শুধু তোমারই জন্য

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়ছে দুই তরুণীর উপর।তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর ফুটপাতে হাঁটছে। গন্তব্য-রেস্টুরেন্ট। একজন প্রচণ্ড নার্ভাস। আর আরেকজন একদম ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে।

- এই লিসা,আমার না প্রচুর নার্ভাস লাগছে (অরিন মুখে একটি চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে বললো)

- এতক্ষণে এই কথাটা তুই কতবার বললি? (লিসা একটি ছোট্ট শ্বাস ফেলে)

- আরে কী করব? I'm nervous (অরিন)

- আচ্ছা আমি বুঝতে পারছি না এত নার্ভাস হওয়ার কী আছে? এর আগেও তো কদিন তুই ছেলেদের সাথে কথা বলেছিস নাকি। আগে যেভাবে কথা বলেছিস, আজকেও সেভাবে কথা বলবি। (লিসা)

- আরে বলেছি তো। কিন্তু সেটা তো আলাদা বিষয়।এতদিন যাদের সাথে মিশেছি সবার সাথে বন্ধু হিসেবে মিশেছি। আর এখানে প্রিফেক্ট হিসেবে মিশতে হবে। ফর্মালি, ভদ্রভাবে বুঝে-শুনে কথা বলতে হবে। উল্টোপাল্টা কিছু বললে আবার কি মনে করবেন ওনারা.. উফ্ আমি আর ভাবতে পারছি না (অরিন)

- অত ভাবতে কে বলেছে?Just chill dear.. !!! (লিসা)

- I can't. (লিসা)

- পারবি না তো চুপ করে থাক।আমার মাথা খাস না। (লিসা)



লিসার কথায় অরিন সত্যি দমে গেলো। মুখে কথা বললো না, কিন্তু হাত কচলাতে লাগলো সে।

_______________________


বেশ কিছুক্ষণ পর অরিন ও লিসা তাদের কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছায়। কিন্তু পৌঁছে দেখে লিওন, ফিহাম ও অনি আগে থেকেই এসে গেছে। অরিন হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারে বেশ কিছুক্ষণ দেরি হয়ে গেছে। এতে অবশ্য তারা একটু অস্বস্তি অনুভব করে।

- Hello everyone!!! (লিসা জোর করে হেসে)

- Hi (সবাই)

- আমরা কী আসতে দেরি করে ফেললাম? (অরিন হাসার চেষ্টা করে)

- না, না আমরাও একটু আগেই এসেছি। খুব বেশি দেরিও হয়নি। (লিওন)

- ওহ। (অরিন মৃদু হেসে)

- তোমরা বসো না... (লিওন)

- Sure. (লিসা)

- এই ফিহাম, আকাশ কখন আসবে রে? (অনি)

- ও তো বলল বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে। (ফিহাম)

- এই তো আমি এখানে।

সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে আকাশ দাঁত বের করে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। অরিন ও লিসা সত্যি বলতে এমন অভিব্যক্তি নিয়ে আকাশের আগমন আশা করেনি। অরিনের মতে আকাশ হলো কলেজের সবচেয়ে গম্ভীর ও অহংকারী৷ তার এভাবে হাসতে হাসতে আশাটা বিরাট অস্বাভাবিক একটা বিষয়।

- নে, শয়তান কা নাম লিয়া, শয়তান হাজির। (লিওন)

- সরি guys একটু late হয়ে গেল (আকাশ চেয়ার টেনে বসতে বসতে)

- As usual, টোটো কোম্পানির গাড়ি। একটা ভুলের জন্য বারবার সরি বলতে তোর লজ্জা করা উচিত আকাশ। (লিওন)

- এই চুপ কর। তোর ঐ পেচার মতো দুর্গন্ধযুক্ত মুখ থেকে যদি আমার নামে আর একটাও খারাপ কথা শুনেছি, তাহলে কিন্তু তোর কপালে শনি আছে। ভুলে যাস না আমি কিন্তু তোদের H.C. (আকাশ শেষ কথাটি গাম্ভীর্যের সাথেই বললো)

- শোন, তুই H.C হলে আমরাও প্রিফেক্ট। আর তাছাড়া তুই H.C সেটা কলেজে, এখানে তুই আমাদের ফ্রেন্ড, শুধু আমাদের বন্ধু। (অনি)


অনি যেন আকাশের গাম্ভীর্যকে ১ শতাংশ পাত্তাও দিলো না। এতক্ষণ ধরে অরিন আর লিসা হা করে এদের কথা শুনছিল। এসব দেখে বিস্ময়ের সপ্তমাকাশে বিরাজ করছে ওরা। এরা কি না কলেজে এক আকাশ পরিমাণ অ্যাটিটিউড নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আকাশের মতো এত না হলেও তার পাশাপাশি লিওনের ব্যক্তিত্ব দেখেও বেশ গম্ভীর ও অহংকারী মনে হয়। কিন্তু এখানে তো তাদের সম্পূর্ণ আলাদা রূপ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে লিওন সামান্য হেসে তাদের দিকে চেয়ে বলল -

- আসলে অনেকদিন পর সবাই একসাথে হলাম তো তাই একটু overact হয়ে গেছে। তোমরা কিছু মনে করো না কিন্তু, হ্যাঁ। (লিওন)

- না না, ঠিক আছে। আমরাও এরকম মজা পছন্দ করি। (লিসা)

- দেখে তো মনে হয় না। (আকাশ)

- আপনাকে দেখতে কে বলেছে? আর শুনুন, আপনাকে দেখেও না মনে হয় না যে আপনার মতো একজন খাটাশ লোক এমন friendly হতে পারে। (অরিন)

- কী বললে তুমি, আমাকে কি নামে ডাকলে? (আকাশ জলন্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে)

- আগে তো জানতাম আপনার মাথা ঠিক নেই এখন তো দেখছি আপনার কানটাও গেছে। (অরিন)

- এই মেয়ে, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। ভুলে যেও না এটা রেস্টুরেন্ট। আর আমি তোমার H.C. তো ফালতু বকা বন্ধ কর। (আকাশ)

- আপনি আমার H.C সেটা কলেজে। আর যে attitudeগুলো দেখান, সেগুলো কলেজে দেখাবেন। এখন আপনি একজন সাধারণ লোক, আর কিছু না। আর বাজে আমি বকছি না। আপনি শুরু করেছেন। (অরিন)

- How abused! Don't cross your limit,okay (আকাশ)


লিওন, অনি ও ফিহাম বিস্মিত নেত্রে তাদের ঝগড়া দেখছে। তাদের বন্ধু যে এত ভালো ঝগড়া করতে পারে, সেটা সম্পর্কে তারা একদমই অজ্ঞাত ছিলো। অরিন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগে লিসা বললো-

- ওরে বাবারে থাম তোরা। কানের পোকা বের করে ছাড়লি আমার। (লিসা)

- সহমত। (অনি)

- আচ্ছা আমরা এখানে কি করতে এসেছি? (লিওন)

- একে অপরের সাথে পরিচিত হতে। (অরিন)

- দেখে তো মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ফ্রিতে ঝগড়া দেখতে এসেছি। (ফিহাম)

- আহ! ফিহাম থাম। আমি কথা বলছি তো। (অরিন আকাশের দিকে তাকিয়ে) আর করছি কি? (লিওন)


দুজনে আপাতত থেমে গেল। কিন্তু মনে মনে একে অপরের গুষ্টির ষষ্ঠী পূজো করছে। লিওন কফি অর্ডার দিল। কফি আসতে আসতে লিওন সিরিয়াস হয়ে বলল -

- মূল বিষয়বস্তুতে আসা যাক। আজকে আমরা সবাই নজরুল হাউসের প্রিফেক্টরা একত্রিত হয়েছি একে অপরকে জানার জন্য, একে অপরকে বোঝার জন্য। এর মূল উদ্দেশ্য একটাই, যেন আমাদের বন্ডিংটা স্ট্রং হয়।আমরা একে অপরকে জানতে পারবো এবং আমরা সবাই বন্ধুর মতন মিশে আমাদের কাজ করব। আমাদের মধ্যে কোন জড়তা থাকবে না। তো চলো,আমরা সবাই নিজেদের পরিচয় দেই।
প্রথমে আমি আমার পরিচয় দিয়ে শুরু করছি -আমি লিওন বাসের। তোমরা সবাই অবগত আছো, আমি তোমাদের মেইন প্রিফেক্ট। আকাশ আর আমি সমবয়সী। আর আমরা ছোট থেকেই বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার বাড়ি *******। আমি আমার মা বাবার সাথে থাকি। এর থেকে বেশি মনে হয় আমার আর জানানোর প্রয়োজন নেই। (লিওন)

- আছে। তুই পড়াশোনা করতে আর চুপচাপ থাকতে পছন্দ করিস। আমি তাহলে শুরু করি। (গলা ঝেড়ে) আমার নাম ফিহাম শাহরিয়ার। আমার বাড়ি ******। থাকি মা বাবার সাথে। আকাশ আর লিওনের সাথে পরিচয় এখানে এসেই৷ খুব একটা participate না করলেও হাউজের কিছু কিছু প্রোগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছি। সবাই আমাকে বলে শান্ত স্বভাবের। কিন্তু নিজে কতটুকু সেটা জানি না। এটাই। এবার অনি বল। (ফিহাম)

- হ্যাঁ৷, হ্যাঁ। আমি অনিকেত ইসলাম। সবাই অনি বলে ডাকে। আমার বাসা *******। মা বাবা আর ভাইয়ের সাথে থাকি। খেতে পছন্দ করি। আর হ্যাঁ, লিওন, আকাশ আর ফিহামের মতো সারাক্ষণ সিরিয়াস মুডে থাকাটা আমি পারি না। আর কি বলব, আর কিছু বলার নেই। (অনি)

- ঐ, এখনো পর্যন্ত যে ৪৮ টা এক্স গার্লফ্রেন্ড হয়েছে, সেটা কে বলবে? (লিওন)

- ৪৮ টা!!!!! (অরিন ও লিসা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে)

- ওই আর কি... (মেকি হাসি দিয়ে অনি)

- আচ্ছা, এরপর অরিন্নীয়া বল। (লিওন)


হঠাৎ নিজের নাম শুনে প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো অরিন। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-

- আব... হ্যাঁ। আমি অরিন্নীয়া শেখ। ডাক নাম অরিন। বড় ভাইয়া, ভাবি মা-বাবা আর ছোট বোনের সাথে থাকি।চুপচাপ থাকতেই পছন্দ করি আর....... (অরিন)

- (অরিনকে বলতে না দিয়ে) আর বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতে। বই হলো ওর কাছে অক্সিজেনের মতো। বাঁচতেই পারবে না ওটা ছাড়া। যাই হোক, আমি নওশিন লিসা। মা বাবার একমাত্র মেয়ে। আর আমি আগে থেকে বলে রাখি আমি বকবক করতে পছন্দ করি। (লিসা)

- আমার সাথে তোমার ভালো মিলবে কিন্তু তাহলে। (অনি)

- আমার introduction তো আর দেওয়ার দরকার নেই। তোমরা তো সবাই চেনোই আমাকে। (আকাশ)

- কি যে মনে করে নিজেকে। (অরিন মনে মনে)

- Listen guys, আমরা কাজ করবো, মজা করবো, খুনসুটি করবো। আনন্দের সাথে সব কাজ করবো। তোমরা নজরুল হাউজের প্রিফেক্টদের আমি তোমাদের মেইন প্রিফেক্ট হিসেবে বলছি, বাইরে যে যেভাবে থাকার থাকো, কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যে যেন কেউ নিজেকে নিউটনের বংশধর বা কলেজে সবার মধ্যে বেস্ট না ভাবে। অহংকার আর গাম্ভীর্য বন্ধুত্বের মধ্যে মানায় না। আর এটা থাকলে কখনো প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়েও ওঠে না। তাই সবার মধ্যে সবাইকে নিয়ে চলার মেন্টালিটি থাকতে হবে। তবে আমি এমন বলছি না যে যারা একটু চুপচাপ, তাদের মধ্যে অহংকার বা অ্যাটিটিউট আছে। তুলনামূলক চুপচাপ আমি নিজেও। কিন্তু একটুখানি শান্ত স্বভাবের হওয়া ও কম কথা বলাটা এক বিষয়, আর ভাব দেখানো আরেক বিষয়। (লিওন)

- শোন, তোদের হাউজে প্রিফেক্ট যারা আছে না, ওদের সাথে কিছুদিন মিশলে বোবাও কথা বলতে শুরু করবে। (অরিনের দিকে তাকিয়ে) তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, যারা চুপচাপ, তাদের প্রাণোচ্ছল হতে বেশি সময় লাগবে না। (আকাশ

- সেটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু আসল কথা হলো, তোমরা অন্য সময় মজা, আড্ডা, যা খুশি করো, এমনকি পৃথিবী উল্টে দাও, আমার সমস্যা নেই। তবে কাজের সময় অবশ্যই সিরিয়াস থাকতে হবে, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের সাথে কাজ করতে হবে। নজরুল হাউজ যেন এবার চ্যাম্পিয়ান হাউজ হতে পারে। আর ঐ চ্যাম্পিয়ান ট্রফি জেতার জন্য সেতু হবো আমরা। (লিওন)

- Exactly, দেখো তোমাদের আজকে একসাথে হওয়ার কারণ, তোমরা যাতে সব ঝড় ঝাঁপটা কাটিয়ে নজরুল হাউসকে সাফল্যের চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারো। তোমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। হাউজকে ভালোবাসতে হবে। তাহলেই সেটা সম্ভব। এক্ষেত্রে তোমাদের একটা কথা বলি, অন্য হাউস বিশেষ করে ফজলুল হাউস থেকে সাবধান থাকবে। ওখানকার মেইন প্রিফেক্ট এবার নীল হয়েছে। ও কিন্তু প্রচুর ঘাড়ত্যারা। যা কিছু করতে পারে নীল। নজরুল হাউসকে বিভিন্নভাবে দমিয়ে রেখে ফজলুল হাউসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে ও। (আকাশ)


এতক্ষণ সবাই মন দিয়ে আকাশ ও লিওনের কথা শুনছিলো। তাদের সবার মুখচোখ কঠিন। আকাশের কথা শেষ হলে অরিন একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলে-

- হুম, বুঝেছি আমাদের সাবধানে পা ফেলতে হবে (অরিন)

- আচ্ছা আমাদের কাজটা ভালো হবে যদি আমরা যেকোনো কাজে ভালোভাবে সমন্বয় করতে পারি। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সবচেয়ে ভালো হবে। আমি তোমাদের নিয়ে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলতে চাচ্ছি। (লিওন)

- Good idea. (সবাই)

তারপর সবার কাছ থেকে নম্বর নিয়ে লিওন একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলল। দীর্ঘ এই পরিচয়পর্ব ও আলোচনা শেষে বিদায় বেলা ঘনিয়ে এলো। সবাই ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

- guys, একটা কথা বলি আজকে আমি যে এখানে এসেছি কেউ যেন এটা জানতে না পারে। (আকাশ)

- তুই নিশ্চিন্তে থাক (লিওন)

- আচ্ছা আমার একটা কথা ছিল। (অনি)

- কথা যখন আছে বলেই ফেল। (আকাশ)

- বলছি আমরা সবাই তো এখন থেকে ফ্রেন্ড। আর ফ্রেন্ডদেরকে তো তুই করে বলাই যায়, তাই না? (অনি)

- সহমত। (লিসা)

- হ্যাঁ, তবে আকাশ আর লিওন ভাইয়া বাদে। কারণ ওনারা আমাদের থেকে দুই বছরের বড়। (অরিন)

- হ্যাঁ হ্যাঁ,জানি বলতে হবে না। (লিসা)


লিসার মুখের অভিব্যক্তি দেখে সবাই হেসে ফেলল।



To_be_continued..................


দেরি করার জন্য দুঃখিত। তবে পর্বটা কিন্তু যথেষ্ট বড়ো ছিলো। এই পর্বটি আপনারা তাড়াতাড়ি পড়ে ফেললে পরবর্তী পর্ব দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করবো।
202 Views
4 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: