সোনালী সংসার

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
দিনটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। নাদিয়া ফজরের নামাজ পড়ে সংসারের কাজে মন দিয়েছিলেন। ইমন যথারীতি অফিসের জন্য বেরিয়েছিলেন। আদিব মাদ্রাসায় গিয়েছিল আর আয়েশা তার মায়ের আশেপাশে খেলা করছিল।

দুপুর নাগাদ ইমনের ফোন এল। নাদিয়া ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল এক অচেনা কণ্ঠস্বর।

"আমি সিটি হসপিটাল থেকে বলছি। আপনার স্বামী, ইমন, একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।"

নাদিয়ার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল। তার বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে তার শান্ত জগৎটা যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

কোনোমতে নিজেকে সামলে নিলেন নাদিয়া। দ্রুত আদিবের মাদ্রাসায় ফোন করে খবর দিলেন। প্রতিবেশীদের ডেকে আয়েশাকে তাদের জিম্মায় দিলেন। তারপর দ্রুত ছুটে গেলেন হাসপাতালের দিকে।

হাসপাতালের করিডোরে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন নাদিয়া। তার চোখেমুখে গভীর উদ্বেগ। কিছুক্ষণ পর একজন নার্স এসে জানালেন, ইমনকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে।

সময় যেন আর কাটতে চায় না। নাদিয়ার মনে নানা দুশ্চিন্তা ভিড় করতে লাগল। আল্লাহর কাছে ব্যাকুলভাবে দোয়া করতে লাগলেন তিনি। তাদের এতদিনের সাজানো সংসার, তাদের স্বপ্ন—সব যেন এক মুহূর্তে ভেঙে যেতে বসেছে।

আদিবও এসে পৌঁছেছে। মায়ের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তার কিশোর মনেও গভীর কষ্ট হলো। দুজনে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগল অপারেশনের শেষ হওয়ার জন্য।

দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারায় বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। নাদিয়া ও আদিব দ্রুত এগিয়ে গেলেন।

"অপারেশন সফল হয়েছে," ডাক্তার বললেন, "তবে উনি এখনও অচেতন। আঘাতটা বেশ গুরুতর ছিল। আগামী কয়েকটা দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ।"

নাদিয়ার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল—একদিকে স্বস্তির, অন্যদিকে উদ্বেগের। ইমন বেঁচে আছেন, এটাই আপাতত সবচেয়ে বড় কথা।

ইমনকে আইসিইউতে রাখা হলো। নাদিয়া ও আদিব বাইরে অপেক্ষায় রইলেন। কিছুক্ষণ পর তাদের ইমনকে একবারের জন্য দেখার অনুমতি দেওয়া হলো।

ইমনের নিথর দেহটা দেখে নাদিয়ার হৃদয় ভেঙে গেল। তার মুখের শান্ত ভাবটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইনের নল—তার প্রিয় মানুষটাকে এভাবে দেখে নাদিয়ার চোখে জল বাঁধ মানল না।

আদিব নীরবে তার বাবার হাত ধরে রইল। তার কিশোর মনেও যেন এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।

পরের কয়েকটা দিন নাদিয়ার জীবনে এক কঠিন পরীক্ষা নিয়ে এল। দিনের পর দিন তিনি হাসপাতালে কাটালেন। ইমনের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেন, তার সুস্থতার জন্য দোয়া করতেন। রাতে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে সন্তানদের দেখভাল করতেন।

প্রতিবেশীরা ও আত্মীয়-স্বজনরা তাদের সাধ্যমতো সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের সহানুভূতি ও সমর্থন নাদিয়ার মনোবল ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল।

আস্তে আস্তে ইমনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করল। প্রথমে তিনি চোখ খুলতে পারলেন না, তারপর ধীরে ধীরে সাড়া দিতে শুরু করলেন। নাদিয়ার কণ্ঠস্বর শুনে তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি দেখা যেত।

একদিন, ইমন দুর্বল স্বরে কথা বললেন। "নাদিয়া..."

নাদিয়ার চোখে আনন্দাশ্রু। "আমি এখানেই আছি," তিনি ইমনের হাত ধরে বললেন।

ইমনের সুস্থ হয়ে ওঠা ছিল এক অলৌকিক ঘটনা। ডাক্তাররাও অবাক হয়েছিলেন তার দ্রুত উন্নতি দেখে। নাদিয়ার অক্লান্ত সেবা আর আল্লাহর রহমত—এই দুটোই যেন ইমনের জীবন ফিরিয়ে এনেছিল।

অবশ্যই, এই কঠিন সময়টা তাদের সম্পর্কের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ইমন বুঝতে পেরেছিলেন, নাদিয়া শুধু তার স্ত্রী নন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। আর নাদিয়াও অনুভব করেছিলেন, ইমনের সামান্য কষ্টেও তার পৃথিবী যেন থমকে যায়।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর ইমনের পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও কিছুটা সময় লাগল। এই সময়টাতে নাদিয়া তার দিনের প্রতিটি মুহূর্ত ইমনের সেবায় নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাদের সন্তানরাও তাদের বাবার খেয়াল রাখত।

ধীরে ধীরে তাদের জীবনে আবার শান্তি ফিরে এল। ইমন আবার তার ব্যবসায় মনোযোগ দিলেন। আদিব তার পড়াশোনায় মন দিল আর আয়েশা আগের মতোই হেসেখেলে বেড়াতে লাগল।

তবে সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি তাদের মনে গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, জীবন কত ক্ষণস্থায়ী আর অপ্রত্যাশিত। তাই তারা এখন প্রতিটি মুহূর্তকে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়, একে অপরের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হয়।

একদিন সন্ধ্যায়, নাদিয়া ও ইমন ছাদে বসেছিলেন। আকাশ ভরা তারার মেলা। হালকা বাতাস বইছিল।

ইমন নাদিয়ার হাত ধরে বললেন, "তুমি আমার জীবনে না থাকলে কী হতো, আমি জানি না।"

নাদিয়া ইমনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। "আল্লাহ আমাদের একসাথে রেখেছেন, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।"

তাদের চোখেমুখে কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার আলো ঝলমল করছিল। তারা জানে, জীবনের ঝড়ঝাপটা আসতেই পারে, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে এবং একে অপরের হাত ধরে থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। তাদের ছোট্ট সংসার আবার শান্তির নীড়ে পরিণত হয়েছিল—এক অপ্রত্যাশিত ঝড়ের পর আরও দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ।

চলবে...
125 Views
1 Likes
1 Comments
0.0 Rating
Rate this: