প্রেম আমার সিজন ২

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
দারোয়ান মতিন দরজার সামনে থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতে নিবে ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে আরিয়ান ওকে ডাক দিল। আরিয়ানের গলা পাওয়া মাত্র মতিনের চোখে মুখে ভয় আর আতঙ্কে এসে ভিড় করল। ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে আসলো। মনে মনে বলল,
" আজকে মনে হয় আমার চাকরিটা আর থাকবেই না। আরিয়ান স্যার নির্ঘাত আমাকে আর চাকরি থেকে বের করে দেবে।

মতিন ভয় ভয় আরিয়ানের দিকে ঘুরলো। মাথাটা নিচু করে কাচামাচু হয়ে আমতা আমতা করে আরিয়ানকে বলল,
" আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার আমি এখনই গেটের কাছে যাচ্ছি প্লিজ স্যার আমাকে চাকরি থেকে বের করে দেবেন না।

আরিয়ান মতিন এর কাছে এগিয়ে এসে তার একটা হাত মতিনের কাঁধের উপর রেখে বলল,
" শান্ত হও আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি।

আরিয়ান মাথা নাড়িয়ে না বোধক সম্বোধন করল। আরিয়ান মতিন কে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে অবলোকন করে বলল,
" কি ব্যাপার তুমি এই জামা কাপড় পড়ে আছ কেন। আমি যে সকালবেলা তোমার রুমে একটা পাঞ্জাবি সহ শপিং ব্যাগ রেখে এসেছিলাম সেটা দেখনি।

মতিন মাথা তুলে আরিয়ানের দিকে তাকালো। মতিন তার রুমে শপিং ব্যাগের ভিতরে একটা পাঞ্জাবি দেখতে পেয়েছিল কিন্তু সে মনে করেছিল হয়তো কেউ ভুলে রেখে গেছে তাই সেটা সরিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সেটা যে আরিয়ান তার জন্য কিনেছিল সেটা সে ভাবতেও পারে নি। সে তো সামান্য একজন দারোয়ান আর দারোয়ানের জন্য কেউ কোন কিছু গিফট হিসাবে রেখে আসবে সেটা সে ভাবতেও পারে না। মতিন নিজস্ব ভাবনায় তলিয়ে আছে।

ওর ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে আরিয়ান বলে উঠলো,
" যাও গিয়ে পাঞ্জাবী টা পড়ে এসো।

মতিন কিছুক্ষণ আরিয়ানের মুখপানে চেয়ে থেকে বলল,
" কিন্তু স্যার....

মতিন সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই আরিয়ান ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
" আর কোন কথা নয় আমি যা বলেছি সেটাই কর। তুমি আমাদের পরিবারের একজন আর আর পরিবারের কোনো সদস্য যদি পারিবারিক অনুষ্ঠানে না থাকে তাহলে সেটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কথাগুলো বলে আরিয়ান ওখান থেকে চলে গেল। মতিনের আজ অনেক খুশি লাগছে খুশিতে তার প্রাণ আত্মহারা হয়ে উঠছে। কখনো সে ভাবতে পারেনি আরিয়ান তাকে এই বাড়ির একজন সদস্য মনে করবে মতিন। মতিন খুশি মনে সেখান থেকে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর ও আরিয়ানের দেয়া পাঞ্জাবিটা পরে আবার বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। আরিয়ান ওকে দেখা মাত্রই হাতের ইশারা দিয়ে ওর কাছে ডাকলো।মতিন সেই দিকে এগিয়ে গেল। আরিয়ান মতিন এর হাতে হলুদের ডালা টা দিয়ে মতিন কে বলল,
" সবার হলুদ দেওয়া হয়ে গেছে একমাত্র তুমি বাকি আছো দাও আমাদেরকে লাগিয়ে দাও।

মতিন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে কি করবে বুঝতে পারছে না। তাকে আরিয়ান থেকে কোন দিন এত বড় সম্মান দেবে সে কখনো ভাবতেই পারে নি। মতিন কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান মতিন এর হাতে হলুদে ডালা টা ধরিয়ে দিয়ে হলুদ মাখিয়ে দিতে বলল। মতিন সামান্য একটু হলুদ নিয়ে সবাইকে একে একে মাখিয়ে দিল।

অনেক হইহুল্লোড় গান বাজনা খাওয়া-দাওয়া সব কিছুতে মেতে উঠলো হলুদ সন্ধ্যা। আরিয়ান সুযোগ বুঝে মাইশাকে এক টান দিয়ে এক পাশে নিয়ে গিয়ে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
" আমার সারপ্রাইজ গুলো কেমন লাগলো বললে না।

মাইশা আরিয়ানের দিকে ঘুরে ও ঠোঁট টা আরিয়ানের কপালে ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
" এতটা ভালো লেগেছে।

আরিয়ান মাইশার দুই গালে ধরে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান এদিক-ওদিক তাকিয়ে আচমকা মাইশার ঠোঁটে নিজের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁটটা মিশিয়ে দিল। মাইশা ও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে আরিয়ানকে। আজমত সাহেবের একটা ফোন আসাতে উনি এদিকে এসেছিলেন ফোনে কথা বলতে। হঠাৎ আরিয়ান আর মাইশাকে এই অবস্থায় দেখে উনি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেলেন। উনি সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে উনার চোখ ঢেকে দৌড়ে স্থান ত্যাগ করলেন। আলিয়া আর সিমা মাইসাকে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে এসে দেখে আরিয়ান আর মাইশা ওখানে আছে। ওরা তো ওদেরকে দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিছুটা লজ্জাও পাচ্ছে।

আলিয়ার মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি চাপলো।আলিয়া সীমা কে নিয়ে ওদের কাছে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে পিছন ঘুরে বললো
" এত প্রেম কোথায় রাখি।

আলিয়ার কথা ওদের কানে যাবা মাত্র ওরা দুজন দুজনের কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। মায়ের সাথে লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে ওর চোখমুখ একদম লাল হয়ে গেল। আরিয়ান তো পুরাই বেকুব বনে গেল। ও কিভাবে পালাবে বুঝতে পারছেনা। আগের সঙ্গে সঙ্গে ওর ফোনটা পকেট থেকে বের করে হ্যালো হ্যালো করতে করতে ওখান থেকে চলে গেল।

মাইশা পালাতে নেবে সঙ্গে সঙ্গে আলিয়া ওর হাত শক্ত করে ধরে বলল,
" এভাবে সারা জীবন আমার ভাইটাকে আগলে রাখিস কেমন। তুই ছাড়া যে আমার ভাইটা নিঃস্ব কখনো ওকে ছেড়ে যাস না।

মাইশা অনেক আবেগে আলিয়াকে জরিয়ে ধরে বলল,
" আমার প্রেমকে ছেড়ে আমি কখনো যাবনা কথা দিলাম।

সীমা ওদের দুইজনের হাত টেনে ধরে বলল,
" ব্যাস অনেক হয়েছে এবার চল তোরা কি এখানে কি রাত পার করে দেবে নাকি।

ওরা তিন জন ওখান থেকে চলে গেল।অনুষ্ঠানের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে গেল তাই যে যার মতো করে চলে যাচ্ছিল। সীমা রিয়াদ ওরা ও চলে যাচ্ছিল সেই মুহূর্তে আরিয়ান ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
" এই বাড়ি থেকে কেউ কোথাও যাবে না তোমরা।আগামীকালকে তিনটি বিয়ে এই বাড়িতেই হবে।

আরিয়ানের এই কথা শোনা মাত্র মাইশা প্রচন্ড পরিমাণে খুশি হল। মাইশার সবথেকে কাছের বান্ধবী আর তার বিয়ে একসাথে হবে এটা ভাবতে মাইশার মনটা খুশিতে ভরে গেল। বৈশাখ কৃতজ্ঞতা বোধক চাহনি দিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে প্রাণবন্ত একটা হাসি দিল। আরিয়ান ওর হাসিটা দেখে তাকিয়ে নিজ মনে বললো,
" এ সুন্দর হাসিটার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি সব।

সন্ধ্যার প্রহর ঘনিয়ে আস্তে আস্তে রাত নেমে এলো। ঘড়ির কথা ঘুরে ঘুরে জানান দিচ্ছে রাত দশটা বাজে। থানায় একটা চেয়ার নিয়ে এক লাঠি হাতে বসে আছে সাব্বির। তার সামনে ভয়ার্থ চেহারা নিয়ে বসে আছে মুরাদ। ভয়ে তার মুখ, কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে আসছে। সে বুঝতে পারছি তার সাথে এখন কি হতে চলেছে।

সাব্বির ওর হাতের লাঠি টা মোড়ের দিকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
" একটা কথা জানিস তো পুলিশ চলে ১৮ ঘা। আমার হাতের এ লাঠি টা ভালো করে দেখে রাখ এটা তোর পিঠে পড়ার আগেই সত্যি কথাগুলো বলে দে।

