তোমার অপেক্ষায়

রাহুল
রাহুল
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
তোমার অপেক্ষায়

রাতের শহর সবেমাত্র ঘুমাতে শুরু করেছে। রাস্তার লাইটগুলো মৃদু আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, যেন কারও জন্য অপেক্ষারত। শুভ দাঁড়িয়ে আছে বাস স্টপে, একটা বাসের অপেক্ষায়। তবে সে জানে, এই বাস তাকে গন্তব্যে পৌঁছাবে না—যাকে খুঁজছে, তাকে হয়তো কখনও খুঁজে পাবে না।

চার বছর আগে, এই স্টপেই প্রথম দেখা হয়েছিল তার আর রূপার। বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। রূপার ছাতা ছিল না, আর শুভর ছাতাটা একটু ছোট ছিল দুজনের জন্য। তবু দুজনেই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ভিজে গিয়েছিল। সেদিন থেকেই তাদের গল্পটা শুরু হয়।

একসঙ্গে অনেক গল্প হয়েছে, অনেক স্বপ্ন বুনেছে। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। রূপার পরিবার অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক করে ফেলে। শুভ কিছু বলতে পারেনি, শুধু চেয়ে দেখেছিল কীভাবে তার স্বপ্নগুলো ভেঙে যাচ্ছে।

আজও সে আসে এখানে, একই জায়গায়। জানে, রূপা আর ফিরবে না, তবু তার অপেক্ষার শেষ নেই। হয়তো ভালোবাসা এমনই—যে কখনো কখনো শুধুই অপেক্ষার নাম।

সেদিন হঠাৎ একটা বাস এসে থামে। দরজা খুলে যায়, আর নেমে আসে রূপা!

শুভর মনে হয়, সময়টা যেন আটকে গেছে। চার বছর আগে যেখানে সব থেমে গিয়েছিল, সেখান থেকেই আবার শুরু হলো। তার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে, গলা শুকিয়ে এসেছে।

এতদিনের অপেক্ষা কি আজ শেষ হতে চলেছে?

রূপা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। শুভ লক্ষ করে, তার চোখেও জল চিকচিক করছে। শুভ কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়, যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।

"তুমি কেমন আছো, শুভ?" রূপার কণ্ঠে কাঁপুনি।

শুভ হেসে ফেলে, তবে সে হাসির মধ্যে এক বছরের অপেক্ষার ব্যথা লুকানো। "তুমি বলো?"

রূপা একটু থামে, তারপর বলে, "আমি পালিয়ে এসেছি।"

শুভ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। "মানে?"

"তোমাকে ছাড়া অন্য কারো হতে পারবো না, শুভ। আমি জানতাম, তুমি এখানেই থাকবে।"

শুভ নিঃশব্দে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, কিছু বুঝতে পারছে না। রূপা কি সত্যিই ফিরে এসেছে? নাকি এ শুধুই স্বপ্ন?

"তুমি এখনো আমাকে চাইবে, শুভ?" রূপার চোখে অনিশ্চয়তা।

শুভর চোখে জল চলে আসে। "রুপা,আমি তো কখনো চাইতে বন্ধ করিনি🥺।"

❥♡

শুভ আর রূপা একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। শহরের রাত নিস্তব্ধ, কিন্তু তাদের মনে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এক বছরের অপেক্ষা, হাজারো না বলা কথা, হারানোর কষ্ট—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে।

শুভ রূপার দিকে তাকিয়ে বলে, "তাহলে এবার কোথায় যাবে?"

রূপা একটু হাসে, "যেখানে তুমি যাবে।"

এই উত্তরটা শুনে শুভর ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এতদিন ধরে যে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করেছে, আজ সে ফিরে এসেছে, আর কিছু চাইছে না, শুধু পাশে থাকতে চাইতেছে।

কিন্তু শুভ কি পারবে এতদিনের কষ্ট ভুলে নতুন করে শুরু করতে?

শুভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "তুমি কি ভেবেছো, আমরা আবার ঠিক আগের মতো হতে পারব?"

রূপা শুভর হাত শক্ত করে ধরে। "সব কিছু আগের মতো হবে না, শুভ। তবে নতুনভাবে, আরও সুন্দর করে আমরা শুরু করতে পারি। এবার আর তোমাকে হারাতে চাই না।"

শুভ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর আস্তে করে বলে, "তুমি কি জানো, এই এক বছরে আমি প্রতিনিয়ত এই বাস স্টপে এসেছি? মনে হতো, যদি তুমি ফিরে আসো…"

রূপার চোখে পানি চলে আসে। সে হাত বাড়িয়ে শুভর মুখ ছুঁয়ে দেয়। জড়িয়ে ধরে। "আমি ফিরেছি, শুভ। আর কখনো যাব না। এবার আমায় থামিয়ে দিও না।"

শুভ ধীরে ধীরে রূপার হাত ধরে। উষ্ণতা অনুভব করে, বাস্তবের উষ্ণতা। "তুমি সত্যিই ফিরে এসেছো?"

রূপা মাথা নাড়ে, চোখের কোণে জমে থাকা জল মোছে। "এতদিন আমি নিজেকে বুঝিয়েছি, তুমি শুধু একটা অধ্যায় ছিলে। কিন্তু যতই চেষ্টা করেছি, ততই বুঝেছি—তুমি আমার পুরো গল্প।"

শুভর বুক ধক করে ওঠে। এতদিনের যন্ত্রণা যেন মুহূর্তেই গলে যায়। "তবে এত দেরি কেন, রূপা?"

রূপা একটু হেসে বলে, "কখনো কখনো ফিরে আসতে সময় লাগে, শুভ। আমারও লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো তোমার কাছেই এলাম, তাই না?"

শুভ কিছু বলে না, শুধু গভীরভাবে রূপার চোখে তাকিয়ে থাকে। এই চোখগুলোই একদিন তার জীবনের সব স্বপ্ন গেঁথে দিয়েছিল, আবার এই চোখগুলোই তার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু আজ, এই চোখ দুটোতে সে নতুন করে স্বপ্ন দেখছে।

রূপা আস্তে আস্তে বলে, "তুমি কি জানো, আমি যখন বিয়ের আসনে বসেছিলাম, তখনো মনে মনে চাইছিলাম, তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও। কিন্তু তুমি আসোনি।"

শুভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "আমি জানতাম না, রূপা। আমি ভেবেছিলাম, তুমি খুশি। তাই চলে গিয়েছিলাম, তোমাকে ভালোবাসার শাস্তি না দেওয়ার জন্য।"

রূপা একটু হেসে বলে, "তোমার ভালোবাসা কখনো শাস্তি ছিল না, শুভ। আমি নিজেই আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি পেয়েছি—তোমাকে হারিয়ে।"

শুভ রূপার হাত শক্ত করে ধরে আছে।

রূপা তার চোখে চোখ রাখে, নরম কণ্ঠে বলে, "তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে, শুভ?"

শুভ কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। এতদিনের কষ্ট, হারানোর যন্ত্রণা, অভিমান—সবকিছু যেন মিলিয়ে যেতে চায় এই এক মুহূর্তে। সে শুধু মাথা নাড়ে।

রূপা হেসে ফেলে, একপা এগিয়ে এসে তার কাঁধে মাথা রাখে। শুভর বুকের মধ্যে সব তোলপাড় থেমে যায়। মনে হয়, এতদিন পর সব ঠিক হয়ে গেছে। সব ফিরে পেয়েছে।

ঠিক তখনই—

একটা বাস হর্ণ বাজিয়ে চলে যায়। হে লাইটের আলো শুভর চোখে লাগলে, শুভ চোখ মেলে দেখে, তার চারপাশে কিছুই নেই। রূপা নেই। তার হাত শূন্য। রাস্তার বাতিগুলো ঠিক যেমন ছিল, তেমনই নিঃসঙ্গ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে। নিঃশব্দে হাসে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

"আবার ভুলে গিয়েছিলাম," শুভ আপন মনে বলে।

এক বছর ধরে, এই স্টপে এসে সে একই স্বপ্ন দেখে। প্রতিবার মনে হয়, রূপা ফিরে এসেছে। প্রতিবার সে তার হাত ছুঁতে চায়। কিন্তু বাস্তবে রূপা আর কখনো ফেরেনি।

রূপার বিয়ের পর, শুভ তার জীবন থেকে সরে গিয়েছিল। কিন্তু মন থেকে নয়। সে জানে, তার ভালোবাসা আজও এই রাস্তার বাতিগুলোর মতো—অন্ধকারে জ্বলে, কিন্তু পথ দেখাতে পারে না।

একটা বাস এসে থামে, যাত্রী ওঠানামা করে। শুভ দেখে, রূপার মতো দেখতে একটা মেয়ে নেমে আসে। সে এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে—এ কেবল চোখের ভুল।

সে হাসে, মাথা নাড়ে।

"চল যাই," নিজের মনেই বলে সে, আর ধীর পায়ে হাঁটা দেয়।

পেছনে পড়ে থাকে বাস স্টপ, রাস্তার নিভু নিভু লাইট, আর এক অসমাপ্ত অপেক্ষার গল্প।

শুভ ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে, যেন নিজের সঙ্গে নিজেই পালাচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। প্রতিবারের মতোই সে ভেবেছিল, এবার বুঝি সত্যি রূপা ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে আবার ধাক্কা দিলো।

রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করে। গা ছমছমে এক শূন্যতা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। শুভ একবার ফিরে তাকায় বাস স্টপের দিকে। সবকিছু আগের মতোই—শূন্য, নিঃসঙ্গ।

কিন্তু হঠাৎ, কোথা থেকে যেন ভেসে আসে একটা পরিচিত গন্ধ—রূপার প্রিয় পারফিউমের সুবাস। শুভ চমকে ওঠে।

সে দ্রুত চারপাশে তাকায়। রাস্তার ধারে এক কোণায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঘাড় নিচু করে। চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুভর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।

"রূপা?"

মেয়েটি ধীরে ধীরে মুখ তোলে। একজোড়া গভীর চোখ শুভর দিকে তাকিয়ে থাকে—একটা শূন্য দৃষ্টিতে ভরা।

শুভর শ্বাস আটকে আসে। সেই চোখ!

তারপর, মুহূর্তের মধ্যে, বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায় মেয়েটি। শুভ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, বুঝতে পারে না এটা তার চোখের ভুল, নাকি সত্যিই কিছু ঘটল।

তার হাতের তালুতে যেন এখনো রূপার ছোঁয়া রয়ে গেছে। গা ছমছমে একটা অনুভূতি নিয়ে সে আবার হাঁটা দেয়।

কিন্তু কিছুদূর গিয়েই, মনে হয়, কেউ তার কাঁধে হাত রাখলো।

শুভ থমকে দাঁড়ায়।

পেছনে তাকায়—

কেউ নেই।

রাস্তায় শুধু বাতাসের আওয়াজ আর নিঃসঙ্গ লাইটের মৃদু আলো।

শুভ গভীরভাবে শ্বাস নেয়, তারপর ফিসফিস করে বলে,

"তুমি সত্যিই ফিরে এসেছিলে, রূপা?"

কিন্তু উত্তর আসে না, শুধু রাতের নিস্তব্ধতা তাকে গিলে ফেলে।
---
শুভ থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে নিঃস্তব্ধতা, কেবল বাতাসের হালকা সোঁসোঁ শব্দ। কিন্তু তার কাঁধের ওপর সেই অদৃশ্য স্পর্শ এখনো টের পাচ্ছে যেন।

সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে।

একটা গা ছমছমে অনুভূতি বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে, রূপা এখনো এখানে আছে, খুব কাছেই।

"তুমি ফিরে এসেছো?"

কেউ উত্তর দেয় না। কিন্তু বাতাসে একটা চাপা হাসির মতো শব্দ হয়। যেন রূপার গলায় একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে। শুভর শরীর কেঁপে ওঠে।

সে ধীরে ধীরে রাস্তার ধারে একটা বেঞ্চে বসে পড়ে। মাথার ভেতর সব গুলিয়ে যাচ্ছে। আজকের রাত কি অন্যরকম? নাকি এটাও তার কল্পনারই অংশ?

হঠাৎ পকেটের ভেতর থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। এক মুহূর্তের জন্য, সে যা দেখে, তাতে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

রূপার থেকে একটা নতুন মেসেজ!

কিন্তু... রূপার নম্বর তো সে বহুদিন আগেই ডিলিট করে দিয়েছে!

শুভ দ্রুত মেসেজটা খোলে। একটাই লাইন—

"তুমি আমাকে খুঁজছো কেন, শুভ?"

শুভর আঙুল ঠান্ডা হয়ে আসে। বুকের মধ্যে কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ হয়। সে কাঁপা কাঁপা হাতে উত্তর লেখে—

"তুমি কোথায়?"

কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়। তারপর আবার একটা রিপ্লাই আসে—

"তোমার খুব কাছেই। কিন্তু তুমি কি সত্যিই আমাকে দেখতে পারবে?"

শুভর পুরো শরীর ঘামতে শুরু করে। আশেপাশে তাকায়, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পুরো রাস্তাটা ফাঁকা। এমনকি বাস স্টপেও কেউ নেই। যেন শহরটা হঠাৎ করেই নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে।

তারপর আবার একটা মেসেজ আসে—

"বসে থাকো না, শুভ। উঠে দাঁড়াও। আমি তোমার কাছেই আছি।"

শুভ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চারপাশের বাতাস কেমন ভারী হয়ে গেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

ঠিক তখনই রাস্তার ওপারে একটা মেয়ে দেখা যায়—

লম্বা চুল, পাতলা শাড়ি, শুভ্র মুখ।

রূপা!

শুভ দৌড়ে যায়, কিন্তু ঠিক তার সামনে পৌঁছে…

মেয়েটি মিলিয়ে যায় বাতাসে!

শুভ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় রাস্তায়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার।

তখনই ফোনে আবার একটা মেসেজ আসে—

"তুমি কি সত্যিই মনে করো, আমি ফিরে আসতে পারি, শুভ?"

শুভর শরীর হিম হয়ে যায়। হাত থেকে ফোন পড়ে যায় মাটিতে। তার কানে ভেসে আসে একটাই শব্দ—

একটা চাপা হাসি, আর সাথে রূপার ফিসফিস করা কণ্ঠ—

"তুমি কি এখনো অপেক্ষায় আছো?"

রাস্তার বাতিগুলো হঠাৎ টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করে। বাতাসে কোথাও রূপার পারফিউমের ঘ্রাণ, আবার কোথাও শুধুই শূন্যতা।

শুভ বুঝতে পারে—এই অপেক্ষার কোনো শেষ নেই।
---
শুভ মাটিতে পড়ে থাকা ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। স্ক্রিনটা ফেটে গেছে, কিন্তু তার ভেতরের ভয় আর সংশয়ের চেয়েও সেটা কিছুই না।

আজ একনবছর পরও সে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, একই অপেক্ষা বুকে নিয়ে। কিন্তু আজকের রাতটা কি আসলেই অন্যরকম?

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। বুকের ভেতর ধুকধুক করা শব্দটা কমে আসছে না, তবু সে নিজেকে স্থির করে। তার চোখ দুটো এবার পরিষ্কার।

"না, আর না!"

তার গলা দৃঢ়।

সে রাস্তার লাইটের দিকে তাকায়, বাস স্টপের বেঞ্চের দিকে তাকায়, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

"তুমি ছিলে, তুমি আছো, কিন্তু তুমি আর ফিরবে না, রূপা।"

তার নিজের কথাগুলো শুনে মনে হয়, যেন এক অদৃশ্য বোঝা নেমে যাচ্ছে কাঁধ থেকে। এতদিন ধরে সে নিজেকে আটকে রেখেছিল একটা অসমাপ্ত গল্পের মধ্যে, একটা কল্পনার জগতে, যেখানে সে বারবার হারিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু আজ, আজ সে হারাতে চায় না।

সে রাস্তার ধারে রাখা ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। মোবাইলটা তুলে দেখে—মেসেজগুলো কোথাও নেই।

কিন্তু ছিল কি আদৌ? নাকি সেটাও তার মনের সৃষ্টি?

শুভ এবার একটু হাসে।

"ভালো থেকো, রূপা,"

তারপর সে আর পেছনে তাকায় না।

শহরটা ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু শুভর ভেতরের জগতটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
---
শুভ রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে। বাতাসে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আছে, যেন অনেক দিনের জমানো কষ্টটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু… সত্যিই কি সব শেষ?

পা টেনে টেনে এগিয়ে যায় সে, কিন্তু মনে হয় কেউ বা কিছু তাকে টেনে ধরে রেখেছে।

রাস্তার মোড়ে এসে একবার পিছনে তাকায়।

বাস স্টপটা এখনো নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমন চার বছর আগে ছিল। লাইটের মৃদু আলো, ফাঁকা বেঞ্চ, আর বাতাসের সাথে মিশে থাকা একটুকরো স্মৃতি।

ঠিক তখনই—

একটা ঠান্ডা শিহরণ তার শরীর বেয়ে নামে।

শুভ স্পষ্ট শুনতে পায়—

"তুমি কি সত্যিই চলে যাচ্ছো?"

তার পা থেমে যায়।

চারপাশে কেউ নেই, কিন্তু সেই কণ্ঠটা খুব চেনা, খুব কাছের।

সে গভীরভাবে শ্বাস নেয়, চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে, "এবার আমাকে যেতে দাও, রূপা।"

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর আসে না।

তারপর হালকা বাতাস বয়ে যায়, রূপার পারফিউমের পরিচিত গন্ধ মিশে যায় সেই বাতাসে।

শুভ চোখ খুলে দেখে, রাস্তার লাইটগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। যেন কোনো অদৃশ্য ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে।

সে আর দেরি করে না।

ধীর পায়ে সামনে হাঁটতে থাকে, কিন্তু মনে হয়, পিছন থেকে কেউ তাকিয়ে আছে।

একবার ফিরে তাকায়, আর দেখতে পায়—

বাস স্টপের বেঞ্চে কেউ বসে আছে।

শাড়ির আচঁল বাতাসে উড়ছে, লম্বা চুল গালে এসে পড়েছে।

শুভর চোখের পলক পড়ে না।

তারপর, এক সেকেন্ডের ভেতরেই—

বেঞ্চটা ফাঁকা।

শুভ কাঁপা কাঁপা শ্বাস ফেলে, তারপর একটা বিষাদমাখা হাসি দেয়।

গল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু কিছু গল্প কখনো সত্যি শেষ হয় না।

আর কিছু অপেক্ষা, সত্যিই… অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে।
---
139 Views
1 Likes
1 Comments
3.0 Rating
Rate this: