রঙিন স্বপ্নের কালো ছায়া

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:

আফরিন হোসেন। বয়স ১৩। শহরতলির এক গরিব গ্রামে জন্ম নেওয়া এক চুপচাপ মেয়ে। তার বাবা একজন রিকশাচালক, মা গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে সবার বড়। পড়াশোনায় দুর্দান্ত, স্কুলের শিক্ষকরা তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখত—"এই মেয়েটা একদিন শিক্ষক হবে, সমাজ বদলাবে।"

কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো পুড়ে যায় এক নামের আগমনে—রাফি।

রাফি, ১৮ বছরের এক বাইকওয়ালা যুবক। শহর থেকে এসেছে। মুখে চওড়া হাসি, পকেটে স্মার্টফোন, চোখে মায়া। গ্রামের মেয়েরা তার পেছনে ঘোরে। আফরিন একদিন তার চোখে পড়ে, স্কুল থেকে ফেরার পথে।

প্রথমে কিছু চকলেট, কিছু চিঠি, তারপর প্রেমের অভিনয়।
রাফি বলত—
“তুই আমার জীবন, তুই না থাকলে আমি মরেই যাবো।”
“তোর চোখে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি।”
“তুই তো আমার হবু বউ, একটিবার সময় দে না?”

আফরিনের সরল হৃদয় বিশ্বাস করে। একদিন রাফি তাকে বলে—“তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। একটু দেখা কর।”
আফরিন রাজি হয়।
নিয়ে যাওয়া হয় এক পরিত্যক্ত বাড়িতে।
সেইখানেই ঘটে বিভীষিকা।

চিৎকার, কান্না, হাত জোড় করে বলা—সব ব্যর্থ। সেই দিনটা বদলে দেয় আফরিনের পৃথিবী।

এরপর শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল।
“তোর ছবি ছড়িয়ে দেবো।”
“তুই নিজেই তো ইচ্ছা করে এসেছিস, এখন বলছিস না না!”

আফরিন একা হয়ে পড়ে। পরিবার, সমাজ—কেউ জানে না কিছু। নিজেকে দোষী ভাবতে থাকে সে।

কয়েক সপ্তাহ পর ক্লাসে পড়ে যায়, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ডাক্তার জানায়—আফরিন অন্তঃসত্ত্বা।

বাবা স্তব্ধ, মা পাথর, পাড়া বলে—
“এই বয়সে প্রেম! লজ্জা করে না?”
স্কুল থেকে সাসপেন্ড করা হয়। বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নেয়।

একদিন তার ছোট ভাই স্কুল থেকে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“আপু, বন্ধুরা বলে তুমি নষ্ট মেয়ের মত!”

সেই রাতে আফরিন ছাদে ওঠে। নিজের বাঁচার আর কোনো মানে খুঁজে পায় না। ঠিক তখন, মা এসে কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“তুই মরলে আমি বাঁচবো না মা… আমি তোকে ছাড়া পারবো না।”

সেই মা’র কান্না তাকে ফিরিয়ে আনে।

সাহস করে সে যায় স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে—
“নারী সহায়তা কেন্দ্র – আলোর পথ”।
সেখানে সে শোনে:
— “তুমি দোষী না মা, তুমি ভুক্তভোগী। এখন আমাদের লড়তে হবে।”

আইন শেখে, নিজের অধিকার বোঝে, সাংবাদিকদের সামনে কথা বলে।
পত্রিকায় খবর হয়—“এক কিশোরীর সাহসী প্রতিবাদ”।
মামলা করে। রাফির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।
শেষমেশ রাফি ধরা পড়ে। আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

আফরিন এক কন্যাশিশুর জন্ম দেয়।
মেয়ের নাম রাখে—আলোকিতা।
বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“আমার নাতনি হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আলোর প্রতীক।”
আর মা বলে—
“তুই আমাদের লজ্জা না, তুই আমাদের গর্ব।”

কয়েক বছর পর…
আফরিন একদিন নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে সেই স্কুলে যায়, যেখান থেকে তাকে তাড়ানো হয়েছিল।
স্কুলের প্রিন্সিপাল তাকে দেখে বলে—
“তুমি আসল নায়িকা আফরিন। তুমি সমাজ বদলে দিয়েছো।”


---

টিপস (সচেতনতা ও শিক্ষা):

ভালোবাসার নামে প্রতারণা এবং শিশু নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
একজন মেয়ের ‘না’ মানে ‘না’।
প্রেম যদি সম্মতি ছাড়াই হয়—তাহলে সেটা প্রেম নয়, সেটা সহিংসতা।
সমাজ অনেক সময় মেয়েকেই দোষী বানায়, কিন্তু মেয়েরা যদি চুপ না থেকে লড়ে যায়, তাহলে অপরাধীর মুখোশ একদিন খুলবেই।

ভাঙা মেয়ে মানেই শেষ নয়—ভাঙা মেয়েরাই একদিন সমাজ বদলায়।
71 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: