বললো- এইতো সেদিন রাতের ঘটনা। কাজ করতে করতে বেশ খানিকটা রাত হওয়ায় আর পুরাতন কিছু গয়নায় পলিশের কাজটা বাকি থাকায় আমি ঐদিন রাতটা দোকানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সাথে অবশ্য আমারই দোকানের এক কর্মচারী সুভাসও ছিলো। এরকমটা নতুন নয় যে আমি দোকানেই রাত কাটিয়েছি। এর আগেও বেশ কয়েকবার কাজের চাপ থাকায় দোকানে বসেই সারারাত কাজ করে গেছি। কিন্তু ঐদিনের ভয়াবহ রাত আর পাঁচটা সাধারণ রাতের মতো ছিল না।
এই কথাটা বলেই অমিত একটা সিগারেট ধরালো। আমাদেরও তখন ঘোর কাটলো। বাইরে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা নেমে এখন অনেকটাই রাত হয়ে গেছে। চারদিকে কুয়াশা পড়ে গেছে , এমন শীতের রাতে ভৌতিক অভিজ্ঞতা শোনার রোমাঞ্চকর অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো নয়।
এরপর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই অমিত আবার বলা শুরু করলো-তো সেদিন রাতে আমি আর সুভাস দোকানে বেশ গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করার পর দুজনে মিলে যখন একটু অবসর সময় পার করছিলাম ঠিক তখনই দেখলাম কোথা থেকে যেন একটা অল্প বয়সী বাচ্চা মেয়ে, বয়স আনুমানিক দশ কি বারো হবে- আমার কাছে এসে বললো-" আমাকে কিছু খেতে দেবে? অনেকক্ষণ ধরে কিছু না খেয়ে আছি।"
এত রাতে একা একটি বাচ্চা মেয়ের এভাবে আমার দোকানে হঠাৎ আগমন দেখে আমি আর সুভাস বেশ চমকে গেলাম। কি বলবো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তবে বাচ্চা মেয়েটার মুখটা দেখেই কেমন যেন খুব মায়া হচ্ছিলো। তাই তখন আর অতো সাত পাঁচ না ভেবে মেয়েটাকে আমার দোকানে বসিয়ে চানাচুর আর মুড়ি খেতে দিলাম।
রাত জেগে কাজ করা হয় বলে আমি দোকানে প্রায়ই শুকনো খাবার এই যেমন ধর- মুড়ি, চানাচুর, বিস্কুট রেখে দিতাম। তো ঐ মেয়েটাকে খেতে দিয়ে এবারে আমি জিজ্ঞেস করলাম-" তা মামণি এত রাতে তুমি একা একা কি করছো এখানে? কেউ কি সাথে তোমার এসেছে? আর তোমার বাবা মা-ই বা কোথায় চলে গিয়েছে এতো রাতে তোমাকে এখানে একা ফেলে?"
মেয়েটি আমার প্রশ্নগুলো শুনলো কিন্তু তার থেকেও সে বেশি মনোযোগী ছিল আমার দেওয়া খাবারগুলো খেতে। তাই খাওয়ার মাঝে তাকেও আর কোনো প্রশ্ন করে বিরক্ত করলাম না।
এরপর তার খাওয়া শেষ হলে যখন জল চাইলো তখন জল দিতে গিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করলাম যে, মামণি তুমি কোথা থেকে এসেছো? আর যাবেই বা কোথায়? তোমার সাথে কি কেউ এসেছে?
এবারে জলের গ্লাস হাতে নিয়ে বাচ্চা মেয়েটা যা বললো তা যেন আমার আর সুভাসের মাথার ওপর দিয়ে গেলো। বাচ্চা মেয়েটা বললো-" কাকু আমি আমার বাবা মায়ের সাথেই এখানে এসেছি। তারা বাইরেই অপেক্ষা করছে। তারাও না খেয়ে আছে।"
বললাম - " তারা না খেয়ে আছে তো তাদেরও ডাকো। আর তারা তোমাকে একা এখানে পাঠিয়ে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েই বা কি করছে?
এই কথা শুনে বাচ্চা মেয়েটা একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে উঠলো আর তারপর যা বললো তা ছিল আমাদের ভাবানাচিন্তার বাইরে।
বাচ্চা মেয়েটা বললো-" আমার বাবা-মা তো এই মুড়ি চানাচুর খাবে না। এই সামান্য মুড়ি চানাচুরে তাদের ক্ষিদে মিটবে না। তাই তারা খাবারের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে।"
ঐ ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটার মুখে এমন উদ্ভট কথা শুনে আমার আর সুভাস দুজনেরই বেশ খটকা লাগলো। এবার দুজনেই এই বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম বাচ্চা মেয়েটাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে ওর বাবা মায়ের কাছে দিয়ে আসি। হয়তো বাচ্চাটা যে আমাদের দোকানে এসে পড়েছে তা ওর বাবা মা জানেই না। তারা মেয়েকে বাইরে খুঁজে না পেয়ে হয়তো দুশ্চিন্তা করছে।
তাই বললাম -"তাহলে মামণি তুমি এবার চলো তোমার বাবা মায়ের কাছে । নয়তো তোমাকে না পেয়ে তারা খুব দুশ্চিন্তা করবে।"
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মেয়েটা করুণ স্বরে বলে উঠলো-" না কাকু, আমিতো একা একা যেতে পারবো না। তোমাদেরকেও আমার সাথে যেতে হবে। বাইরে অনেক অন্ধকার। আমার অন্ধকারে খুব ভয় করে।"
ভাবলাম বাচ্চা মানুষ তাই হয়তো একা একা রাতের অন্ধকারে বেশ ভয় পাচ্ছে। তাই আমি তখন সুবাসকে বললাম যেন মেয়েটাকে বাইরে ওর বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সুবাস বলে উঠলো-"ক্ষমা করো দাদা, আমি এত রাতে একা একা বাইরে যেতে পারবো না। তার ওপরে নিরিবিলি এই নির্জন পরিবেশে কোথায় কি বিপদ আপদ ঘটে, আর তাছাড়াও এই মেয়েটার কথা শুরু থেকেই আমার খুব অদ্ভুত লাগছে। তাই আমি যেতে পারবো না ওকে এগিয়ে দিতে।"
অগত্যা বেচারা সুবাসকে আর কিছু না বলে এবারে আমিই উঠে দাঁড়ালাম বাচ্চা মেয়েটাকে বাইরে ওর বাবা মায়ের কাছে ছেড়ে দিয়ে আসতে।
বললাম -"চলো মামণি, তোমাকে তোমার বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি।" এবারে আমি সামনে সামনে আর মেয়েটা আমার পিছনে পিছনে আসা শুরু করলো। কিন্তু আমি তখন কল্পনাও করতে পারিনি কি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে চলেছি।
চলবে....
রহস্যময় মেয়েটি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
174
Views
6
Likes
0
Comments
5.0
Rating