**গল্পের নাম:** মাসজিদ বান্দারের ছায়া
**অধ্যায় ১: শেষ ট্রেন**
মুম্বাই শহরের হৃৎপিণ্ডে, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ট্রেন ধরেন, সেখানে রাতের নীরবতা যেন এক ভিন্ন জগত। মাসজিদ বান্দার স্টেশন—দিনে যেমন ব্যস্ত, রাতে তেমনই নিস্তব্ধ। রাত তখন ১:৪৫। শেষ লোকাল ট্রেন CST থেকে ভাইখলা হয়ে কুরলা যাচ্ছে। স্টেশনে নেমে পড়ল অর্ণব—একজন নবীন সাংবাদিক।
সে এসেছে এখানে একটি খবরের অনুসন্ধানে—গুজব রটেছে, মাসজিদ বান্দারের ৩নং প্ল্যাটফর্মে মাঝেমধ্যে এক সাদা শাড়ি পরা মহিলা দেখা যায়, যিনি ট্রেনের দিকে চেয়ে থাকেন। কেউ কেউ বলেছে, তিনি নাকি ট্রেন চলার পরেই হাওয়ার মতো মিলিয়ে যান। কেউ কেউ তো ভিডিও করতেও গেছে—কিন্তু ভিডিওতে কিছু ধরা পড়ে না।
অর্ণব এসব গুজবে বিশ্বাস করে না। কিন্তু "আধুনিক শহরের প্রাচীন ভয়"—এই শিরোনামে সে একটি রিপোর্ট লিখছে। তাই সে নিজেই এক রাতে এসে উপস্থিত।
স্টেশনে তখন আর কেউ নেই। কেবল এক বুড়ো চা-ওয়ালা, ঘুমিয়ে পড়া কুলি আর এক অন্ধ ভিক্ষুক, যে প্রতি রাতে এখানে এসে বসে।
হঠাৎ, প্ল্যাটফর্ম ৩-এর দিকে তাকিয়ে অর্ণব দেখে, ধোঁয়ার মধ্যে কেউ একজন দাঁড়িয়ে—সাদা পোশাকে।
সে ক্যামেরা তোলে। ফ্রেম ফোকাস করে... কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না স্ক্রিনে।
"তুমি এখানে কেন এসেছো?"—একটি শীতল কণ্ঠ তার পেছনে।
অর্ণব ঘুরে দেখে—কেউ নেই।
তারপর থেকে যা ঘটতে থাকে, তা শুধু অর্ণব নয়, মুম্বাই শহরকেই বদলে দিতে পারে...
**অধ্যায় ২: অতীতের ছায়া**
পরদিন সকাল। অর্ণব তার অফিসে বসে ক্যামেরার ফুটেজগুলো পরীক্ষা করছিল। রাতের ঘটনাগুলো তাকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছিল না। ভিডিওতে কিছুই ধরা পড়েনি—না সাদা শাড়ির মহিলা, না সেই কণ্ঠস্বর। কিন্তু অর্ণব নিশ্চিত, সে কিছু দেখেছিল।
তার বস, রাহুল সেনগুপ্ত, একজন প্রবীণ সাংবাদিক, অর্ণবকে বলেন, “তুই বলছিস তুই কিছু দেখেছিস, কিন্তু প্রমাণ কই? কিছু নেই! এসব গুজবের পেছনে পড়িস না।”
অর্ণব চুপচাপ উঠে পড়ে। অফিস থেকে বেরিয়ে সে যায় মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতে। মাসজিদ বান্দার স্টেশন সংক্রান্ত পুরনো রেকর্ড খুঁজতে চায়। সেখানে এক প্রহরী তাকে একটি ধুলোমাখা ফাইল দেয়, নাম—**“মাসজিদ দুর্ঘটনা: ১৯৮৪”**।
ফাইল খুলতেই প্রথম পাতায় একটি ছবি—এক মহিলার। নাম লেখা—**রুহিনা বানু**। ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হন রাত ২টার একটি ট্রেনে। ঠিক যে সময়টায় অর্ণব স্টেশনে ছিল আগের রাতে।
আরও পড়তে পড়তে অর্ণব দেখে, প্রতিবছর ২১শে মার্চ রাত ১:৪৫ থেকে ২:১৫ এর মধ্যে কেউ না কেউ সেই প্ল্যাটফর্মে “একজন সাদা শাড়ি পরা মহিলাকে” দেখেছে। কেউ পাগল হয়ে গেছে, কেউ নিখোঁজ।
অর্ণব সিদ্ধান্ত নেয়, সে আবার স্টেশনে যাবে। এবার সে শুধু রিপোর্ট করার জন্য নয়—সত্য জানার জন্য।
**অধ্যায় ৩: ফিরে দেখা—রুহিনার চিঠি**
অর্ণব আবার লাইব্রেরিতে যায়, এবার গভীরভাবে রুহিনা বানুর জীবন নিয়ে খোঁজ নিতে। একটি পুরনো নিউজক্লিপিংসে লেখা—“রুহিনা বানু: প্রেম, প্রতারণা ও মৃত্যু।” সেখানে উল্লেখ ছিল, রুহিনা ছিলেন স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষিকা। তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল একটি উচ্চপদস্থ রেলকর্মীর সঙ্গে—নাম ফিরোজ আক্তার।
কিন্তু বিয়ের ঠিক আগের দিন, রাত ২টার দিকে, রুহিনা ট্রেনে উঠেছিলেন ফিরোজের সঙ্গে দেখা করতে। ট্রেনটি রহস্যজনকভাবে লাইনের ভুল নির্দেশে অন্য লাইনে চলে যায় এবং একটি রক্ষণাবেক্ষণরত ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। রুহিনা সহ আরও তিনজন মারা যান।
আরও একটি লালচে খাম পাওয়া যায় ফাইলের ভিতর—তাতে হাতের লেখা চিঠি।
*“ফিরোজ,
তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে তুমি আমায় ভালোবাসো। কিন্তু আজ আমি জানলাম, তুমি অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছ। আমি আসছি তোমার কাছে, উত্তর না দিলে আমি ফিরে যাব না। তোমার রুহিনা।”*
চিঠিটা পড়ে অর্ণব ঠান্ডা ঘামে ভিজে যায়। সব কিছু মিলিয়ে যাচ্ছে—রাত ২টা, স্টেশন, ট্রেন, এক ভগ্ন হৃদয়।
অর্ণব বুঝে যায়, সে কেবল ভৌতিক গল্প নয়, একটি প্রেম, প্রতারণা ও প্রতিশোধের অতল গভীরতায় নেমে পড়েছে।
সে এবার রুহিনার আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা করে—সেই প্ল্যাটফর্মেই, ২১শে মার্চ রাতে।
**অধ্যায় ৪: অভিশপ্ত রাত—২১শে মার্চ**
২১শে মার্চ। রাত ১:৩০। মাসজিদ বান্দার স্টেশন আবারো নিস্তব্ধ। অর্ণব একা এসে দাঁড়ায় প্ল্যাটফর্ম ৩-এ। সঙ্গে একটি টেপ রেকর্ডার, একটি ক্যামেরা এবং রুহিনার চিঠির কপি।
আকাশে মেঘ জমেছে, বাতাস ভারী। ঠিক ১:45-এ, হঠাৎ ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা। অর্ণব টেপ চালু করে, বলে—“রুহিনা, আমি তোমার গল্প জানি। তুমি যদি সত্যিই এখানে থাকো, আমার সঙ্গে কথা বলো।”
প্রথমে কিছুই হয় না। এরপর হঠাৎ ক্যামেরার স্ক্রিনে ঝিরঝির শব্দ—একটি অস্পষ্ট মুখ। তারপর সেই কণ্ঠস্বর—
“তুমি ফিরোজ না... তুমি কে?”
“আমি অর্ণব,” সে জবাব দেয়। “তোমার সত্যিটা জানাতে এসেছি দুনিয়াকে।”
প্ল্যাটফর্মের এক কোণে হঠাৎ আবছা আলো—রুহিনার অবয়ব। সাদা শাড়ি, কাঁধে একটা ছেঁড়া ব্যাগ। চোখে জল, ঠোঁটে একটা ফিসফিস আওয়াজ—“সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল... আমি তাকে খুঁজছি...”
“ফিরোজ মারা গেছে,” অর্ণব বলে। “তুমি মুক্তি পেতে পারো, রুহিনা। এই প্রতিশোধের আগুন আর তোমার নয়।”
রুহিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “তাহলে আমায় নিয়ে যাও—যেখানে আর কষ্ট নেই।”
এক ঝলক হাওয়া আসে। ঘড়ির কাঁটা ২:১৫। ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায়, বাতি জ্বলে ওঠে। প্ল্যাটফর্মে অর্ণব একা।
কিন্তু তার হাতে চিঠির পাশে পড়ে থাকে একটা সাদা গোলাপ।
**অধ্যায় ৫: শেষ ট্রেনের আগে**
রুহিনার আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের রাতের পর অর্ণব আর আগের মতো ছিল না। তার চোখে ছিল গভীর কিছু দেখে ফেলার ছাপ। কিন্তু তার কাছে প্রমাণ বলতে কেবল সেই সাদা গোলাপ আর তার নিজের অভিজ্ঞতা।
পরদিন অফিসে গিয়ে সে সবকিছু লিখে ফেলে—একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট: “মাসজিদ বান্দারের ছায়া: এক ভৌতিক প্রেমকাহিনি”। বস তা পড়ে কেবল চুপ করে থাকেন। বলেন, “তুই যা লিখেছিস, তা হয়তো মানুষ বিশ্বাস করবে না... কিন্তু আমি জানি, তুই মিথ্যা বলিস না।”
এদিকে স্টেশনের পুরনো নিরাপত্তাকর্মী কাশীনাথ এসে অর্ণবকে বলেন, “সেই রাতেই ট্রেন আটকে ছিল ৩০ মিনিট—বিনা কারণ। রেল কন্ট্রোল রুম কিছু বোঝাতে পারেনি।”
অর্ণব বুঝে যায়—রুহিনার আত্মা হয়তো এবার মুক্তি পেয়েছে। সে নিজের রিপোর্ট জমা দেয়, কিন্তু নিজের জন্য আর কিছু রাখে না।
রিপোর্ট প্রকাশিত হলে মুম্বাইজুড়ে আলোড়ন পড়ে যায়। কিছু মানুষ বিশ্বাস করে, কেউ কেউ কেবল এটিকে “সৃজনশীল সাংবাদিকতা” বলে। কিন্তু মাসজিদ বান্দারের ৩নং প্ল্যাটফর্ম সেই রাতের পর থেকে আর কাউকে কাঁপিয়ে তোলে না। যেন ভারমুক্ত।
তবে...
এক রাতে, এক ক্লান্ত যাত্রী শেষ ট্রেন ধরার জন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকেন। হঠাৎ তার কানে আসে এক শীতল কণ্ঠ—
“তুমি ফিরোজ না?”
**অধ্যায় ৬: শেষ ছায়া**
গল্পের রিপোর্ট ছাপার কিছুদিন পর অর্ণব মুম্বাই ছেড়ে যায়—কাজের বদলিতে নয়, শান্তির খোঁজে। কিন্তু এক রাতে তার ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ভিডিও আসে। ভিডিওটি তোলা হয়েছে মাসজিদ বান্দার স্টেশনে, ঠিক সেই ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। সময়—২১শে মার্চ, রাত ১:৫০।
ভিডিওতে দেখা যায়: এক যাত্রী বসে আছে, হঠাৎ হাওয়া বইছে, ক্যামেরা ঝাঁকুনি খাচ্ছে, আর সেখানে আবছা সাদা পোশাকে এক মহিলা হেঁটে যাচ্ছে ট্রেনের দিকে...
অর্ণব নিঃশ্বাস আটকে রেখে ভিডিও দেখে। শেষে, এক মুহূর্তে, মহিলা থেমে ক্যামেরার দিকে তাকায়। এবং খুব মৃদু হাসে।
তার চোখের দিকে তাকিয়ে অর্ণব বুঝতে পারে—এটি রুহিনা নয়।
নতুন কেউ এসেছে। নতুন কোনও অতৃপ্ত আত্মা? নতুন কোনও গল্প?
অর্ণব নিজের ডেস্কে ফিরে এসে আবার একটি ফাইল খোলে। তার উপরে লেখা:
**“মাসজিদ বান্দারের ছায়া – দ্বিতীয় অধ্যায়?”**
আলো নিভে আসে। ট্রেনের হুইসেল শোনা যায় দূরে।
\[সমাপ্ত]
মসজিদ বান্দারার ছায়া
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
60
Views
2
Likes
0
Comments
5.0
Rating