মুরাদ অনবরত শুকনা ঢোক গিলছে। মুরাদ কোন কথাই বলছে না চুপ করে বসে আছে সাব্বিরের মাথায় যেন রাগ চড়া দিয়ে উঠছে। সাব্বির ওর হাতে লাঠি দিয়ে সজোরে টেবিলের উপর একটা বাড়ি দিয়ে বলল,
" কিরে মুখ খুলবি নাকি আমার হাত চালাবো কোনটা।

মুরাদ ভীমরি খেয়ে গেল। মুরাদ সাব্বিরের কাছে হাতজোড় করে বলল,
" স্যার স্যার মারবেন না আমি সবকিছু বলছি আপনাকে।

সাব্বির কিছুটা নড়েচড়ে বসে বলল,
" কোনরকম মিথ্যার আশ্রয় যদি নিয়েছিস তাহলে তোর খেল এখানেই খতম। মনে রাখিস কথাটা।

মুরাদ বলা শুরু করলো,
" আফজাল স্যার ওই পাচারকারীর গ্যাঙের হয়ে কাজ করতো। আপনি বেশিরভাগ কন্ট্রাক্ট নিয়ে হয় কাউকে খুন করত না হয় কাউকে গুম করত। উনার এই পেশা ওনার স্ত্রীর ভালো লাগতো না। অনেকবার উনাকে বলেছিল এই পেশা ছেড়ে ভালো কোন পেশায় যেতে। কিন্তু উনি ওনার স্ত্রীর কথা শুনতেন না। তাই ওনার স্ত্রীর সাথে প্রায় বছরখানেক আগে উনার ডিভোর্স হয়ে গেছে। আপনি সবার কাছ থেকে গা ঢাকা দিয়ে থাকার জন্য ওই গ্যারেজ দেখাশোনার কাজ করতেন। আর আমি ওই গ্যারেজের লেবার ছিলাম। আমি এর থেকে বেশি আর কিছু জানিনা স্যার।

সাব্বির মুরাদের কাছ থেকে সবকিছু শুনে নিজের রাগটাকে আর কন্ট্রোল করতে না পেরে মুরাদ কে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পড় মেরে বলল,
" এত কিছু জানার সত্ত্বেও কেন আমাদেরকে কিছু জানালি না।

মুরাদ গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
" ভয়তে বলি নি স্যার। আফজাল স্যার মারা যাবার পর কেউ আমাকে ফোন দিয়ে হুমকি দিয়ে বলেছিল আমি যদি এসব কথা কাউকে বলি তাহলে ওরা আমার বউ বাচ্চার ক্ষতি করে দেবে। তাই আমি বাধ্য হয়ে সব কিছু মুখ বুজে থেকে এই চলনের আশ্রয় নিয়েছিলাম স্যার।

সাব্বির মুরাদের কল লিস্ট অনেক আগেই চেক করেছিল। আর সেখান থেকে একটা আননোন নাম্বার পেয়েছিল। তাই মুরাদ যে সঠিক বলছে এটাতে সাব্বির একদম শিওর। কিন্তু ওই নাম্বারটা অনেকবার ডায়াল করার পরেও নট রিচেবল বলছে।

সাব্বির মুরাদকে কড়াভাবে শাসিয়ে বলল,
" এরপর থেকে কোনরকম চালাকের আশ্রয় জেনে নিস ডাইরেক্ট তোর জায়গা হবে জেলে। আর শোন আমি না বলা পর্যন্ত এই এলাকা ছেড়ে কোথাও যাবার চেষ্টা করবি না যদি ভুলেও কোথাও পালাবার চেষ্টা করিস যেখানেই যাস না কেন পুলিশ কিন্তু তোকে ঠিক খুঁজে বের করবে মনে রাখিস।

সাব্বির মুরাদকে করা ওয়ার্নিং দিয়ে ওখান থেকে ছেড়ে দিল। সাব্বির বসা থেকে উঠে পকেটে হাত দিয়ে এ পাশ থেকে ওপাশে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে বলল,
" তুমি ঘুঘু দেখেছো কিন্তু ঘুঘুর ফাঁদ দেখনি। তোমার জন্য সেই পাদ রেডি করা হয়ে গেছে আর খুব শীঘ্রই তুমি সে ফাঁদে পা দিতে চলেছ হয়তোবা আজকে রাত্রেই।

#চলবে .....
313 Views
4 Likes
3 Comments
4.8 Rating
Rate this: