সোনালী সংসার।

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বহু বছর পর নাদিয়া ও ইমনের জীবনে এক নতুন মোড় এলো। তাদের সন্তানেরা বড় হয়েছে, নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। আদিব ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটি ভালো চাকরি পেয়েছে, আর আয়েশা ইসলামিক স্টাডিজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। নাদিয়া ও ইমন এখন অনেকটা অবসর জীবন যাপন করছেন।

একদিন ইমনের কাছে তার পুরনো এক বন্ধুর ফোন এল। বন্ধুটি জানালো, তাদের শহরে একটি বড় ইসলামিক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে এবং সেখানে ইমনকে একজন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ইমনের চোখেমুখে এক পুরনো দিনের আলো ঝলমল করে উঠল। কত বছর তিনি নিজের শহর ছেড়ে এসেছেন! কত স্মৃতি সেখানে আজও অমলিন হয়ে আছে!

নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে ইমন বললেন, "আমার মনে হয়, আমাদের একবারের জন্য হলেও দেশে ফেরা উচিত। পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হবে, আমাদের শেকড়ের কাছে যাওয়া হবে।"

নাদিয়াও এই প্রস্তাবে রাজি হলেন। বহু বছর পর নিজের দেশে ফেরার সুযোগ তিনিও হাতছাড়া করতে চান না। তাদের সন্তানদেরও তাদের জন্মভূমি দেখার আগ্রহ ছিল।

কিছুদিনের মধ্যেই তাদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি শুরু হলো। টিকিট বুকিং, আত্মীয়-স্বজনদের খবর দেওয়া—এক আনন্দময় ব্যস্ততা শুরু হলো তাদের সংসারে।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। নাদিয়া, ইমন, আদিব ও আয়েশা—সকলে একসাথে বিমানে চড়লেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন তারা তাদের শহরের বিমানবন্দরে নামলেন, এক অদ্ভুত অনুভূতি তাদের ঘিরে ধরল। এই সেই মাটি, যেখানে তাদের শৈশব কেটেছে, যেখানে তাদের জীবনের প্রথম অধ্যায় রচিত হয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে বের হতেই পুরনো বন্ধুদের উষ্ণ অভ্যর্থনা তাদের আপ্লুত করল। কত চেনা মুখ, কত পুরনো দিনের স্মৃতি যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।

তাদের পুরনো বাড়িতে গিয়ে নাদিয়ার চোখে জল এসে গেল। যদিও বাড়িটি এখন আর আগের মতো নেই, তবুও এর প্রতিটি কোণে তাদের ফেলে আসা দিনের স্পর্শ লেগে আছে।

কয়েক দিন ধরে তারা আত্মীয়-স্বজন ও পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করলেন। পুরনো দিনের গল্প, হাসি-ঠাট্টা—যেন সময় আবার পিছনের দিকে ছুটে চলেছে। আদিব ও আয়েশাও তাদের বাবা-মায়ের শৈশবের জগৎটাকে নতুন করে আবিষ্কার করল।

অবশেষে সেই কনফারেন্সের দিন এলো। ইমন মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্য রাখলেন। তার কন্ঠে ছিল গভীর আবেগ, তার কথায় ছিল জীবনের অভিজ্ঞতা আর ইসলামের শ্বাশত বাণী। বহু মানুষ তার বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হলো। নাদিয়া সামনের সারিতে বসে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন—তার চোখে গর্ব ও ভালোবাসা।

কনফারেন্স শেষে বহু মানুষ ইমনের সাথে কথা বলতে এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল তাদের পুরনো দিনের প্রতিবেশী ও বন্ধু।

এই সফরের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত ছিল তাদের পুরনো মসজিদের জিয়ারত। সেই মসজিদ, যেখানে ইমন ছোটবেলায় নামাজ পড়তে যেতেন, যেখানে তাদের বিয়ের আকদ হয়েছিল। মসজিদের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে নাদিয়া ও ইমনের মন এক গভীর শান্তিতে ভরে উঠল।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। তাদের দেশে থাকার সময় শেষ হয়ে এল। ফিরে যাওয়ার সময় নাদিয়ার মনে এক মিশ্র অনুভূতি—পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করার আনন্দ, আর ফেলে আসা সময়ের জন্য এক ধরনের বিষণ্ণতা।

বিমানবন্দরে বিদায়বেলায় সকলের চোখ ভিজে উঠল। ইমন তার পুরনো বন্ধুদের জড়িয়ে ধরলেন, নাদিয়া তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

বিমানে বসে নাদিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। তাদের শহর ধীরে ধীরে দৃষ্টির বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের হৃদয়ে রয়ে গেল সেই পুরনো দিনের অমলিন স্মৃতি, সেই শিকড়ের টান।

ইমন তার হাত ধরে বললেন, "এই প্রত্যাবর্তন আমাদের জন্য খুব দরকার ছিল। আমরা আমাদের অতীতকে ভুলে যাইনি, আর কখনো ভুলবও না।"

নাদিয়া মৃদু হাসলেন। "আর আমরা এটাও দেখলাম, আমাদের সন্তানেরা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কতটা ভালোবাসে।"

তারা আবার তাদের প্রবাসের জীবনে ফিরে গেলেন, কিন্তু এই সফরের অভিজ্ঞতা তাদের আরও সমৃদ্ধ করল। তারা বুঝতে পারলেন, সময়ের সাথে সাথে জীবনের অনেক কিছুই বদলায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের টান আর শেকড়ের বন্ধন চিরস্থায়ী।

তাদের দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক ঝড়ঝাপটা এসেছে, অনেক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। কিন্তু তাদের ভালোবাসার ভিত্তি—ইসলামের শিক্ষা আর একে অপরের প্রতি অটুট বিশ্বাস—সবসময় অটুট থেকেছে। তাদের গল্প আজও সেই সোনালী সকালের মতোই উজ্জ্বল, যেখানে ভালোবাসা আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রতিটি দিনের শুরুকে সুন্দর করে তোলে।

চলবে...
218 Views
3 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: