তোমার অপেক্ষায়

রাহুল
রাহুল
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
"তোমার অপেক্ষায়"

শীতের শেষ রাত। তুষার ঢাকা পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট এক গ্রাম। গ্রামের মানুষদের জীবন ছিলো খুবই সাধারণ, আর এই সাধারণ জীবনের মাঝে তার মুখটা যেন এক টুকরো রোদ হয়ে ফুটে উঠেছিল। মেয়েটার নাম ছিলো আনুশকা। মিষ্টি মুখ আর দুষ্টু হাসি, যেন জীবন তাকে কখনো ছুঁতেই পারেনি।

গ্রামেরই এক ছেলে, আরিয়ান। শহরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছিল, কিন্তু হৃদয়ের এক টুকরো আনুশকার কাছে রেখে গেছে। ছুটিতে বাড়ি এলেই আনুশকার সঙ্গে দেখা করত। কিন্তু সাহস করে কিছু বলার সাহস কখনো পায়নি।

একদিন সন্ধ্যায় গ্রাম মেলায় দেখা হয় তাদের। আনুশকা ঘুরতে ঘুরতে আরিয়ানের পছন্দের একটি বই কিনে নেয়। সেটা দেখে আরিয়ান হাসতে হাসতে বলে,
"তুমি জানো, এই বইটা আমার প্রিয়?"
আনুশকা মুচকি হেসে উত্তর দেয়, "জানি।"

কথা বাড়ার আগেই আনুশকার বান্ধবীরা ডাক দেয়। আনুশকা চলে যায়, কিন্তু আরিয়ানের মনে এক প্রশ্ন জেগে থাকে—ও কি সত্যিই আমার অনুভূতিগুলো জানে?

সেই রাতেই চিঠি লিখে ফেলে আরিয়ান। চিঠিতে লিখে,
"তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে, তোমার জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে। তুমি কি জানো, তোমার এক ঝলক হাসি আমার দিনটা সুন্দর করে দেয়?"

আর কিছু লিখলো না।
চিঠিটা গোপনে আনুশকার রুমের পাশে রেখে আসে। কিন্তু আনুশকা সেটা দেখতে পায়।

পরদিন বিকেল বেলা, আরিয়ান নদীর ধারে বসে ছিল। হঠাৎ আনুশকা এসে বলে,
"তোমার চিঠি পেয়েছি আমি। কিন্তু একটা কথা বলো—তুমি কি সত্যিই আমাকে বোঝো?"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলে,
"তোমার সবটা বুঝি না, কিন্তু তোমার পাশে থেকে তোমার সবটা বুঝতে চাই।"

আনুশকা কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর বলে,
"আমাদের সময়টা কেবল শুরু হলো, আরিয়ান।"

আনুশকার কথাগুলো আরিয়ানের হৃদয়ে ঝড় তুলে দিল। "আমাদের সময়টা কেবল শুরু হলো"—এই কথাটা তার কাছে যেন হাজার রঙের স্বপ্নের জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু এই স্বপ্নের পথে বাধাও যে থাকবে, তা বুঝতে বেশি দেরি হয়নি।

আনুশকা বলে,
"আমার বাবা খুব রাগী মানুষ। ওরা চায় আমি শহরে গিয়ে লেখাপড়া করি।"
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
"তোমার স্বপ্নের পথে আমি বাধা হব না। তুমি যা চাও, তাই করবে। আমি তোমার পাশে আছি।"

এই কথায় আনুশকা যেন একটু হেসে ফেলে। কিন্তু তার চোখে ছিল চিন্তার ছায়া।

স্বপ্নের পথে দূরত্ব_
শীত শেষে গ্রীষ্ম এলো। আনুশকা পড়াশোনার জন্য শহরে চলে গেল। যাওয়ার আগে আরিয়ানকে বলে গেল,
"লেখাপড়ার চাপ থাকবে। কিন্তু তুমি কথা দাও, কখনো ভুল বুঝবে না।"

আরিয়ান হাসিমুখে প্রতিশ্রুতি দিল। কিন্তু প্রতিদিন তার মনে হতো, এই দূরত্ব তাদের মাঝে এক অদ্ভুত শূন্যতা সৃষ্টি করছে। আনুশকার ফোন কল আসত কম। বার্তা পাঠালে উত্তর পেতে পেতেও সময় লাগত।

একদিন শহরে গিয়ে আনুশকার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয় আরিয়ান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে, আনুশকা এক দলে নতুন কিছু বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতে আছে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল আরিয়ান। তার মনে হচ্ছে, সে যেন এক অপরিচিত মানুষ।
তাই আর দেখা না করে ফিরে চলে আসে।

ফিরে আসার পর থেকে আরিয়ান খুব কম কথা বলত। তার ভেতরে এক ধরনের দ্বিধা ছিল। আনুশকার মনেও চিন্তা জমছিল—সে কি সত্যিই আরিয়ানকে তার জীবনের অংশ করতে চায়?

এক সন্ধ্যায় হঠাৎ আনুশকা ফোন করে বলে,
"তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?"
আরিয়ান গভীর স্বরে বলে,
"রাগ করিনি। শুধু ভাবছিলাম, তুমি আমার চেয়ে তোমার নতুন জীবনের সঙ্গেই বেশি সুখে আছো।"

এই কথা শুনে আনুশকা চুপ হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর বলে,
"তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, নাকি আমার উপস্থিতি শুধু তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে?"

আরিয়ান কিছু বলতে পারেনি।

এরপরের কিছুদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। দুই জনেই নিজেদের মধ্যে হারিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ একটা বিপর্যয় আসে। আনুশকার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। খবর শুনে আরিয়ান কোনো কিছু না ভেবেই গ্রামের হাসপাতালের দিকে ছুটে যায়।

হাসপাতালের বারান্দায় আনুশকাকে দেখে আরিয়ান বুঝতে পারে, তার ভালোবাসা কোনো অভ্যাস নয়, বরং তার হৃদয়ের গভীর চাওয়া। আনুশকা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,
"তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই মেলায় আছি। তুমি কি এখনো ভালোবাসো আমায় ?"

আরিয়ান একটু হেসে বলে,
"আমি চিরকাল তোমার অপেক্ষায় আছি, তোমাকে ভালোবাসি।"

আনুশকার মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।

আরিয়ান আর আনুশকা দুজনেই বুঝতে পারে, তাদের জীবন একে অপরের জন্যই তৈরি। তবে একসঙ্গে থাকতে হলে অনেক বাধা পেরোতে হবে।

আনুশকার বাবা প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু আনুশকা যখন নিজের ভালোবাসার কথা স্পষ্টভাবে জানায়, তখন সে একটু নরম হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আনুশকা তার লেখাপড়া শেষ করবে, আর এরপর দুজনের বিয়ে দেয়া হবে।

সময় এগিয়ে চলল। আনুশকা তার পড়াশোনা শেষ করল, আর আরিয়ান গ্রামে থেকেই নিজের ছোট্ট ব্যবসা গড়ে তুলল। তারা একে অপরকে সময় দিত, কিন্তু কোনো তাড়াহুড়ো করত না। ভালোবাসা যেন তাদের জন্য ধৈর্যের আরেক নাম হয়ে উঠেছিল।

পড়াশোনা শেষ করার পর আনুশকা শহরে একটি ভালো চাকরির প্রস্তাব পায়। কিন্তু সেই চাকরির জন্য তাকে বিদেশ যেতে হবে। এই প্রস্তাব শুনে আরিয়ানের মনে হালকা একটা চিন্তার ছায়া পড়ে। আনুশকা যখন তাকে জানায়, তার চোখেও জল বিন্দু ছিল।

"তুমি কি মনে করো, আমাদের দূরত্ব আবার আমাদের আলাদা করে দেবে?" আনুশকা প্রশ্ন করল।
আরিয়ান হেসে বলল,
"তোমার স্বপ্নই আমার স্বপ্ন, আনুশকা। তুমি যেখানে থাকবে, আমি সেখানেই থাকব—হয় মনে, নয়তো বাস্তবে।"

এই কথায় আনুশকার চোখে জল চলে এলো। কিন্তু সে জানত, তার নিজের জীবনে এগিয়ে যাওয়াও প্রয়োজন।

বিদেশ যাত্রা:
আনুশকা বিদেশে চলে গেল। প্রথমদিকে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। কিন্তু ব্যস্ততা, সময়ের পার্থক্য, আর জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জ তাদের মাঝে একটু দূরত্ব তৈরি করল।

একদিন আনুশকা হঠাৎ ফোন করে বলে,
"তোমার মনে কি কখনো সন্দেহ এসেছে যে আমি তোমাকে ভুলে যেতে পারি?"
আরিয়ান মৃদু হাসি দিয়ে বলে,
"তুমি যদি ভুলেও যাও, তবুও আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। ভালোবাসা কোনো শর্ত নয়, আনুশকা। এটা ধৈর্যের গল্প।"

দুই বছর পর, এক শীতের বিকেলে আনুশকা হঠাৎ গ্রামে ফিরে আসে। ফিরে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে চুপ থাকে। পরে জানায়, সে আর বিদেশে যাবে না ছোট্ট এই জীবনের বাকি সময় টা তার প্রিয় মানুষের সাথে কাটাতে চায় ।

"তোমার কথা ভেবে আমি বুঝেছি, দূরত্ব কোনো বাঁধা নয়। কিন্তু যেটা আমি ভুলে গেছিলাম, তা হলো, ভালোবাসার মানুষকে পাশে পাওয়ার আনন্দ। আমি আর কোনো শূন্য জীবনে থাকতে চাই না, আনুশকা বলে।"

আরিয়ান সেই সন্ধ্যায় আনুশকাকে তার প্রিয় জায়গায় নিয়ে যায়—নদীর ধারে। তারা দুজনে বসে বহুক্ষণ কথা বলে। তাদের মনের সবকথা একে অপরে বলতে থাকে, আর দুজনেই একে অপরের হাতে হাত রেখে বলে,
"এবার আর কোনো দূরত্ব থাকবে না। আমরা আমাদের জীবন একসঙ্গে শুরু করব।"

পূর্ণিমার আলোয় নদীর ধারে আরিয়ান আনুশকাকে বলে,
"তোমার জন্য এই নদীটা আজও বয়ে চলে। আমার ভালোবাসা এই নদীর মতো—অন্তহীন।"
---
★ তাদের জীবন যেন নদীর ধারার মতোই শান্ত, কিন্তু গভীর। তাদের ভালোবাসা প্রমাণ করে, দূরত্ব কিংবা সময় কখনো সত্যিকারের সম্পর্কের বাঁধা হতে পারে না।★
176 Views
3 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: