সাবেক স্বামী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:


ডিভোর্সের তিন বছর কেটে গেছে। রুহি ভেবেছিল, এই সময়ের মধ্যেই তার পুরনো জীবনের স্মৃতিগুলো মুছে যাবে। কিন্তু কিছু স্মৃতি এতটাই পীড়াদায়ক যে সেগুলোকে মন থেকে মুছতে চাইলেও মুছা যায় না। বিশেষ করে তমালের কথা।

তমাল, তার সাবেক স্বামী। একসময় তারা দুজনেই একে অপরের প্রেমে পাগল ছিল। ছোট্ট একটা বাড়ি, রুহির কাজের চাপ, তমালের চাকরি—সব মিলিয়েও তারা সুখী ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, কাজের চাপ, এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দূরে ঠেলে দেয়। একসময় ডিভোর্সই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

ডিভোর্সের পর রুহি চেয়েছিল নিজের জীবন নতুন করে সাজাতে। তার জীবনে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয় যখন সে কলেজের শিক্ষকতায় যোগ দেয়। অন্যদিকে, তমালের সম্পর্কে রুহি তেমন কিছু জানত না। তিন বছর ধরে তারা কোনো যোগাযোগ রাখেনি।

কিন্তু সেই দিনটির কথা আলাদা।
রুহি তার এক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিল। কাজ শেষে ফেরার পথে বৃষ্টি নামল। রুহি রাস্তার ধারে ছাতার নিচে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ সে শুনতে পেল এক শিশুর কান্না।

"তোমার ছাতা কোথায়, বাবু?" রুহি নিচু হয়ে এক শিশুকে জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটি কিছু বলল না। তার মুখে মিষ্টি একটা নিরীহ চাহনি। তখনই তার পিছনে থেকে কেউ বলল, "আয়, বাবা।"

রুহি ধীরে পেছনে ফিরল। সে যেন ধাক্কা খেল!
"তমাল!"

তমাল অবাক হয়ে তাকাল। "রুহি! তুমি এখানে?"

রুহির ঠোঁট কাঁপছিল। "তুমি... এই বাচ্চাটা...?"

তমাল একটু হাসল। "আমার ছেলে। নাম আর্য।"

রুহি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

অতীতের ছায়া

রাতটা রুহির জন্য দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। তমালকে হঠাৎ দেখা, আর সেই ছোট্ট ছেলেটি—সবকিছু যেন তার মাথায় এক সুনামির মতো আছড়ে পড়ল। তিন বছর আগে তমালকে সে হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু আজ সে আবার তার সামনে। এবং সে এখন একজন বাবা।

পরের দিন রুহি কলেজে গেল। কিন্তু তার মাথায় সব সময় তমালের কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল।

একদিন, রুহি ঠিক করল তমালের সঙ্গে কথা বলবে। তাদের মধ্যে অনেক না বলা কথা থেকে গেছে।


তমাল রাজি হলো দেখা করতে। তারা একটি ক্যাফেতে বসল। প্রথমে কেউই কিছু বলল না।

তমাল কথা শুরু করল। "তুমি কেমন আছ, রুহি?"

রুহি একটু হেসে বলল, "ভালো। কিন্তু তুমি কেমন? আর... আর্য কি তোমার আর..."

তমাল হেসে বলল, "তুমি কি জানতে চাও, আর্যের মা কে?"

রুহি কেবল মাথা নাড়ল।

তমাল একটু চুপ করে থেকে বলল, "রুহি, ডিভোর্সের পর আমার জীবন খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি চাকরির মধ্যে ডুবে থাকতাম। কিন্তু একদিন, আমার এক পুরনো বন্ধু, রীতা, আমার জীবনে আসে। আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। আর্য তারই সন্তান। কিন্তু রীতা..."

তমাল থেমে গেল।

"রীতা কি?" রুহি জিজ্ঞেস করল।

তমাল গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, "রীতা আর নেই। আর্যকে আমি একাই বড় করছি।"

রুহি কথা হারিয়ে ফেলল। তমালকে এতটা একাকী আর ক্লান্ত কখনও দেখেনি।


রুহি আর তমালের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব তৈরি হতে শুরু করল। রুহি প্রায়ই আর্যের সঙ্গে সময় কাটাতে যেত। আর্য ধীরে ধীরে রুহিকে আপন করে নিতে শুরু করল।

একদিন তমাল বলল, "রুহি, তুমি জানো? আমি এখনও মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের ডিভোর্সটা যদি না হত!"

রুহি বিষণ্ণ চোখে তাকাল। "তমাল, আমি জানি আমরা তখন অনেক ভুল করেছি। কিন্তু আমাদের সেই ভুলগুলো মেনে নিতেই তো শেখা উচিত।"

তমাল একটু হাসল। "তুমি ঠিক বলেছ।"

আর্য তখন খেলছিল। সে দৌড়ে এসে রুহির কোলে বসে পড়ল। "রুহি আন্টি, তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে না?"

রুহি আর তমাল একে অপরের দিকে তাকাল।

এই প্রশ্নের উত্তর তারা তখন দিতে পারেনি। কিন্তু তাদের চোখে যে মিষ্টি ভালোবাসার ঝলক ছিল, তা হয়তো নতুন একটি অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

আপনার মতামত জানালে ভালো লাগবে!
80 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: