আজ সকালবেলায় আবার একচোট ঝগড়া হয়ে গেল।
ঝগড়া হলেই অন্তরের খুব খারাপ লাগে।
বাবা-মা দুজনেই দাদুর সাথে কেন যে এরকম করে, বুঝতে পারে না অন্তর।
দাদু তো বুড়ো মানুষ। তাকে নিয়ে কি অমন কথা বলতে হয়?
মা আজ সকালে বলেছে,‘আলসে বুড়ো কোথাকার!খালি বসে বসে ভাত গিলবে।'
দাদুর মেজাজও খিটখিটে। কিছু বললেই একেবারে তেড়ে ওঠে। বলে, ‘এই বুড়ো বয়সে বসে খাবো না তো কী করবো? উনি কোথাকার কোন মহারানী এসেছেন!উনি খাবেন বসে বসে।'
ঝগড়া থেমে গেলে দাদুর মেজাজ ভালো হয়। দাদু অন্তরের কাছে পুরানো দিনের গল্প বলে।
সারাজীবন দাদু মেহনত করেছে। ফসলের মাঠে জন খেটেছে। রোদে পুড়েছে। বর্ষায় ভিজেছে।
অনেক পথ পেরিয়ে বনে গিয়ে কাঠ কেটেছে। বাড়ি ফিরেছে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে।
কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। শরীর একেবারেই ভেঙে পড়েছে। একটু খানি হেঁটে যেতেও খুব কষ্ট হয়।
বাবা-মা কেউ এখন দাদুকে দেখতে পারে না। খেতেও দেয় না ভালোমতো।
শীতের সময় দাদুর কী কষ্ট!!!একটা ছেঁড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে সারারাত কাটায়।
মা অন্তরকে ভালো ভালো খাবার খেতে দেয়। অন্তরের ইচ্ছে করে ওখান থেকে দাদুকে কিছু খাবার দিতে।
মাঝে মাঝে লুকিয়ে দেয়ও। তবে সবসময় দিতে পারে না। মা-বাবা দেখে ফেললেই সর্বনাশ।
অন্তর ভাবে মা-বাবাকে একদিন বুঝিয়ে বলতে হবে।
কিন্তু বলবে কী করে?দাদুর কথা শুনলেই তো দুজনেই রেগে যায়।
মা বলে, 'আমার কাছে ঐ বুড়োর নামকরবি না। কি আমার দাদু পেয়েছে রে! বসে বসে ভাত গিলছে। ¡আবার কত রকমের কথা! 'তরকারিটা ভালো হয়নি। মাছ না হলে খাব কী দিয়ে?' বলার সময় মা দাদুর কথার ভঙ্গি নকল করে।
অন্তর ভাবে, দাদুও যেন কেমন! একটা না একটা কথা নিয়ে খিটিমিটি বাধানো চাই। দাদু তো জানেই মা-বাবা তাকে দেখতে পারে না। একটু চুপচাপ থাকলেই হয়। তা না। সব সময়ই কথা বলতে হবে। বাবা বলে 'বুড়ো ষাঁড়ের কাজ হল ঝিমানো, আর বুড়ো মানুষের কাজ হল খিটমিট করা।'
আজ ক'দিন ধরে অন্তর দেখছে, বাবা-মা চুপিসারে কথা বলছে।অন্তর বুঝতে পারে কথাটা দাদুকে নিয়েই। তার খুব ভাবনা হয়।
সেদিন সাঁঝের বেলা।
অন্তর পড়ার ঘরে বসে পড়ছিল।
পাশের ঘরেই বাবা-মা কথা বলছে।
কান পেতে রইল অন্তর।
বাবা বলল, 'বুড়োকে অনেক দূরে কোথাও রেখে আসতে হবে। কালই আমি বাজারে গিয়ে একটা ডুলি কিনেনিয়ে আসব।
ঐ ডুলিতে করেই নিয়ে যাব বুড়োকে। রেখে আসব একটা রাস্তার ধারে।'
মা বলল, 'রেখে এলে কী হবে? দেখবে, বুড়ো আবার ঠিকই ফিরে আসবে।'
'আরে এমন জায়গায় রেখে আসব যে আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারবে না। আর ওখানেও তো লোকজন আছে। তারা বুড়োকে দেখলে আদর যত্ন করবে।'
'কিন্তু পাড়ার লোকদের কী বলব? বুড়োকে না দেখলেই তো ওরা সব কথা জানতে চাইবে।'
'এ নিয়ে ভাবনা কী? আমরা বলব, বুড়োই চেয়েছিল পাহাড়ি একটা গাঁয়ে চলে যেতে। তাই তাকে সেখানে রেখে এসেছি। বাকি জীবন ওখানেই শান্তিতে কাটাবে।'
বাবা-মার এসব কথা শুনে অন্তরের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। পানিতে ভরে উঠল তার দু'চোখ। দাদু বাড়িতে নেই-একথা যে ভাবতেই পারে না অন্তর। দাদু না থাকলে অন্তর গল্প শুনবে কার কাছে?
পরদিন ডুলি কিনতে বাবা বাজারে গেল। অন্তর অমনি এল মায়ের কাছে। এসেই বলল,
'মা, দাদুকে তোমরা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে কেন?'
অন্তরের কথা শুনে মা চমকে উঠল। অন্তর এসব জানল কেমন করে?
মা বলল, 'আরে না না! আমরা তোর দাদুকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব কেন? তুই তো এখনও ছোট। তাই বুঝতে পারছিস না। দেখছিস না, এখানে তোর দাদুর যত্ন নেওয়ার কেউ নেই। তোর বাবা সারাদিন মাঠে থাকে। আমাকেও কাজ করতে হয় সারাক্ষণ। তাই তোর বাবা ঠিক করেছে, তোর দাদুকে খুব ভালো একটা জায়গায় রেখে আসবে। সেখানে অনেক আরামে থাকবে তোর দাদু।'
'জায়গাটা কোথায়?'
'সে তো অনেক দূর! সে জায়গার নাম তুই কোনোদিন শুনিস নি।'
'সেখানে দাদুকে দেখাশোনা করবে কে?'
'ও নিয়ে তুই একটুও ভাবিস না অন্তর। সেখানে অনেক লোকজন আছে। তারাই তোর দাদুকে দেখবে।'
অন্তর আর কোনো কথা বলে না। তার মাথায় নানান ভাবনা আসে। ধীরে ধীরে সাঁঝের বেলা ঘনিয়ে এল। গাছের আগা থেকে মিলিয়ে গেল সূর্যের নরম আলো। বাবা ফিরে এল ডুলি নিয়ে।
তখন গভীর রাত। দাদু তার ঘরে শুয়েছিল একা একা। বাবা এবার ভুলি নিয়ে ঢুকল দাদুর ঘরে। তারপর দাদুকে তুলে নিল ডুলিতে। পাশেই মা দাঁড়িয়ে।
দাদু কিছুই বুঝতে পারছিল না। ব্যাপার কী? তাকে ডুলিতে তোলা হচ্ছে কেন? দাদু বলল, 'একি? কী করছ তোমরা? কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে?'
দাদুর কথা শুনে বাবা একটু হকচকিয়ে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল, 'শোন বাবা, এখানে আমরা তোমার কোনো যত্ন নিতে পারছি না। তাই ঠিক করেছি, খুব ভালো একটা জায়গায় তোমাকে রেখে আসব। সেখানে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। এখানকার চাইতে অনেক ভালো থাকবে তুমি!'
শুনেই দাদু চিৎকার করে বলল, 'এত নেমকহারাম তুমি! সারাজীবন কষ্ট করে আমি তোমাকে বড় করেছি। আর আজ তুমি আমাকে দূর করে দেবে!'
দাদু আরও বলল, 'ভেবেছ আমাকে দূর করে তোমরা সুখে থাকবে! তা হবে না। আমাকে পথে বসালে তোমাদেরও পথে বসতে হবে।' রাগে-দুঃখে দাদু থরথর করে কাঁপতে লাগল।
দাদুর কথা শুনে বাবাও দু-এক কথা বলল। তারপর এক ঝটকায় ডুলিটাকে কাঁধে তুলে চলে এল ঘরের বাইরে।
অন্তর এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল। কী বলবে সে? কী বলার আছে তার?
বাবা দাদুকে নিয়ে চলে যাচ্ছে।
ঐ তো বাবা মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
দাদুর মুখটাও আর দেখা যাচ্ছে না।
অন্তর হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, 'শোন বাবা, দাদুকে তো রেখে আসবে। তবে ডুলিটা ফেলে এসো না কিন্তু। ওটা সাথে করে নিয়ে এসো।'
অন্তরের কথা শুনে বাবা অবাক হয়ে ফিরে দাঁড়াল। বলল, 'কেন অন্তর? তুমি ডুলিটা ফিরিয়ে আনতে বলছ কেন?
অন্তর বলল, 'ডুলিটা তো আবার আমাদের দরকার হবে। তুমি বুড়ো হলে তোমাকেও তো দূরে কোথাও রেখে আসতে হবে।'
সাথে সাথে বাবার মুখখানা কালো হয়ে গেল। কি ভয়ানক কথা বলছে অন্তর! বাবা আর এক পা-ও সামনে এগোতে পারল না। দাদুকে নিয়ে আস্তে আস্তে ফিরে এল বাড়িতে।
Everyone has to grow old.
সকলকেই বুড়ো হতে হবে।
ডুলি(একটি শিক্ষণীয় গল্প)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
51
Views
1
Likes
0
Comments
0.0
Rating