স্মৃতির মণিকোঠায় শীতের পিঠাপুলি

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সে দিনগুলির কথা মনে পড়ে এখনো—যখন তৃতীয় শ্রেণীর ছোট্ট ছাত্র ছিলাম আমি। শীতের হিমেল হাওয়ায় গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন জেগে উঠত পিঠাপুলির গন্ধে, উৎসবের রঙে। তবে মামার বাড়ির উৎসব ছিল অন্যরকম। সেখানে সমস্ত খালাতো-মামাতো ভাইবোনের দল জড়ো হলে আনন্দের ঢেউ যেন আকাশ ছুঁয়ে যেত। উৎসবের আগের দিন মেজো মামা এসে নিমন্ত্রণ জানাতেন। তাঁর কণ্ঠে কথা বলার ভঙ্গি আর লাল চেকের গামছায় মোড়া কাঁধ—এসব এখনো চোখে ভাসে। পরদিন বাজার সেরে ফেরার পথে মামা আমাদের নিতে আসতেন। মা কাজের জায়গায় ব্যস্ত থাকলেও আমার তো আর অপেক্ষা সহ্য হত না! মামার হাত ধরে রওনা দিতাম নানার বাড়ির পথে।
আমাদের উঠান থেকে দক্ষিণ দিকে তাকালেই দেখা যেত নানার বাড়ির চালা। মাটির আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে দূরত্ব যত কমত, নানার বাড়ির আঙিনার শব্দগুলো তত স্পষ্ট হয়ে উঠত—হাসির কলরব, গুড়ের রসে ভেজা পিঠার ঘ্রাণ, আর মাটির চুলায় কাঠ ফাটার শব্দ। পথের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়লে মামা তাঁর বাঁশের লাঠিটা কাঁধে রেখে আমাকে আর আমার মামাতো ভাইকে উঁচুতে তুলে নিতেন। তাঁর কাঁধে চড়ে দেখতাম মাঠের পর মাঠ জুড়ে সরষে ফুলের হলুদ চাদর। মনে হত, এই রাস্তা যদি কখনো শেষ না হয়!
সন্ধ্যা নামতেই নানার বাড়ি হয়ে উঠত জীবন্ত এক মেলা। মা, বড় খালা, মেজ খালা—সবাই তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাজির হতেন। বাড়ির আঙিনায় আলো জ্বালাতো মাটির প্রদীপ, আর তার নরম আভায় মিশে যেত আমাদের দৌড়াদৌড়ি আর হৈ-হুল্লোড়। বড়দের গল্পের আসর জমত উঠোনের চৌকিতে। তাঁদের কথায় ফিরে আসত পুরনো দিনের গল্প, ফসলে ভরা মাঠের হিসাব, আর পারিবারিক স্মৃতির ঝাঁপি। রাত যত গভীর হত, চুলার পাশে জড়ো হতাম আমরা। মাটির উনুনে জ্বলত নরম আঁচ, আর তার উপর সেঁজে যেত নকশি পিঠে, পাটিসাপটা, গোকুল পিঠের মতো নানান স্বাদ। নানি নিজের হাতে গড়তেন পিঠাগুলো—মুগডালের ঘন ঘিয়ে ভাজা পুলি পিঠে, আখের গুড়ে মাখা চিতই, আর দুধে ভেজানো মালপোয়ার গন্ধে মুড়িয়ে যেত চারপাশ। আজও জিভে লেগে আছে সেই রসের স্বাদ—শহুরে মেলার ফ্যাংশি পিঠেগুলো যার ধারে-কাছে নেই।
ঘুমের আয়োজন হত একেবারে সহজ-সরল। খড়ের বিছানায় লেপ-কাঁথা গাদা করে আমরা শিশুরা গুঁজি হতাম একসাথে। শীতের রাতে গায়ে গায়ে ঠেস দিয়ে ঘুমানোর যে উষ্ণতা, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকত গোপনে গল্প ফিসফাসানোর মজা। আর সকালে উঠেই চোখে পড়ত উঠোনে মাদুর পেতে বসে থাকা আমাদের দল। নানার হাতে আখের গুড় মিশ্রিত পায়েশের কাঁসার বাটি হাতে নিয়ে প্রতিযোগিতা হত কে কত তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারে!
আজ শহরের পিঠা মেলাগুলোতে গেলে মনে হয়, কিছু যেন হারিয়ে গেছে। রঙবেরঙের নকশি পিঠেগুলো চোখ জুড়ালেও, নানির হাতের ছোঁয়া নেই এখানে। মোবাইলে ছবি তোলার ভিড়ে হারিয়ে যায় স্বাদের আসল মাহাত্ম্য। তবুও যখন শীত আসে, তখন আবারও ফিরে যাই সেই মাটির বাড়ির উঠোনে—যেখানে শুধু পিঠা নয়, জড়িয়ে ছিল প্রাণের উষ্ণতা, সম্পর্কের মিষ্টি রস, আর শীতের সকালের শিশিরভেজা স্মৃতি।
60 Views
0 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: