অরণ্যের কান্না
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
ভোরের প্রথম আলো পাহাড়ি গ্রামের ওপর নেমে আসছিল, আর চারপাশের সবুজ অরণ্যের মধ্যে কুয়াশার সাদা ছায়া ছড়িয়ে পড়ছিল। দীপ্ত আর তার স্ত্রী অনন্যা ছিল গাড়িতে, তাদের গন্তব্য “চাঁদেরডোবা” নামক এক রহস্যময় গ্রাম। শহরের ভিড় আর শব্দ থেকে দূরে, প্রকৃতির কাছে কিছু দিন কাটানোর জন্য তারা এখানে এসেছিল। দীপ্ত, একজন যুক্তিবাদী মানুষ, বিশ্বাস করত না গ্রামে ছড়িয়ে থাকা ভৌতিক কাহিনীগুলোতে। কিন্তু অনন্যা, একটু ভয়ের সুর ছিল তার চোখে, মনে হচ্ছিল এই গ্রাম আর প্রকৃতির মাঝে কিছু অদ্ভুত শক্তি লুকানো।
গাড়ি চলছিল ধীরে ধীরে, পাহাড়ের ঢালে গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে ঠেকছিল। জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে সবুজ গাছ আর দূরে অন্ধকার ঘন বন, যা যেন জীবন্ত। দীপ্ত জানালায় হাত রেখে কুয়াশার দিকে তাকাল, ভাবল—“সিরিয়াসলি, এরকম কুয়াশা আর ঠান্ডা কোথাও হয় না। হয়তো গরম শহর থেকে এলে এতটাই ঠান্ডা মনে হয়।”
গ্রামের প্রবেশ পথের কাছে পৌঁছাতেই এক ভ্রান্তিকর অনুভূতি তাদের মনকে আচ্ছন্ন করল। সাদা মেঘের মতো কুয়াশা হঠাৎ ঘন হয়ে উঠল, বাতাসে যেন পচা গাছপালা পোড়ার মতো গন্ধ মিশে গেল। অনন্যা ঘাড় টান দিয়ে দীপ্তর দিকে চেয়ে বলল, “দেখছিস? কত অদ্ভুত সব গন্ধ!” দীপ্ত মাথা নাড়ল, বলল, “শুধু গন্ধ নয়, এখানে যেন... কিছু একটা নেই, যা আমাদের বলতে চাইছে।”
গ্রামের মানুষরা খুব কম কথা বলল। চোখে যেন এক অন্যরকম ভয় আর অবিশ্বাস। তারা কটেজে পৌঁছল, যা গ্রামের এক কোণে, চারপাশে ঘন বন আর এক পুরনো কুয়া। কটেজটা দেখতে ভাঙা-দুর্বল, কিন্তু ভিতরে গরম থাকার জন্য আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল।
রাত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছের পাতায় পাতায় যেন কোনো আত্মার সারা পৃথিবী গুঞ্জন করছে। দীপ্ত আর অনন্যা বসে থাকার চেষ্টা করল, কিন্তু বাতাসের সাথে আসা একটা মৃদু কান্নার শব্দ তাদের মনকে ধাক্কা দিল। কটেজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তারা দেখতে পেলেন, বনের ভেতরকার ধোঁয়াটে আকাশের নিচে এক নারীর সাদা পোশাকের ছায়া হাটছিল।
অনন্যা রোমহর্ষক কণ্ঠে বলল, “দীপ্ত, আমি শোনা কথা মনে পড়ছে—গ্রামে কেউ বলে, বনে এক নারী আত্মা ঘুরে, যার কান্না শুনলে কেউ বাঁচে না।”
দীপ্ত হেসে বলল, “ভয় দেখানোর জন্য লোকেরা গল্প বানায়। আমরা তো দেখব না কিছু।”
কিন্তু রাতের বেলা কান্নার শব্দ আরও ঘন হয়ে উঠল। দীপ্ত দরজা তালা দিয়ে বন্ধ করল, কিন্তু সেদিন রাতে ঘুম তাদের চোখে আসল না। অনন্যা বারবার শুনছিল এক ধরনের মৃদু ফিসফিস, যেন কেউ নাম ধরে ডেকেছে। তার হাত জড়িয়ে ধরল দীপ্ত।
দ্বিতীয় রাত তাদের জন্য ছিল অনেক বেশি ভয়ংকর। অরণ্যের ভেতর থেকে এক হিমশীতল বাতাস প্রবাহিত হল, যা কটেজের সব জানালা-দরজা ঝাপটে ফেলল। দরজা খোলা ছিল, তবুও কেউ ভিতরে ঢুকতে পারেনি, কিন্তু বাতাসের সাথে যে কান্নাটা আসছিল, তা যেন তারা দুজনের রক্ত গলিয়ে ফেলল।
অনন্যার হাত কাঁপছিল, তার চোখ ফাঁকিয়ে দেখছিল অন্ধকারে। হঠাৎ সে চিৎকার দিয়ে উঠল, “দীপ্ত, দরজা খোলা!” দীপ্ত ঝট করে উঠে দরজায় গেল। বাইরে কেউ ছিল না। শুধু কুয়ার পাশে এক ফাঁকা ছবি পড়ে ছিল, পুরনো, ধুলো ধুয়ে ফাটা। দীপ্ত তা তুলে দেখল, ছবির মুখোশের মতো একটা নারী মুখ, চোখ দুটো গভীর, যেন জীবন্ত।
“এই কি...?” দীপ্ত নিজেই অবাক হয়ে গেল। অনন্যার চোখে অশ্রু। তার কন্ঠটা কম্পমান ছিল, “আমি এটা দেখেছি স্বপ্নে। ও মেয়েটার মতো।”
তারা ভোর পর্যন্ত কটেজে বসে রইল, বাইরের কান্নার আওয়াজ মাঝে মাঝে ভেসে আসত। তবুও তারা ঠিক করল, পরদিন গ্রাম থেকে বাড়ি ফিরে যাবে। গ্রামের বৃদ্ধা, যিনি এইসব কাহিনী শোনিয়েছিলেন, বলেছিলেন, এক সময় ওই কুয়ার কাছে এক দম্পতি এসেছিল। একদিন সেই দম্পতির স্ত্রী বনে হারিয়ে গিয়েছিল, আর স্বামী পাগল হয়ে গিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এরপর থেকে সেই কুয়া যেন অভিশপ্ত।
পরদিন সকালে তারা বেরিয়ে পড়ল, কিন্তু গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগেই অনন্যার মন কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠল। সে বলল, “দীপ্ত, আমার মনে হচ্ছে আমরা এখান থেকে যেতে পারব না, যেন কিছু আমাদের বাধা দিচ্ছে।”
দীপ্ত হাসলো, “তুই ভয় পেও না। সব এক ফাঁকি মাত্র।”
তারা গাড়ি চালাতে শুরু করল। কিন্তু ঠিক গ্রাম ছাড়ার আগে গাড়ির পিছনে একটা সাদা ছায়া দেখতে পেল দীপ্ত। সে চমকে উঠল। পিছনে তাকিয়ে সে দেখল, রাস্তার মাঝখানে এক নারী সাদা শাড়ি পরা, এলোমেলো চুল, চোখ মরে যাওয়ার মত বিশ্রামহীন। তার হাত বাড়িয়ে যেন ডাকছে।
দীপ্ত রুক্ষ কণ্ঠে বলল, “ওটা তো বাস্তব নয়।”
কিন্তু অনন্যার চোখে রক্ত জমে গেল। “দীপ্ত, ও ডাকছে… আমাদের ফিরে আসার জন্য।”
গাড়ি গতি বাড়িয়ে গ্রাম থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বাতাস হঠাৎ দম বন্ধ করার মত গরম হয়ে গেল, চারপাশের গাছগুলো যেন নীরব হয়ে গেল। বাতাসে সেই অদ্ভুত গন্ধ আবার ছড়িয়ে পড়ল। দীপ্ত গাড়ি থামিয়ে বলল, “আমরা কি এই অরণ্য থেকে সত্যিই পালাতে পারব?”
তাদের গাড়ির ইঞ্জিন হঠাৎ গরম হয়ে গেল, গাড়ি থেমে গেল। অরণ্যের নীরবতা ভেঙে এলো কানে কানে চিৎকার আর কান্নার শব্দ। দীপ্ত আর অনন্যা একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ অরণ্যের ভিতর থেকে সাদা ছায়ার শরীরগুলো বেরিয়ে আসল, যাদের চোখে শুধু বিষাদ আর যন্ত্রণা।
দীপ্ত তখন বুঝতে পারল, তারা শুধুমাত্র একটা গ্রামে এসে পড়েনি, তারা এসেছে পুরনো অতীতের রক্তিম স্মৃতির মাঝে, যেখানে কোনও ব্যথা, কোনও অপরাধ অবশিষ্ট আছে যা মুক্তি পায়নি।
অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমাদের অবশ্যই ওদের কান্না থামাতে হবে। ওরা মুক্তি চাইছে।”
দীপ্ত হিমশীতল পরিবেশের মাঝে বনের দিকে তাকাল। এক অস্পষ্ট সুর শুনতে পেল, যেন কেউ গা ছমছমানো গানের মতো একটা গান গাইছে—“ছাড় দাও আমাকে, আমি এখানে থাকতে চাই না।”
তারা সিদ্ধান্ত নিল অরণ্যের গভীরে প্রবেশ করবে, সেই স্থান যেখানে ঐ মেয়েটি শেষবার ছিল। তারা গিয়েছিল সেই পুরনো কুয়ার কাছে, যেখানে স্বামীর ঝুলন্ত দেহ পাওয়া গিয়েছিল। কুয়া যেন এক ভয়ংকর গহ্বর, নিচের দিকে কালো অন্ধকার আর গাছের শাখাগুলো তার মুখের মত মোড়ানো।
দীপ্ত নিচে ঝাকিয়ে দেখল, কুয়ার তলায় এক পুরনো খাতা পড়ে আছে। খাতা খুলে তারা দেখতে পেল, সাদা শাড়ি পরা মেয়েটির লেখা—একটি চিঠি, যা লিখে ছিল তার শেষ কথা। সে বলেছিল, “আমার মৃত্যু নয়, আমার বিচার চাই। যারা আমাকে খুঁজেছিল, তারা আমাকে আর খুঁজবে না। কিন্তু আমার কান্না কখনও থামবে না।”
দীপ্ত আর অনন্যা বুঝল, এই আত্মারা শুধু মুক্তি চায়, তাদের সত্যকে মেনে নিতে চায়।
রাত যত গাঢ় হচ্ছিল, কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। বাতাস শান্ত হয়ে গেল। দীপ্ত আর অনন্যা কুয়ার পাশে হাত জুড়ে প্রার্থনা করল। অরণ্যের মাঝেও হঠাৎ এক আশার আলো ছড়িয়ে পড়ল।
সকালে তারা ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হল। গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে বৃদ্ধা আবার দেখা দিল, বলল, “তোমরা হয়তো বুঝতে পেরেছো, এই অরণ্যের কান্না আর কান্নার কারণ।”
দীপ্ত চেয়েছিল তাদের ভুলে যেতে, আরেকবার কখনও ফিরে না আসতে। কিন্তু যখন তারা গাড়িতে উঠে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করল, তখন অনন্যা পিছনে তাকিয়ে দেখল, অরণ্যের ধোঁয়াটে ভেতর থেকে এক নারী, শান্ত চোখে তাদের বিদায় জানাচ্ছিল।
“অরণ্যের কান্না” শেষ হয়নি, বরং নতুন এক অধ্যায়ের শুরু হল। তারা বুঝেছিল—কখনও কখনও কিছু কান্না হয় মুক্তির পথপ্রদর্শক, কিছু গোপন সত্যের দৃষ্টান্ত। আর সেই কান্না কখনও যেন থামেনা, যতক্ষণ না কেউ তার মূল রহস্য খুঁজে পায়।
111
Views
0
Likes
0
Comments
1.0
Rating