শেষ সিজদা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
ঢাকার এক গলি রাস্তার মোড় ঘেঁষে একটা ছোট্ট মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত আজান হয়, কিন্তু জামাতে মানুষ হয় হাতে গোনা। শহরের ব্যস্ততার ভিড়ে এই মসজিদটা যেন নিরবতা আর অশ্রুর একটি ছোট্ট আশ্রয়। এখানেই থাকতেন একজন বৃদ্ধ, নাম তার হাফেজ কাসেম। বয়স হবে প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই, কিন্তু মুখে একরাশ প্রশান্তি। তার কাজ একটাই—মসজিদের ঝাড়ু দেয়া, পানি দেয়া, আজান দেয়া আর নামাজের সময় সবাইকে ডেকে আনা।
বছরের পর বছর মসজিদকে ঘিরেই তার জীবন কেটে যাচ্ছে। কেউ জানে না তার কোনো আত্মীয় আছে কিনা, কেউ কখনো জানতে চায়ওনি। কিন্তু হাফেজ কাসেম জানতেন—আল্লাহ ছাড়া তার আর কেউ নেই।
একদিন বিকেলে, যখন আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে অদ্ভুত একটা ঠান্ডা ভাব, হাফেজ কাসেম মসজিদের জানালার পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হঠাৎ করেই পাশের চায়ের দোকান থেকে কয়েকটা ছেলে এসে ডাক দিল—
— “হুজুর, খেলতে যাবেন? একটানা কোরআন পড়লে তো মন বুজে যায় না! একটু হাঁটাহাঁটি করেন!”
হাফেজ কাসেম হেসে বললেন—
— “বেটা, একদিন এই কোরআনই আমাদের সব হিসাব দিবে। এখন না বুঝলেও একদিন বুঝবে ইনশাআল্লাহ।”
ছেলেরা হাসাহাসি করে চলে গেল। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নাম রাকিব। নতুন এসএসসি পাশ করা একটা ছেলেমানুষ। বাবার ব্যবসায় সাহায্য করে। সে ধীরে ধীরে হাফেজ কাসেমের কাছে গিয়ে বসে পড়ল।
— “হুজুর, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
— “হ, করো বাবা।”
— “আপনার কোনো স্বজন নাই?”
— “আছে তো! আল্লাহ। তুমি কি মনে করো মানুষ ছাড়া কেউ আপন হতে পারে না?”
রাকিব স্তব্ধ হয়ে গেল। এই একটা বাক্য যেন তার ভিতরে ঢুকে গিয়ে অনেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।
এরপর থেকে রাকিব প্রায়ই হাফেজ কাসেমের কাছে বসত। কোরআনের আয়াত শুনত, নামাজ শিখত, ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন করত। হাফেজ কাসেম ছিলেন একান্ত ধৈর্যশীল শিক্ষক। কখনো রাগ করতেন না, শুধু বলতেন— “জানার চেষ্টা করো, তবেই পথ খুলে যাবে।”
একদিন রাতে এশার নামাজের পর হাফেজ কাসেম হঠাৎ বললেন—
— “বাবা রাকিব, যদি কখনো আমি থাকি না, এই মসজিদটা দেখা শোনা করবে?”
রাকিব একটু অবাক হয়ে বলল—
— “হুজুর, এমন কথা বলেন না। আপনি তো এখনো অনেক ফুরফুরে।”
— “না রে, সময় যখন আসে, তখন শরীরের খবর শরীরই দেয়।”
পরদিন ফজরের আজান হয় না। মসজিদ অন্ধকার, তালা লাগানো নয়, কিন্তু ভেতরে নিরবতা। স্থানীয় একজন মুসল্লি গিয়ে দেখে, সিজদারত অবস্থায় পড়ে আছেন হাফেজ কাসেম। মুখে হালকা হাসি, চোখ বন্ধ, কপাল মাটিতে লেগে আছে। এমন দৃশ্য দেখে সেই মুসল্লি কান্না ধরে রাখতে পারল না। ডাকাডাকি শুরু হলো। সবাই ছুটে এলো।
হাফেজ কাসেম ইন্তেকাল করেছেন।
সিজদায় থাকা অবস্থায়, হয়তো দোয়া করতে করতে, কিংবা কোনো আয়াত পাঠ করতে করতে।
রাকিব সে দৃশ্য দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। লোকজন যখন প্রশ্ন করল—
— “তুমি কি উনার আত্মীয়?”
রাকিব বলল—
— “আমি উনার ছাত্র। আমি এখন থেকে এই মসজিদ দেখব। উনি আমার জীবনের পথ বদলে দিয়েছেন।”
সমাপ্তি।
77
Views
11
Likes
0
Comments
5.0
Rating