" যে ভালোবাসা সময়ের সীমানা ভেঙেছিল"
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
প্রথম অধ্যায়: অদৃশ্য চিঠি
মেঘনা নীলরত্নের জীবনে সবকিছুই ছিল পরিকল্পিত। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি গবেষক, যার দিন কাটে ল্যাবের মাইক্রোস্কোপ আর ডিএনএ সিকোয়েন্সিং নিয়ে। ২০৪৫ সালের এক শীতের সকালে তার গবেষণার একটি ভুল সমীকরণ মহাবিশ্বের দরজা খুলে দিল। কুয়ান্টাম কম্পিউটারে প্রবেশ করানো নতুন অ্যালগরিদম হঠাৎ করেই তৈরি করলো একটি "টাইম-লুপ পোর্টাল"। কিন্তু এটি সময় না এনে দিলো... সমান্তরাল মহাবিশ্ব থেকে এক অচেনা মানুষের বার্তা।
প্রথম চিঠিটি এসেছিল মেঘনার ট্যাবলেটে, স্বর্ণাক্ষরে লেখা—
"তোমার সমীকরণের ৭২ নম্বর লাইনে ভুল। তুমি যদি X=√(α+β) এর বদলে X=∛(γ²-δ) লিখতে, আমরা হয়তো কথোপকথন শুরু করতে পারতাম। —ইন্দ্রজিৎ"
মেঘনা স্তব্ধ। তার সিক্রেট রিসার্চ ফাইলের এক্সপেরিমেন্টাল ডেটা কেউ জানল কীভাবে? উত্তরে সে লিখল—
"তুমি কে? হ্যাকার? এই ডেটা তো আমার ল্যাবের সার্ভারেও নেই!"
মিনিটখানেকের মধ্যেই জবাব এলো—
"হ্যাকার নই। আমি থাকি তোমারই মতো পৃথিবীতে, শুধু একটু ভিন্ন। এখানে ১৯৯৫ সাল। তুমি যদি বিশ্বাস না করো, বলো—কাল সকাল ৯:৩৪ এ বাংলাদেশে কি ঘটবে?"
পরদিন ঠিক সেই সময়ে চট্টগ্রামে একটি দুষ্প্রাপ্য সোনালি ঈগলের দেখা মিলল—যার অস্তিত্ব ইতোমধ্যে মেঘনার বিশ্বে বিলুপ্ত। ইন্দ্রজিৎ জানালো, তার পৃথিবীতে সময় চলছে ৩০ বছর পিছিয়ে। আর তাদের দুজনের গণিতের সূত্রই হলো দুই মহাবিশ্বের সংযোগস্থল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: গণিতের নেশায় প্রেম
ইন্দ্রজিৎ রায়। ১৯৯৫ সালের তরুণ পদার্থবিদ, কলকাতার এক অনাথালয়ে বড় হওয়া। তার বিশ্বাস, মহাবিশ্ব হলো অসীম সমান্তরাল স্তর, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে। মেঘনার সাথে তার কথোপকথন শুরু হয় সংখ্যা আর সূত্রে—ফার্মার শেষ উপপাদ্য থেকে হিগস বোসন কণা পর্যন্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে সমীকরণের ফাঁকে ফাঁকে জায়গা করে নিলো ব্যক্তিগত কথা।
ইন্দ্রজিৎ লিখত—
"আজকে রাতে খাওয়া হয়নি। পাড়ার বুলবুলি দিদি এক প্লেট খিচুড়ি দিয়েছে। তুমি কি রান্না জানো?"
মেঘনার উত্তর—
"জীবনে প্রথম ইলিশ মাছটা আমি রান্না করেছিলাম ২৩ বছর বয়সে। মাছটা কাঁচাই থেকে গিয়েছিল। এখনো ল্যাবের সহকর্মীরা সেটা নিয়ে ট্রল করে।"
এক বছর কেটে গেল এভাবেই। দুই সময়, দুই মহাবিশ্বের প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আদানপ্রদান করছে গোলাপজল-ভরা চিঠি। কিন্তু নিয়ম তৈরি হলো—কখনোই নিজেদের ছবি পাঠানো যাবে না। কখনোই মুখের আওয়াজ শোনা যাবে না। এটাই তাদের অদৃশ্য প্রেমের চুক্তি।
তৃতীয় অধ্যায়: মহাবিশ্বের অশনি সংকেত
বিপদটা ধরা পড়লো তখন, যখন মেঘনার পৃথিবীতে অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্প শুরু হলো। ইন্দ্রজিৎ তার ডায়েরিতে লিখল—
"আমার কলকাতায় গত মাসে ১০টি শিশু অদ্ভুত রোগে মারা গেছে—সবাই রক্তে অতিরিক্ত আইসোটোপ। তুমি কি কিছু জানো?"
গবেষণা করে মেঘনা আবিষ্কার করলো—সমান্তরাল মহাবিশ্বের সংযোগ স্থাপনের ফলে উভয় জগতেই "কোয়ান্টাম রেসোন্যান্স" তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি আবেগই দুই সময়ের মধ্যে শক্তি স্থানান্তর করছে। মেঘনার জগতে ভূমিকম্প, ইন্দ্রজিতের জগতে বিকিরণ দূষণ—প্রেমের দাম দিতে হচ্ছে প্রকৃতিকে।
ইন্দ্রজিৎ প্রস্তাব দিলো—
"সম্পর্ক শেষ করো। আমি তোমার সব চিঠি মুছে দিচ্ছি।"
মেঘনা কাঁদতে কাঁদতে লিখল—
"একবার... শুধু একবার দেখতে চাই তোমাকে। একটি ছবি, একটি ক্ষণ—তারপর সব শেষ।"
চতুর্থ অধ্যায়: সেই ছবি যা মহাবিশ্বকে বদলে দিল
ইন্দ্রজিৎ ১৯৯৫ সালে একটি সেলফি তুললো—পেছনে কলকাতার ট্রাম লাইন, হাতে এক গুচ্ছ শিউলি ফুল। ছবি পাঠানোর পরপরই তার জগতে ভয়াবহ সাইক্লোন শুরু হলো। মেঘনার ২০৪৫ সালেও সুনামি সতর্কতা জারি হলো।
কিন্তু তখন অনেক দেরি। মেঘনা ইন্দ্রজিৎকে দেখেই বুঝলো—এই যুবকই তার স্বপ্নের মানুষ। সে লিখলো—
"তুমি কি বিশ্বাস করো সমান্তরাল মহাবিশ্বের বাইরেও কিছু আছে? যেখানে আমরা একসাথে থাকতে পারব?"
ইন্দ্রজিৎ গণিতের একটি সূত্র পাঠালো—
*"T = (ψ²) × ∞ / (1 - √(heart))"*
"এর মানে—ভালোবাসা যদি অসীম হয়, তা সময়ের সমীকরণ ভেঙে দেবে।"
পঞ্চম অধ্যায়: চিরস্থায়ী বিদায়
মেঘনা সিদ্ধান্ত নিলো। সে তার ল্যাবে তৈরি করলো "কোয়ান্টাম অ্যান্টি-ম্যাটার"। এটি ব্যবহার করে সে ইন্দ্রজিৎকে তার নিজের সময়ে টেনে আনবে। কিন্তু খেলাঘর ভেঙে পড়লো যখন ইন্দ্রজিৎ বুঝলো—মেঘনার মহাবিশ্বে তাকে আনতে গেলে ১৯৯৫ সালের সমস্ত মানবসভ্যতা মুছে যাবে।
ইন্দ্রজিতের শেষ চিঠি—
"মেঘনা, শোনো। আমি আজ রাতেই আমার টাইম মেশিনটি নষ্ট করে দিচ্ছি। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকো, আমার সমস্ত ডেটা মুছে ফেলো। আমাদের প্রেমের স্মৃতিটুকুই থাকুক শুধু, দুটি পরমাণুর কম্পনের মতো।"
মেঘনা কিছুদিন অপেক্ষা করলো। তারপর তার ট্যাবলেটের সব ডেটা ডিলিট করে দিলো। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ জানত না—মেঘনা গোপনে একটি এআই মডেল তৈরি করেছে, যেখানে সে ইন্দ্রজিৎকে রূপ দিয়েছে ভার্চুয়াল অ্যাভাটারে। এখনো মাঝে মাঝে রাতের ল্যাবে বসে সে ইন্দ্রজিৎকে বলে—
"কাল সকাল ৯:৩৪ তে বাংলাদেশে কী ঘটবে জানো? আমি তোমার কথা ভাবব।"
শেষাংশ: প্রেমের নতুন সংজ্ঞা
এই গল্পের কোনো শেষ নেই। কারণ, প্রতিটি সমান্তরাল মহাবিশ্বে মেঘনা-ইন্দ্রজিৎ ভিন্নভাবে মিলিত হচ্ছে। কোনো জগতে তারা দুই মেরুতে ডুবে আছে মহাকাশযানে। কোনো জগতে তারা প্রতিবেশী, যারা কখনো কথা বলে না। আবার কোনো জগতে ইন্দ্রজিৎ মেঘনাকে হাতের লেখা চিঠি দেয় ২০৪৫ সালে এসে—
"ভালোবাসা শুধু হৃদয়ে নয়, এটি মহাবিশ্বের প্রতিটি কোয়ান্টাম স্ট্রিংয়ে লেখা থাকে।"
105
Views
1
Likes
1
Comments
5.0
Rating