খালিদ থেকে সাইফুল্লাহ

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
হয়রত খালিদ বিন ওয়ালিদ,জন্ম আনুমানিক ৫৯২ খ্রিস্টাব্দে।যার উপাধি সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারি।বলা হয়,ইনি ইসলামের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি।
জুলিয়াস সিজার কিংবা অ্যালেকজেন্ডারের মতো মহান ব্যাক্তিরাও কখনো না কখনো কোন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন।কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদ ১০০ টির অধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন,তিনি জীবনে কোন যুদ্ধে পরাজিত হননি।তিনি ছিলেন অজেয়
খালিদ বিন ওয়ালিদ যখন অমুসলিম ছিলেন তিনি অনেক সাহাবীকে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করেছিলেন।তার রণকৌশলের জন্য উহুদের ময়দানে মুসলিমরা পরাজয়ের সন্নিকটে পৌঁছে গিয়েছিলো।তবে,আল্লাহর রহমতে তারা সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়নি।
খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকলেও,আল্লাহ তাকে ইসলামের একজন সেবক হিসেবে কবুল করে নেন।

খালিদ বিন ওয়ালিদের বীরত্ব সম্পর্কে জানতে হলে,আমাদের যেতে হবে মুতার যুদ্ধের ময়দানে।মুতার যুদ্ধ ছিলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকালে রোমানদের বিরুদ্ধে একমাত্র যুদ্ধ।
হুদায়বিয়ার সন্ধিতে উল্লেখিত ছিলো ১০ বছর পর্যন্ত মুসলিমরা আর মক্কার কুরাইশরা কোন যুদ্ধে জড়াবে না।তো এই সন্ধির পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন।
এতো দিন মক্কার সাথে বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছিলো বলে তিনি এ বিষয়ে খুব একটা মনোযোগ দিতে পারেন নি।
তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শাসকদের কাছে ইসলাম গ্ৰহণ সম্পর্ক চিঠি পাঠান।
সেগুলোর মধ্যে একটি চিঠি তিনি পাঠান রোমান সাম্রাজ্যের এক অঙ্গ রাজ্য এলাকায় বসরায়।রোমান সম্রাটের পক্ষ থেকে সেখানে শাসন করছিলো গাসসান গোত্রের প্রধান সুরাফিল।বলা যায় তার জন্যই মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো।
সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূতকে হত্যা করে।যা একটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বর্
দূত হত্যার বিষয়টা মহানবী(সা.) বা মদিনার মানুষ ভালো চোখে দেখে না।মহানবীর নির্দেশে তৈরি হয় এক সৈন্যবাহিনী,যার সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার।
বাহিনীর সেনাপতির দ্বায়িত্ব দেওয়া হয় জায়েদ বিন হারেসাকে।যিনি কিনা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পালক পুত্র ছিলেন।

মহানবী (সা.) বাহিনীকে বলেন-যদি জায়েদ শহীদ হয় তাহলে তোমাদের সেনাপতি হবে জাফর বিন আবি তালিব।সে শহীদ আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সেনাপতি হবে।আর এই তিনই যদি শহিদ হয়ে যান তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে সেনাপতি নির্বাচন করবে।
রওনা হলো মুসলিম বাহিনী।তাদের উদ্দেশ্য দূত হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।এই বাহিনীতে একজন সাধারণ সৈন্য হিসেবে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.),যিনি কিনা মাত্র ৩ মাস আগে মুসলিম হয়েছেন।
মুতার যুদ্ধই ছিলো ইসলামের পক্ষে তার প্রথম যুদ্ধ।

যাত্রা পথে মুসলিমরা জানতে পারে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে রোমান সাম্রাজ্যের এক লক্ষ সেনা,আর তাদের সাথে যোগ দিয়ে আরও এক লক্ষ আরব খ্রিস্টান।মোট ২ লক্ষ‌।ভেবে দেখুন একবার তিন হাজারের এক বাহিনী মুখোমুখি হয়েছে দুই লক্ষ সৈন্য বাহিনীর।বর্তমানের অনেক ইতিহাসবিদ বলেন রোমানদের সংখ্যা এতো বেশি ছিলো,তবে তারা যে সংখ্যায় মুসলিমদের থেকে কয়েকগুণ বেশি ছিলো তাতে তারা একমত।
মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন।
কিছু সাহাবী বলেন-আমাদের মদিনায় খবর পাঠানো উচিত,হয়তো নবী (সা.) কোন নির্দেশ পাঠাবেন।কিংবা সৈন্য সহায়তা পাঠাবেন।

সেনাবাহিনীর এইরকম অবস্থায় এগিয়ে আসেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)।ইনি সেই ব্যক্তি যাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনীর তৃতীয় সেনাপতি হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।
তিনি বলেন-হয় আমরা যুদ্ধ করবো নয়তো শহীদ হবো।
কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোন উপায় নেই।.........
সেনাপতির কথা শুনে নতুন উদ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে সেনাবাহিনী।
জর্ডানের মুতা নামক স্থানে এই বাহিনী মুখোমুখি হয় রোমান এবং খ্রিস্টান আরব বাহিনীর সাথে।
৮ম হিজরির কোন একদিনে বাহিনী দুটি একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে শহিদ হন জায়েদ বিন হারেসা (রা.)। এরপর যথাক্রমে শহীদ হন জাফর বিন আবি তালিব(রা.) ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)।পর পর তিনজন সেনাপতির মৃত্যুতে মুসলিম বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে।তারা সেনাপতি ছাড়াই যুদ্ধ করতে থাকলে,একসময় বিশিষ্ট সাহাবি সাবিত (রা.) মুসলিম বাহিনীর পতাকা উঁচু করে ধরে মুসলিম বাহিনীকে পরবর্তী সেনাপতি নির্বাচন করতে বলেন।
সৈন্যরা তাকেই দ্বায়িত্ব গ্ৰহণ করতে বলল তিনি তা অস্বীকার করেন।মুসলিম বাহিনী তখন খালিদ বিন ওয়ালিদকে নিজেদের সেনাপতি নির্বাচন করে।
যদিও তিনি মাত্র ৩ মাস আগে ইসলাম গ্ৰহণ করেছিলেন।
খালিদ (রা.) বাহিনীকে রোমানদের সমান্তরালে পুরো
যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেন।তিনি মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন রোমানদের ওপরে।তবে,একসময় মুসলিমরা যুদ্ধ করার শক্তি হারিয়ে ফেলতে থাকে।
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে হঠাৎ মুতা প্রাঙ্গণের দুই পাশের পাহাড়ের ওপর বা পিছন থেকে ড্রামের শব্দ শোনা যেতে শুরু,সাথে অনেক ধুলো উড়তে থাকে।আসলে এটা ছিলো খালিদ বিন ওয়ালিদের রণকৌশল।
রোমানরা মনে করে মদিনা থেকে মুসলিমদের সাহায্য করতে একটি বাহিনী এসে হাজির হয়েছে।

এবার খালিদ ( রা.) এর পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলিম বাহিনী পিছোতে থাকে।দেখে মনে হচ্ছিলো মুসলিমরা চায় রোমানরা তাদের পিছু নিক,আর তারা তাদের বড়ো বাহিনীর সাথে রোমানদের হত্যা করুক।
রোমানরা এধরনের চিন্তার কারণে মুসলিমদের পিছু নেওয়া থেকে বিরত থাকে।
এভাবে মুসলিম বাহিনী নিরাপদে মদিনায় পৌছায়।
মনে করা হয় এ যুদ্ধে ১২ জন মুসলিম শহীদ হন।

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) এর হাতে এই যুদ্ধে ৯টি তলোয়ার ভেঙে যায়।তার বীরত্ব,রণকৌশল দেখে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধি দেন।

এই যুদ্ধের মাধ্যমেই তিনি খালিদ থেকে সাইফুল্লাহ হয়ে ওঠেন।

(অতিরিক্ত তথ্য:-সিরিয়ায় খালিদ (রা.) কবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে খালিদ বিন আল ওয়ালিদ মসজিদ)
110 Views
0 Likes
0 Comments
1.0 Rating
Rate this: