৩৬ এ জুলাই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাশেই অল্প আলোয় দাঁড়িয়ে আছে নিশাত। তার কাঁধে ঝুলছে একটা পুরনো ব্যাগ, আর হাতে ধরা বাবার সেই ব্যানারটা—যেটা ’৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্যানারে লেখা, "ভবিষ্যতের দাবী করি।"
নিশাতের বয়স এখন একুশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ছে, কিন্তু বইয়ের পাতার বাইরে তার মনে বেশি ঝড় ওঠে। চারপাশের অন্যায়, তরুণদের হতাশা, শিক্ষা-ব্যবস্থার বৈষম্য—সব মিলিয়ে ওর মনে একটা আগুন জ্বলছে। বাবার মুখে বহুবার শুনেছে, কিভাবে তারা সেদিন আন্দোলনে নেমেছিল, কিভাবে গুলি খেয়েও পিছু হটেনি। সেই গল্পগুলোই আজ তার বাস্তবতা।
হিশাম, সাহিত্যের ছাত্র, কিন্তু হৃদয়ে আগুন নিয়ে হাঁটা এক বিপ্লবী কণ্ঠস্বর। সে নিশাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়, বরং নিজস্ব গতিতে গড়ে ওঠা আরেকটি প্রতিবাদী মুখ। ক্যাম্পাসে অনেকেই তাকে চিনত তার কবিতা আর প্রতিবাদী পোস্টের জন্য। "স্বপ্নপোড়ানো কবি" বলে ডাকত অনেকেই। হিশাম নিজেই পোস্টার ছাপাত, সভা ডাকত, আর ভয়হীন কণ্ঠে মঞ্চে দাঁড়াত। তার আন্দোলনের ভাষা ছিল শব্দ আর চোখে আগুন।
২০২৪ সালের এই অভ্যুত্থান হঠাৎ করে শুরু হয়নি। মাসের পর মাস সামাজিক মাধ্যমে জমে উঠছিল প্রতিবাদ, আর আজ তা রাজপথে। সকাল সাতটায় রাজু চত্বরে জড়ো হয়েছে কয়েক হাজার ছাত্র। নিশাত তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, বাবার ব্যানারটা যেন তার অস্ত্র। শ্লোগানে মুখর চারপাশ। কেউ বলছে, "ছাত্র সমাজ জাগছে," কেউ বলছে, "এই ন্যায্য লড়াই বন্ধ হবে না।"
হিশামও আছে ভিড়ের মাঝে। সে মাইক হাতে বলে উঠলো, "আজ যদি চুপ থাকি, কাল কোনো অধিকার আর থাকবে না!" সে কণ্ঠে সাড়া দেয় হাজার হাজার গলা। মুহূর্তেই শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় আকাশ ঝাপসা হয়ে যায়। লাঠিচার্জের শব্দে কেঁপে ওঠে রাজপথ।
নিশাত পড়ে যায়, কিন্তু ব্যানারটা জড়িয়ে ধরে রাখে। তার বুকের কাছে সেই ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, যেন প্রজন্মান্তরের প্রতিজ্ঞা। তখনই গুলির আওয়াজ। হিশাম পড়ে যায়। তার বুক থেকে রক্ত গড়িয়ে মাটি ভিজে ওঠে। নিশাত তখনও বুঝতে পারেনি কী ঘটেছে। হিশাম নিঃশ্বাসের কষ্টে বলে ওঠে, "পানি লাগবে... পানি..."
ঠিক সেই সময় ভিড়ের একপাশ থেকে ছুটে আসে একজন তরুণ—মীর মুগ্ধ। সে কোনো ছাত্র নয়, একজন স্বাধীনচেতা ফ্রিল্যান্সার। আন্দোলনে সে অংশ নেয়নি, কিন্তু পানি আর স্যালাইন হাতে ছুটে বেড়াচ্ছিল আহতদের পাশে। তার হৃদয়ে ছিল নির্ভেজাল মানবতা। হিশামের কণ্ঠ শুনে সে দৌড় দেয়, কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব শেষ। রক্তে ভেজা শরীরটা সে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভাই, একটু ধৈর্য রাখেন…”
পরের মুহূর্তেই গুলি লাগে মীরের বুকেও। সে মুখ থুবড়ে পড়ে মাটিতে। তার হাত থেকে গড়িয়ে পড়ে সেই ছোট বোতলটা, যেটাতে লেখা ছিল—“পানি”। তার ঠোঁটেও একই কথা—"পানি লাগবে… পানি…"
পরে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ছবি, ভিডিও। টেলিভিশন চুপ, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া বলে দেয়—ছাত্ররা আবার জেগে উঠেছে। পরদিন পত্রিকার নিচে এক কোণে একটি ছবি—নিশাত, ব্যানার হাতে, আর তার পেছনে পড়ে আছে হিশাম ও মীর, যাদের ঠোঁটে শেষ কথা ছিল—“পানি লাগবে… পানি…”
এই গল্পটা সেদিনের মতো শেষ হলেও, শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। কারণ যারা পড়ে যায়, তারাই তো ইতিহাস হয়ে ওঠে। শহীদ হওয়া হাজারো ছাত্র, বিশেষ করে মীর মুগ্ধ, আবু সাইদ ও ইমনদের রক্তে লেখা হয় নতুন এক অধ্যায়। তাদের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি হয়ে উঠে আসে নিস্তব্ধতার মাঝে বিদ্রোহের ডাক।
মীর, মুগ্ধ, আবু সাইদসহ অসংখ্য ছাত্র এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগই ভবিষ্যতের প্রজন্মকে মুক্তির পথ দেখাবে।
এই আন্দোলনের পেছনে ছিল আরও অনেক সত্যিকারের নায়ক। তাদের মধ্যেই কয়েকজন—নাহিদ, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম মাহফুজ—যারা সবসময় মাঠে ছিলেন, আন্দোলনের প্রতিটি পর্ব গুছিয়ে তুলেছেন, এবং সারাদেশের ছাত্রদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তারাই ছিলেন এই বিপ্লবের আসল নায়ক—নীরব নয়, দৃঢ় আর নেতৃত্বপ্রবণ।
আর মুগ্ধ ও আবু সাইদ? শহীদের তালিকায় তাদের নাম শুধুই সংখ্যা নয়—আবু সাইদ বুক পেতে গুলি খেয়েছিলেন অন্যদের বাঁচাতে, আর মুগ্ধ রক্তে ভিজিয়েছিলেন প্রতিবাদের মাটি।
তাদের স্বপ্ন, সাহস আর আত্মত্যাগ চিরকাল জ্বলবে প্রতিটি তরুণের চোখে। কারণ ইতিহাস কখনো ভুলে না, যারা নিজের জীবন দিয়ে জাগিয়ে তোলে অন্যদের।
মুগ্ধ এবং সাইদ, তোমাদের আমরা ভুলবো না। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের শহীদের মর্যাদা দান করুন। কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে হাজার সালাম।
২৪ এর আন্দোলন
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
53
Views
1
Likes
0
Comments
0.0
Rating