তবুও তোমার থাকি

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
নদীটা বদলায় না।নদীটা ঠিক আগের মতোই আছে।
পাড়ে পুরনো সেই আমগাছটা, ডালে ঝুলে থাকা হাওয়া-ছোঁয়া পাতারা, আর গাছের নিচে সেই কাঠের বেঞ্চটা—যেটাতে বসে রেইনা আজও প্রতিদিন অপেক্ষা করে।
বর্ষা আসে, নদী ফুলে ওঠে—তবুও নদীর ধার ঠিক একইরকম থাকে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছ, ডালের নিচে কাঠের বেঞ্চটা, আর নদীর পাড়ের ঘাসগুলোর ভিজে গন্ধ—এগুলো যেন রেইনার হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।

আজও সে বসে আছে সেই বেঞ্চে।
হাতে পুরনো এক ডায়েরি, পাতাগুলো কেমন হলুদ, কোনোটায় কফির দাগ, কোনোটায় জলের ছিটে—আর প্রতিটি পাতায় লেখা আছে ইহানকে উদ্দেশ্য করে কিছু না কিছু কথা।

আজ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে ইহানের চলে যাওয়ার।
তারা কেউ কাউকে বিদায় জানায়নি।
শেষ দেখা হয়েছিল ঠিক এই নদীর পাড়ে। তখন ইহান তার হাত ধরে বলেছিল—
"যদি একদিন হঠাৎ করে চলে যাই, অপেক্ষা করবে?
রেইনা তখন হাসতে হাসতে বলেছিল—
"তুমি পাগল? এইসব সিনেমার সংলাপ বলো কেন?"

কিন্তু ইহানের চোখ তখন জ্বলছিল ভয়ের ছায়ায়।
সেই দিনের পরে ইহান আর ফিরেনি। না ফোন, না মেসেজ, না কোনো খোঁজ।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল ইহান অভিমান করে দূরে গেছে।
তারপর যখন এক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, তখন মানুষ বলতে শুরু করে—
"তোমার ইহান তো চলে গেছে অন্য মেয়ের সঙ্গে!"
"হারিয়ে গেলে কি কেউ আর ফিরে আসে?"

রেইনা চুপ করে ছিল।
সে কারও চোখে জল দেখায়নি, হাসি লুকায়নি, ব্যথা ভাগ করেনি।
সে শুধু প্রতিদিন বিকেলে আসে এই নদীর পাড়ে, বসে, ডায়েরি খুলে লেখে।

আজকের পাতায় লেখা ছিল—
প্রতিদিন বিকেলে রেইনা একখানা ডায়েরি খুলে বসে। সেখানে সে লেখে—
আজকের অনুভূতি, নদীর রঙ, হাওয়া কেমন ছিল, আর… ইহানকে সে কতটা মিস করে।আর রেইনা গুন গুন করে গান গাইছে ----
"হেটেছি স্বপ্নের হাত ধরে"
পেরিয়ে রাত একাকি ভোরে।
"ডেকেছি কত বার নাম ধরে"
"যে তোমায় "
দাও বলে দাও কোন ঠিকানা।
লিখব চিঠি খোঁজব তোমায়"

তার একটি প্রিয় পৃষ্ঠা:
“ইহান, তুমি জানো আমি তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি।
কিন্তু ভুলে যাইনি। তুমি কি জানো, ভালোবাসা একবারেই জন্মায়?
আমি অন্য কারও হতে পারি না।
আজও যদি তুমি এসে বলো, ‘চলো’, আমি বাকিটা জীবন তোমার সঙ্গে হেঁটে যেতে পারি।
আমি হয়তো পাগল।
কিন্তু তবুও তোমার থাকি।
"ইহান, আমি জানি তুমি কোনো অপরাধ করোনি।
কিন্তু কেন তুমি কিছু না বলে গেলে?
তুমি কি জানো, না বলা বিদায় সবচেয়ে বেশি পোড়ায়?
তবুও, আমি বিশ্বাস করি, তুমি একদিন আসবে।
আমি তখনো এখানে থাকব… ঠিক এই বেঞ্চে।"

হাওয়া একটু ঠান্ডা ছিল, নদীর ওপারে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছিল।
এই সময়টাতেই প্রতিদিন মনে হয় ইহান পেছন থেকে এসে ডাকবে—
"রেইনা!"

আর আজ...
ঠিক তখনই...
সে শব্দটা শোনে।

পায়ের শব্দ।

রেইনার শরীর জমে যায়।
সে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরায়… আর দেখে—একটা ছায়া।
ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
কিন্তু সেই চোখ—যে চোখ একদিন তার কবিতার অনুপ্রেরণা ছিল।

ইহানকে হারিয়েছে ছ’মাস আগে।
না, মৃত্যু নয়—একটা হঠাৎ নীরব বিদায়, কোনো চিঠি, কোনো উত্তর ছাড়া।
একটা দিন, এক বিকেল, এক নদীপাড়ের প্রতিজ্ঞা—
"যদি কোনোদিন আমি চলে যাই, তোমার বিশ্বাসই আমাকে ফিরিয়ে আনবে। ঠিক এই নদীর পাশে, এই গাছটার নিচে আমি ফিরে আসব।"

রেইনা তখন হেসে বলেছিল,
"তুমি তো কখনোই হারাবে না।"
কিন্তু মানুষ হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে পারে—জীবন থেকে, শহর থেকে, সম্পর্ক থেকে। ঠিক যেমন মেঘ হারিয়ে যায় আকাশ থেকে, রেখে যায় শুধু ভেজা হাওয়া।

রেইনার পরিবার চায় সে নতুন করে শুরু করুক, কলেজ শেষ করে চাকরি করুক, বিয়ের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করুক।
কিন্তু সে যে আটকে আছে… একটি অসম্পূর্ণ ভালোবাসায়।
একটু ক্লান্ত, মুখে দাড়ি, চোখের নিচে কালো দাগ—কিন্তু চাহনি সেই পুরনো ইহানের।
রেইনার চোখে জল, ঠোঁটে কাঁপুনি। সে বলতে চায়, “তুমি আসবে জানতাম।”
কিন্তু কিছুই বের হয় না। শুধু দুটো চোখে মিশে যায় ছয় মাসের সব অভিমান আর ভালোবাসা।

ইহান ধীরে কাছে এসে বলে—
"ফিরেছি… বিশ্বাস আমাকে টেনে এনেছে। তুমি ছেড়ে দাওনি বলেই আমি বেঁচে আছি।"
রেইনা জবাবে বলে না কিছু। কাঁপা কণ্ঠে শুধু ফিসফিস করে।
রেইনার ঠোঁট কাঁপে। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
কোনো শব্দ হয় না। শুধু নীরবতা আর চোখের ভাষা।

ইহান এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলে—
"আমি জানি তোমার হাজার প্রশ্ন আছে।
কিন্তু শুধু একটুকু বিশ্বাস তুমি রেখে গেলে… আমি তার ঋণ শোধ করতে এসেছি।
তুমি ভালোবাসা দিলে, আমি তার মর্যাদা দিতে এসেছি।
তুমি অপেক্ষা করেছো, আমি ফিরেছি।"

রেইনা ফিসফিস করে বলে—
"কেন গেলে?"

ইহান বসে পড়ে, ডায়েরির পাশে নিজের হাত রাখে।
তার কণ্ঠ কাঁপে,
"আমার জীবনটা তখন যুদ্ধ ছিল রেইনা… তোমার সঙ্গে থেকেও তোমায় নিরাপদ রাখতে পারতাম না।
তাই দূরে গিয়েছিলাম, নিজেকে গুছাতে।
তুমি না থাকলে আমি আবার দাঁড়াতেই পারতাম না।"

রেইনা তার হাতে হাত রাখে।
চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে একটুকরো ভালোবাসার আলো।

আমি জানতাম… তুমি আসবে।
আর যদি না-ও আসতে… তাও আমি তোমারই থাকতাম।

---

💙 চলবে…

গল্প :তবুও তোমার থাকি।
লেখিকা:কামরুন্নাহার খানাম সাবা
পর্ব:১

⛔⛔ কপি করা নিষিদ্ধ

ভুল ত্রুটি হলে মাফ করবেন।লেখার জগতে আমি একদম নতুন। আমাকে সাপোর্ট করে সবাই আমার পাশে থাকবেন।ধন্যবাদ। ❤️‍🩹নদীটা বদলায় না।নদীটা ঠিক আগের মতোই আছে।
পাড়ে পুরনো সেই আমগাছটা, ডালে ঝুলে থাকা হাওয়া-ছোঁয়া পাতারা, আর গাছের নিচে সেই কাঠের বেঞ্চটা—যেটাতে বসে রেইনা আজও প্রতিদিন অপেক্ষা করে।
বর্ষা আসে, নদী ফুলে ওঠে—তবুও নদীর ধার ঠিক একইরকম থাকে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছ, ডালের নিচে কাঠের বেঞ্চটা, আর নদীর পাড়ের ঘাসগুলোর ভিজে গন্ধ—এগুলো যেন রেইনার হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।

আজও সে বসে আছে সেই বেঞ্চে।
হাতে পুরনো এক ডায়েরি, পাতাগুলো কেমন হলুদ, কোনোটায় কফির দাগ, কোনোটায় জলের ছিটে—আর প্রতিটি পাতায় লেখা আছে ইহানকে উদ্দেশ্য করে কিছু না কিছু কথা।

আজ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে ইহানের চলে যাওয়ার।
তারা কেউ কাউকে বিদায় জানায়নি।
শেষ দেখা হয়েছিল ঠিক এই নদীর পাড়ে। তখন ইহান তার হাত ধরে বলেছিল—
"যদি একদিন হঠাৎ করে চলে যাই, অপেক্ষা করবে?
রেইনা তখন হাসতে হাসতে বলেছিল—
"তুমি পাগল? এইসব সিনেমার সংলাপ বলো কেন?"

কিন্তু ইহানের চোখ তখন জ্বলছিল ভয়ের ছায়ায়।
সেই দিনের পরে ইহান আর ফিরেনি। না ফোন, না মেসেজ, না কোনো খোঁজ।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল ইহান অভিমান করে দূরে গেছে।
তারপর যখন এক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, তখন মানুষ বলতে শুরু করে—
"তোমার ইহান তো চলে গেছে অন্য মেয়ের সঙ্গে!"
"হারিয়ে গেলে কি কেউ আর ফিরে আসে?"

রেইনা চুপ করে ছিল।
সে কারও চোখে জল দেখায়নি, হাসি লুকায়নি, ব্যথা ভাগ করেনি।
সে শুধু প্রতিদিন বিকেলে আসে এই নদীর পাড়ে, বসে, ডায়েরি খুলে লেখে।

আজকের পাতায় লেখা ছিল—
প্রতিদিন বিকেলে রেইনা একখানা ডায়েরি খুলে বসে। সেখানে সে লেখে—
আজকের অনুভূতি, নদীর রঙ, হাওয়া কেমন ছিল, আর… ইহানকে সে কতটা মিস করে।আর রেইনা গুন গুন করে গান গাইছে ----
"হেটেছি স্বপ্নের হাত ধরে"
পেরিয়ে রাত একাকি ভোরে।
"ডেকেছি কত বার নাম ধরে"
"যে তোমায় "
দাও বলে দাও কোন ঠিকানা।
লিখব চিঠি খোঁজব তোমায়"

তার একটি প্রিয় পৃষ্ঠা:
“ইহান, তুমি জানো আমি তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি।
কিন্তু ভুলে যাইনি। তুমি কি জানো, ভালোবাসা একবারেই জন্মায়?
আমি অন্য কারও হতে পারি না।
আজও যদি তুমি এসে বলো, ‘চলো’, আমি বাকিটা জীবন তোমার সঙ্গে হেঁটে যেতে পারি।
আমি হয়তো পাগল।
কিন্তু তবুও তোমার থাকি।
"ইহান, আমি জানি তুমি কোনো অপরাধ করোনি।
কিন্তু কেন তুমি কিছু না বলে গেলে?
তুমি কি জানো, না বলা বিদায় সবচেয়ে বেশি পোড়ায়?
তবুও, আমি বিশ্বাস করি, তুমি একদিন আসবে।
আমি তখনো এখানে থাকব… ঠিক এই বেঞ্চে।"

হাওয়া একটু ঠান্ডা ছিল, নদীর ওপারে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছিল।
এই সময়টাতেই প্রতিদিন মনে হয় ইহান পেছন থেকে এসে ডাকবে—
"রেইনা!"

আর আজ...
ঠিক তখনই...
সে শব্দটা শোনে।

পায়ের শব্দ।

রেইনার শরীর জমে যায়।
সে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরায়… আর দেখে—একটা ছায়া।
ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
কিন্তু সেই চোখ—যে চোখ একদিন তার কবিতার অনুপ্রেরণা ছিল।

ইহানকে হারিয়েছে ছ’মাস আগে।
না, মৃত্যু নয়—একটা হঠাৎ নীরব বিদায়, কোনো চিঠি, কোনো উত্তর ছাড়া।
একটা দিন, এক বিকেল, এক নদীপাড়ের প্রতিজ্ঞা—
"যদি কোনোদিন আমি চলে যাই, তোমার বিশ্বাসই আমাকে ফিরিয়ে আনবে। ঠিক এই নদীর পাশে, এই গাছটার নিচে আমি ফিরে আসব।"

রেইনা তখন হেসে বলেছিল,
"তুমি তো কখনোই হারাবে না।"
কিন্তু মানুষ হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে পারে—জীবন থেকে, শহর থেকে, সম্পর্ক থেকে। ঠিক যেমন মেঘ হারিয়ে যায় আকাশ থেকে, রেখে যায় শুধু ভেজা হাওয়া।

রেইনার পরিবার চায় সে নতুন করে শুরু করুক, কলেজ শেষ করে চাকরি করুক, বিয়ের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করুক।
কিন্তু সে যে আটকে আছে… একটি অসম্পূর্ণ ভালোবাসায়।
একটু ক্লান্ত, মুখে দাড়ি, চোখের নিচে কালো দাগ—কিন্তু চাহনি সেই পুরনো ইহানের।
রেইনার চোখে জল, ঠোঁটে কাঁপুনি। সে বলতে চায়, “তুমি আসবে জানতাম।”
কিন্তু কিছুই বের হয় না। শুধু দুটো চোখে মিশে যায় ছয় মাসের সব অভিমান আর ভালোবাসা।

ইহান ধীরে কাছে এসে বলে—
"ফিরেছি… বিশ্বাস আমাকে টেনে এনেছে। তুমি ছেড়ে দাওনি বলেই আমি বেঁচে আছি।"
রেইনা জবাবে বলে না কিছু। কাঁপা কণ্ঠে শুধু ফিসফিস করে।
রেইনার ঠোঁট কাঁপে। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
কোনো শব্দ হয় না। শুধু নীরবতা আর চোখের ভাষা।

ইহান এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলে—
"আমি জানি তোমার হাজার প্রশ্ন আছে।
কিন্তু শুধু একটুকু বিশ্বাস তুমি রেখে গেলে… আমি তার ঋণ শোধ করতে এসেছি।
তুমি ভালোবাসা দিলে, আমি তার মর্যাদা দিতে এসেছি।
তুমি অপেক্ষা করেছো, আমি ফিরেছি।"

রেইনা ফিসফিস করে বলে—
"কেন গেলে?"

ইহান বসে পড়ে, ডায়েরির পাশে নিজের হাত রাখে।
তার কণ্ঠ কাঁপে,
"আমার জীবনটা তখন যুদ্ধ ছিল রেইনা… তোমার সঙ্গে থেকেও তোমায় নিরাপদ রাখতে পারতাম না।
তাই দূরে গিয়েছিলাম, নিজেকে গুছাতে।
তুমি না থাকলে আমি আবার দাঁড়াতেই পারতাম না।"

রেইনা তার হাতে হাত রাখে।
চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে একটুকরো ভালোবাসার আলো।

আমি জানতাম… তুমি আসবে।
আর যদি না-ও আসতে… তাও আমি তোমারই থাকতাম।



💙 চলবে…

⛔⛔ কপি করা নিষিদ্ধ

ভুল ত্রুটি হলে মাফ করবেন।লেখার জগতে আমি একদম নতুন। আমাকে সাপোর্ট করে সবাই আমার পাশে থাকবেন।ধন্যবাদ। ❤️‍🩹
97 Views
0 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: