্রামের এক গরিব চাষা। তার একমাত্র মেয়ে চাঁদনী ছিল খুবই কৌতূহলী ও সাহসী। মায়ের মৃত্যু ছোটবেলায়, বাবা মেয়েকে মানুষ করেছেন গল্প শুনিয়ে, পরী-রাক্ষস-নদী আর পাহাড়ের গল্পে।

একদিন সন্ধ্যাবেলা, গ্রামের পুকুরপাড়ে বসে চাঁদনী শুনল দুই বৃদ্ধা কথা বলছে—

— “বুড়ি, জানিস হিজল বনের ভেতরে নাকি এক রূপকন্যা থাকে, যার কান্নায় বৃষ্টি নামে!”
— “আর যদি কেউ তার দুঃখ ঘোচাতে পারে, তাহলে সে পায় এক অলৌকিক বর!”

চাঁদনীর চোখ চকচক করে উঠল।
— “আমি যাব হিজল বনে! আমি রূপকন্যার দুঃখ বুঝব।”


---

হিজল বনের ভিতর

পরদিন ভোরে, কেউ না জানিয়ে, চাঁদনী হাঁটা দিল হিজল বনের দিকে। ভেতরে ঢুকতেই আশ্চর্য সব ব্যাপার—
বনের পাখিরা গান গাইছে অচেনা ভাষায়, বাতাসে গন্ধ গোলাপ ফুলের মতো অথচ গাছে ফুল নেই!
আর হঠাৎই… সব নীরব হয়ে গেল।

একটা গাছের গোড়ায় বসে কাঁদছিল এক রূপকন্যা। মাথায় হিজল পাতার মুকুট, চোখে অশ্রু, গায়ে হালকা নীল আলোর ঝলকানি।

চাঁদনী সাহস করে জিজ্ঞেস করল—
— “আপনি কে?”

রূপকন্যা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি হিজল বনের রক্ষাকন্যা। বহু বছর আগে এক লোভী রাজা বনের প্রাণ ধ্বংস করেছিল। সেই দুঃখে বন আমাকে শাপ দেয়—যদি কেউ নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে আমাকে সাহায্য করে, তবেই আমি মুক্ত হবো।”

চাঁদনী চুপচাপ বলল,
— “আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?”

রূপকন্যা একটুখানি হাসলেন।
— “তোমাকে বনের গহীনে গিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে এক ‘জীবনফুল’। সেটা একটিমাত্র রাতে ফোটে, আর একটাই থাকে। কেউ একে পেলে সে চিরজীবী হয়, তবে যদি সেটা আমার কাছে এনে দাও, আমি মুক্ত হব। আর তুমি হারাবে তোমার সমস্ত ভবিষ্যৎ চাওয়া-পাওয়া।”

চাঁদনী ভাবল। একটু ভয় পেল। কিন্তু শেষে বলল,
— “আমি যাব।”


---

জীবনফুলের খোঁজ

চাঁদনী গভীর জঙ্গলে ঢুকল। রাত গভীর হতেই এক জায়গায় দেখল—চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে একটা সাদা ফুল। কিন্তু চারপাশে ফোঁস ফোঁস শব্দ…
এক বিশাল সাপ, বনরক্ষক, গর্জে উঠল—
— “তুমি কি এই ফুল চাও?”

চাঁদনী মাথা নোয়াল—
— “হ্যাঁ, রূপকন্যার জন্য।”

সাপ চুপ করে রইল। তারপর বলে উঠল—
— “নিজের জন্য কিছু চাইলে, এই ফুল তোমার জীবন বদলে দেবে।
কিন্তু তুমি তাকে দিলে, তুমি নিজের ভাগ্য হারাবে।”

চাঁদনী বলল—
— “আমি কথা দিয়েছি। আমি কাউকে দুঃখী রেখে সুখী হতে পারি না।”

সাপ নরম স্বরে বলল—
— “তাহলে নাও, এবং জেনে রেখো, যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসে, প্রকৃতি তার পাশে থাকে।”


---

শেষ পরিণতি

চাঁদনী ফুল নিয়ে ফিরে এল। রূপকন্যা ফুল হাতে নিয়ে কেঁদে ফেলল। হিজল গাছগুলো একে একে নেচে উঠল বাতাসে, আলোয় ভরে গেল পুরো বন।
রূপকন্যা মুক্ত হলেন শাপ থেকে। তখন তিনি বললেন,
— “চাঁদনী, তুমি শুধু আমাকে নয়, বনকেও বাঁচালে। এই হিজল বন এখন থেকে তোমার নামে পরিচিত হবে—চাঁদনী বন।”

আর আশ্চর্যের কথা, চাঁদনী হারাল না কিছুই। বরং তার হৃদয়ের শক্তি আর ভালোবাসা বনকে আশীর্বাদ করল। সেই দিন থেকে গুপ্তিপুরের কোনো মানুষ আর গরিব থাকল না। বন আর মানুষ একসাথে থাকল—ভালোবাসা আর সুরে।
100 Views
11 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(1)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (1)

Reader photo
মাহির রওশন
25-Jul-2025, 06:56 PM

খুব ভালো লাগলো। 😊😊