নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রথম দিন থেকেই মায়া কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল। চারদিকে অচেনা মুখ, নতুন পরিবেশ, আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে হৈচৈ। গান-বাজনা, নাচ—সবকিছু চলছিল প্রাণবন্তভাবে, কিন্তু তার যেন কিছুই ভালো লাগছিল না। সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারছিল না সে।
অনুষ্ঠানের মাঝপথেই ক্লান্ত লাগছিল, তাই এক-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণ করেই বাড়ি ফিরে গেল। আসলে, সে খুব মিশুক প্রকৃতির নয়। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার সময় লাগে, আর শরীরটাও তখন কিছুটা দুর্বল ছিল। ঠিক এক সপ্তাহ পর থেকে ক্লাস শুরু হবে—এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিল সে।
ক্লাস শুরু হতেই ধীরে ধীরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল মায়া। পড়াশোনার পাশাপাশি কোচিংয়েও ভর্তি হয়েছিল সে, যেখানে এক মাস ধরে পড়ছিল। কোচিংয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর এক নতুন ছেলের সঙ্গে তার পরিচয় হলো—রিফাত। সে মাত্র ১৫ দিন আগে ভর্তি হয়েছে।
প্রথমদিকে রিফাত বেশ ভদ্র ব্যবহার করত। হাসিমুখে কথা বলত, পড়াশোনার ব্যাপারেও আগ্রহী মনে হতো। মায়া তাকে ভালো মানুষ ভেবে ফেলেছিল। ধীরে ধীরে তারা বন্ধুত্ব গড়ে তুলল। গল্প, আড্ডা—সব মিলিয়ে ভালোই সময় কাটছিল তাদের।
কিন্তু মায়া জানত না, রিফাতের আরেকটি পরিচয় আছে। বাইরে সে একদমই অন্যরকম। এলাকার অনেকেই তাকে ভয় পায়, কারণ সে একজন বখাটে এবং মাস্তান প্রকৃতির ছেলে। কোচিংয়ে সে এই রূপ দেখাত না, তাই সহজেই বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিল।
কোচিংয়েই আরেকজন ছিল, যার নাম সোহান। সে মায়ার সহপাঠী এবং বেশ চুপচাপ প্রকৃতির। কিন্তু সে ছিল সচেতন ও বাস্তববাদী। রিফাতকে সে আগে থেকেই চিনত, তার আসল রূপ সম্পর্কে জানত। প্রথমদিকে কিছু না বললেও, ধীরে ধীরে সে বিষয়টি নজরে আনতে লাগল।
একদিন, কোচিংয়ের বাইরে রিফাতকে কিছু ছেলেদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সোহানের সন্দেহ আরও বাড়ল। তারা ধূমপান করছিল, আর রিফাত কারও সঙ্গে তর্ক করছিল। বিষয়টা পরিষ্কার—রিফাত ভালো ছেলে নয়।
সোহান সরাসরি কিছু বলতে ভয় পেল, কারণ সে জানত, রিফাত বিপজ্জনক হতে পারে। তাই সুযোগ খুঁজতে লাগল।
একদিন কোচিং শেষে মায়া যখন একা ছিল, সোহান ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে বলল,
— "একটা কথা বলব, মন দিয়ে শুনবে?"
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
— "কী কথা?"
সোহান একটু ইতস্তত করল, তারপর বলল,
— "তুমি কি রিফাতকে ভালোভাবে চেনো? মানে, সত্যিকারের রিফাতকে?"
মায়া কপালে ভাঁজ ফেলল।
— "মানে?"
— "মানে, সে আসলে কেমন, সেটা জানো?"
মায়া একটু বিরক্ত হলো।
— "দেখো, আমি কাকে বন্ধু বানাব, সেটা আমার ব্যাপার। তুমি এসব কেন বলছ?"
সোহান কিছুটা কঠিন গলায় বলল,
— "কারণ আমি জানি, রিফাত ভালো না। সে বাইরে একদম অন্যরকম। যদি তুমি চাও, প্রমাণও দিতে পারব।"
মায়ার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। সোহান মিথ্যা বলছে, নাকি সত্যিই কিছু জানে? পরদিন সোহান তাকে রিফাতের কিছু কর্মকাণ্ডের কথা বলল, এমনকি কয়েকটি ছবি দেখাল, যেখানে রিফাত অন্যদের সঙ্গে বাজে কাজে লিপ্ত।
মায়ার হৃদয় কেঁপে উঠল। এতদিন যাকে সে বন্ধু ভেবেছিল, সে কি আসলেই তার যোগ্য?
পরদিন থেকে সে ধীরে ধীরে রিফাতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করল। রিফাত বুঝতে পারল, কিন্তু কিছু বলল না। তবে মায়া জানত, এই সিদ্ধান্তটাই তার জন্য সবচেয়ে ভালো।
সোহান যদি তাকে সতর্ক না করত, তাহলে হয়তো সে না বুঝেই বিপদের দিকে এগিয়ে যেত। সময় থাকতে বুঝতে পেরেছে, তাই নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে।
জীবনে অনেক সময় কিছু সম্পর্ক বিভ্রম তৈরি করে, যেখানে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই বিপদ এড়ানো সম্ভব।
__ সমাপ্ত__
বিভ্রমের আবরণ
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
82
Views
1
Likes
0
Comments
0.0
Rating