অসহায় সময় (পাট ৫ )

পলাশ
পলাশ
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:

তিন মাস কেটে গেছে, সাঈদ আর আমি একসাথে সময় কাটাচ্ছিলাম। সেই আগের অনিশ্চয়তা, শঙ্কা, সব কিছু যেন পেছনে ফেলে দিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমাদের মধ্যে যা কিছু ছিল, তা সব ঠিক হতে চলেছে। আমি তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু জানতাম না, আমাদের সম্পর্কের এই সোনালি মুহূর্তগুলো কিছুদিনের জন্যই ছিল।

একদিন সন্ধ্যায়, সাঈদ আমাকে ফোন করল। তার কণ্ঠে কিছু একটা ছিল, যা আমি কখনোই শুনিনি। কিছুটা গম্ভীর, কিছুটা শঙ্কিত। আমি তার কণ্ঠে তীব্র এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করছিলাম।

“প্রিয়া, আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে,” সে বলল।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সাঈদের সঙ্গে প্রায় সব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে, কিন্তু আজ তার স্বরটাই আলাদা। “কী হয়েছে সাঈদ? তুমি কি ঠিক আছো?” আমি উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলাম।

সে কিছুটা বিরতি নিয়ে বলল, “প্রিয়া, আমি জানি আমি অনেক কিছু ভুল করেছি, কিন্তু… কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আমি আর সামাল দিতে পারছি না। আমি মনে করি, আমাদের এই সম্পর্কটা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়।”

এই কথা শুনে যেন আমার পৃথিবীটাই থেমে গেল। আমার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে গেল। কিছু সময় আমি চুপ ছিলাম, আমার চোখে জল জমেছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। আমি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, যে সাঈদ এই কথা বলছে। সাঈদ, যে ছিল আমার পাশে, যে আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল, যে বলেছিল আমরা আবার নতুন করে শুরু করতে পারবো, সে এখন কীভাবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিল?

“ক…কী বলছো তুমি, সাঈদ? আমরা কি... সত্যি সত্যি শেষ হয়ে যাবো?” আমার কণ্ঠে আতঙ্ক ছিল, কিন্তু আমি কোনও কিছুই পরিবর্তন করতে পারছিলাম না।

সে এক নিঃশ্বাসে বলল, “প্রিয়া, আমার ভিতরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার নিজের ভিতরের ভয়, আমার সংকট, এসব কিছুই আমি আর মোকাবেলা করতে পারছি না। আমার জীবনের এক জায়গায় আমি আটকে গেছি। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না, কিন্তু আমি নিজেও সুখী হতে পারছি না। আমার জন্য এই সম্পর্কটা আর টানতে পারব না।”

তার কথা শোনার পর, আমি একেবারে নিঃশব্দ হয়ে গেলাম। এক লহমায় আমার সমস্ত অনুভূতি ভেঙে গেল। মনে হচ্ছিল, আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। সমস্ত বিশ্ব যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। সাঈদ আমাকে জানিয়েছিল, সে আর আমাদের সম্পর্ক চালিয়ে নিতে পারবে না, কিন্তু সে আমার পাশে থেকেও বলল, “আমি তোমাকে চিরকাল ভালোবাসব, কিন্তু আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। তুমি যদি কখনোই আমার জন্য কষ্ট পাও, আমি খুব দুঃখিত।”

আমার বুকের মধ্যে হাহাকার উঠছিল। সাঈদ যদি আমাকে এতটা ভালোবাসে, তবে কেন এভাবে চলে যাচ্ছে? কেন আমাদের সম্পর্ককে এমনভাবে শেষ হতে দিলো? কেন আমরা একে অপরকে সময় দিতে পারলাম না?

“কীভাবে তুমি এভাবে চলে যেতে পারো, সাঈদ? আমরা একে অপরকে এত ভালোবাসতাম... তুমি তো বলেছিলে, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে,” আমি কেঁদে ফেললাম। আমার কণ্ঠে যন্ত্রণা ছিল, মন ভারাক্রান্ত ছিল। আমি যেন নিজেকে অকারণভাবে দোষ দিচ্ছিলাম।

সে কিছুক্ষণ চুপ ছিল, তারপর বলল, “আমি জানি, তুমি কষ্ট পাচ্ছো, কিন্তু আমি নিজে সেই কষ্টে ডুবে আছি। আমাদের যদি একসাথে থাকতে না পারি, তবে জীবনের মধ্যে আমরা যেটা পাবো, সেটা হবে শুধুই বিষাদ। আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দিতে চাইনি। তবে, আমি আর নিজেকে ঠকাতে পারি না।”

তার কথা শুনে, আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়লাম। জীবনের সমস্ত সুখ, আশা, সব কিছু যেন এক ঝটকায় শেষ হয়ে গেল। সাঈদ চলে যাবে, আর আমি একা হয়ে যাবো। সম্পর্কের এই যন্ত্রণা, হারানোর কষ্ট, সত্যি যে সহ্য করা কঠিন।

“আল্লাহ, আমি কি কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেবো?” আমি মনে মনে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম। হৃদয়ের মধ্যে একটা গভীর শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল, যা কখনো পূর্ণ হবে না। সাঈদ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, এবং আমি কখনোই আর তাকে ফিরে পাবো না।

সে ফোন কেটে দিল। আমার চোখের কোণে জল ছিল, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। আমি জানতাম, আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। হয়তো কিছু কিছু সম্পর্ক এমন হয়, যেখানে মানুষের পথ আলাদা হয়ে যায়। হয়তো, জীবন আমাদের সঠিক পথে নিয়ে যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তে, আমি জানি না। আমার চোখে জল ছিল, হৃদয়ে ব্যথা ছিল, এবং আমি একা, একেবারে একা হয়ে গিয়েছিলাম।

83 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: