পলাশের লেখাটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হলো এবং তা শহরের ছোট্ট বইয়ের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু, তার হৃদয়ে যে শূন্যতা ছিল, তা কোনো বই বা লেখায় পূর্ণ হয়নি। একদিন সন্ধ্যায়, পলাশ আবার পার্কে হাঁটছিল, যেখানে তার ও অনামিকার প্রথম দেখা হয়েছিল। এখন সেই পার্ক ছিল একটু ভিন্ন—যতটা সুন্দর, ততটা একা। জীবনের কষ্ট আর স্মৃতির ভার নিয়ে পলাশ হাঁটছিল, কিন্তু তার মন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল।
আজ রাতে কিছুটা ভিন্ন ছিল। সূর্য অস্ত যেতে যেতে আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন আকাশও তাকে তার হারানো ভালোবাসার শোক ভাগ করে নিতে চাচ্ছিল। পলাশ একে একে প্রতিটি গাছের দিকে তাকাল, আর মনে মনে ভাবল, অনামিকা কি এই পথ দিয়েই যেতো?
হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। ফোনে একটি বার্তা—অভি, তার পুরনো বন্ধু, যে এখন শহরের বাইরে থাকে। সে বার্তায় লিখেছিল:
অভি: "পলাশ, তুমি তো জানো, অনামিকা তোমার বইটা পড়েছে। সে এখন খুবই চিন্তিত, তোমার জন্য অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিল।"
এই খবর পেয়ে পলাশের হৃদয়ে যেন হঠাৎ একঝাঁক উল্লাসের ভাব আসে। সে যেন আরও একবার অনুভব করল, কিছু একটা মিস করেছে, তবে এখনও কিছু পরিবর্তন সম্ভব হতে পারে।
তারপর পলাশ নিজেকে প্রস্তুত করল, আজ সে আবার অনামিকার কাছে যাবে। এবার সে জানত, তার জীবনে কিছু একটা করতে হবে। সে আর অপেক্ষা করতে পারছিল না, এবার সে চাইছিল অনামিকার সামনে গিয়ে তার ভুল সংশোধন করতে।
একদিন সন্ধ্যায়, পলাশ অনামিকার বাড়ির দিকে রওনা হয়। পাথরের গলি, ছোট ছোট রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার মনটা পুরোপুরি উদাসীন হয়ে পড়েছিল। সে জানত, অনামিকার জীবন এখন তার নিজের পথে চলে গেছে, কিন্তু সে একবার চেষ্টা করতে চায়, অন্তত তার একটি সুযোগ চায়।
অনামিকার বাড়ির সামনে এসে পলাশ কিছুটা দ্বিধায় পড়ে। সে জানত, এই মুহূর্তে সে যদি অনামিকার সামনে হাজির হয়, তাহলে হয়তো সব কিছু একেবারে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সেও জানত, এটাই তার শেষ সুযোগ। সে সামনে গিয়ে বাড়ির দরজায় আঘাত করল।
দরজা খুলে অনামিকা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে এক ধরণের অদ্ভুত শান্তি ছিল, যেন তার জীবন তার পথে চলে গেছে। পলাশ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
পলাশ: "অনামিকা, আমি জানি, আমার অনেক ভুল ছিল। আমি জানি, আমি তোমাকে অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু আমি চাই তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমার ভুলগুলো ঠিক করতে।"
অনামিকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে পলাশের দিকে তাকাল। তার চোখে কিছুটা অবাক ভাব ছিল, তারপর ধীরে ধীরে সে বলল,
অনামিকা: "পলাশ, তুমি অনেক সময় পেয়েছো, কিন্তু জীবন একটাই। আমি তোমার প্রতি কোনো ক্ষোভ রাখি না, তবে এই জীবন এখন অন্যভাবে চলছে।"
পলাশ কিছুটা হতাশ, তবে সে জানত যে জীবনে কিছু হারানো যায়, কিছু পাওয়ার জন্য আপনাকে অনেক কিছু দেয়ার প্রয়োজন পড়ে।
পলাশ (নিজের মধ্যে): "হ্যাঁ, আমি জানি। তবে আমি তোমার কাছে একটিই চেয়েছি—একটি ক্ষমা।"
অনামিকা একবার গভীরভাবে শ্বাস নিল, তারপর খুব নরম স্বরে বলল,
অনামিকা: "তুমি যা করতে চেয়েছো, তা তুমি ইতিমধ্যে করেছো, পলাশ। তোমার বই পড়ে আমি তোমার ভালোবাসা অনুভব করেছি, কিন্তু এখন আমার জীবন নিজস্ব পথে চলছে। আমি তোমাকে চিরকাল মনে রাখব, কিন্তু আমাদের পথ আলাদা।"
পলাশ এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে সবার সাথে বিদায় নিল। তার মনটা ভেঙে গেল, কিন্তু সে জানত যে জীবন তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
পলাশ (নিজের মধ্যে): "আজ আমি বুঝেছি, প্রেম শুধু একা একা থাকা নয়, কখনো কখনো নিজের ভুল বুঝে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া।"
পলাশ ফিরে গিয়ে নিজের পুরনো লেখার টেবিলের পাশে বসে, একটি নতুন গল্প লিখতে শুরু করল। গল্পের নাম ছিল—"শেষ বিকেলের স্মৃতি"। সে জানত, তার জীবনের গল্প এখন এক নতুন রূপে রচনা হচ্ছে।
শেষ।
এখানে পলাশ তার ভুল বুঝে সামনে এগোবার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও অনামিকা তার জীবন থেকে চলে গেছে। গল্পটি শেষ হলেও, তার অন্তরে এক বিশেষ শান্তি ছিল—ভালোবাসার অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি, যে শেষ বিকেলের স্মৃতিগুলো তাকে চিরকাল তাড়া করবে।
শেষ বিকেলের স্মৃতি (পাট ৫ )
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
167
Views
2
Likes
1
Comments
3.0
Rating