তুমি আসবে বলে ( পাট ১ )

পলাশ
পলাশ
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাতের আকাশটা আজ বেশ পরিষ্কার। জানালার কাচের ওপাশে জ্বলজ্বল করা তারা গুলো যেন শহরের কোলাহল থেকে আলাদা একটা শান্ত পৃথিবীর বার্তা দিচ্ছে। অনামিকা জানালার পাশে বসে চায়ের কাপে ছোট্ট একটা চুমুক দিলো। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ শব্দে, আর হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনে একটা নতুন মেসেজ ভাসছে—

পলাশ:
"তুমি কি জানো, ধৈর্য ধরতে জানলে ভালোবাসা সবসময় ফিরে আসে?"

অনামিকা মেসেজটা পড়ে একটু মুচকি হাসলো, আবার একটু চিন্তায় পড়ে গেল। পলাশ! এই ছেলেটা সত্যিই অন্যরকম! পাঁচ মাস হয়ে গেল পরিচয়ের, অথচ একদিনের জন্যও সে তাড়াহুড়ো করেনি, কোনো বাড়তি দাবি রাখেনি।

এই যুগে এমন ছেলেও আছে, যে ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করতে জানে?

মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আসছিল, কিন্তু উত্তরগুলো এখনও স্পষ্ট হয়নি। ফোনের কিবোর্ডে হাত রেখে কিছু একটা লিখতে চাইল, কিন্তু ঠিক কী বলবে বুঝতে পারছিল না।

তখনই মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনের কথা, যখন পলাশের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল...

(পাঁচ মাস আগে)

শহরের একটা পুরনো লাইব্রেরি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল। বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে অনামিকা একটু দ্বিধায় ছিল— কোন বইটা নেবে? হাতে একটা বই নিতে যাবে, এমন সময় আরেকটা হাত একই বইয়ের দিকে বাড়লো।

একসঙ্গে দুই হাত স্পর্শ করলো বইয়ের মলাট। অনামিকা চমকে পেছনে তাকালো। ছেলেটা একটু মৃদু হাসলো।

পলাশ:
"তুমি আগে নাও, তবে একটা শর্ত আছে!"

অনামিকা (ভ্রু কুঁচকে): "কী শর্ত?"

পলাশ:
"পড়ার পর আমাকে রিভিউ দিতে হবে!"

অনামিকা (হাসতে হাসতে): "এটা কি নতুন ধরণের ফ্লার্টিং?"

পলাশ (গম্ভীর গলায়): "না, এটা ধৈর্য ধরার প্রথম পাঠ!"

অনামিকা একটু অবাক হলো। এ কেমন ছেলেটা! সাধারণত ছেলেরা নতুন পরিচয়ে মজার কথা বলে, কিছুক্ষণ পরেই নাম্বার চায়, কিংবা সরাসরি ডেটিংয়ের প্রস্তাব দেয়। অথচ এই ছেলেটা বই নিয়ে শর্ত দিচ্ছে!

সেদিনের পর থেকে কেমন করে যেন পলাশ তার জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠলো।

প্রথমে শুধু বই নিয়ে আলোচনা হতো, এরপর ধীরে ধীরে নানা বিষয়ে কথা বাড়তে লাগলো। কখনো জীবনের গল্প, কখনো স্বপ্ন নিয়ে কথা।

কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট ছিল— পলাশ কখনো তাড়াহুড়ো করতো না। সে কখনো হুট করে প্রেমের কথা বলতো না, কখনো অধিকার দেখানোর চেষ্টা করতো না।

শুধু ধৈর্য ধরে পাশে থাকতো।

একদিন সন্ধ্যায় দু’জন হাঁটছিল একটা লেকের ধারে। অনামিকা একটা পাথর তুলে পানিতে ছুঁড়ে মারলো, পানির ওপর কয়েকটা বৃত্ত তৈরি হলো।

অনামিকা: "জীবনটা অনেকটা এই পানির ঢেউয়ের মতো, তাই না?"

পলাশ: "কীভাবে?"

অনামিকা: "কিছু একটা ঘটলে, তার প্রতিক্রিয়া হয়। একটা ঢেউ আসে, তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে যায়..."

পলাশ একটু চুপ করে রইলো, তারপর বললো—
"কিন্তু কিছু ঢেউ কখনো পুরোপুরি মরে যায় না। কিছু ঢেউ চিরকাল থেকে যায়..."

অনামিকা ভ্রু কুঁচকালো— "তুমি বলতে চাচ্ছো কিছু সম্পর্ক কখনো হারায় না?"

পলাশ মৃদু হাসলো— "হয়তো! সম্পর্ক যদি সত্য হয়, যদি কেউ সত্যিই কারো জন্য অপেক্ষা করতে জানে, তাহলে সময় কোনো কিছু বদলাতে পারে না।"

অনামিকা কিছু বললো না। সে পলাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।

এই ছেলেটার মধ্যে একটা আশ্চর্য রকমের ধৈর্য আছে। যেনো সে কাউকে হারানোর ভয় পায় না, তাড়াহুড়ো করে কিছু পেতে চায় না।

তারপর অনামিকা ভাবলো, "এই ভালোবাসাটা অন্যরকম!"
(বর্তমান)

বৃষ্টির শব্দটা আরও বেড়ে গেছে। অনামিকা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

পলাশের মেসেজের উত্তর এখনও দেয়নি।

সে জানে, পলাশ অপেক্ষা করবে।

কিন্তু এই অপেক্ষার মানে কী?

এই ভালোবাসাটা কি সত্যিই সব ভালোবাসার চেয়ে আলাদা?

উত্তর এখনও সে জানে না।

তবে এটুকু বোঝে, তার হৃদয়ে একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।

সে কি সত্যিই অপেক্ষা করছে?

পলাশের জন্য?

[পরবর্তী পর্বে: অনামিকার মনের দ্বন্দ্ব, পলাশের আরও গভীর ভালোবাসা, এবং সম্পর্কের নতুন মোড়…]

251 Views
5 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: