দুঃখের শেষ অধ্যায়

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:

রাকিব এবং মিথিলার প্রেমের গল্পটি ছিল স্বপ্নের মতো। তারা একই কলেজে পড়ত এবং ধীরে ধীরে একে অপরের প্রতি গভীর মায়া তৈরি হয়। মিথিলার হাসি, তার সরলতা, আর রাকিবের আন্তরিকতা তাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিল। দু’জনেই প্রতিজ্ঞা করেছিল, জীবনের সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে একে অপরের হাত ধরে থাকবে।

কিন্তু সমাজের নিয়ম সবসময় প্রেমকে সহজ করে দেয় না। রাকিবের পরিবার ছিল উচ্চবিত্ত এবং রক্ষণশীল। মিথিলা ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, যা রাকিবের পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রাকিব অনেক চেষ্টা করেছিল মিথিলার কথা পরিবারকে বোঝাতে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। তার বাবা-মা তার জন্য এমন একজন মেয়ে পছন্দ করেছিল, যার পরিবারে প্রতিপত্তি ছিল এবং যে মেয়েটি তাদের পরিবারের মানানসই হবে।

কয়েক মাসের মধ্যেই রাকিবের বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়। মিথিলা তার জীবনে অন্ধকার নামতে দেখে। রাকিবকে বোঝানোর চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়। রাকিব অসহায়ভাবে মিথিলাকে বলেছিল, “আমার হাত-পা বাঁধা। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি। এটাই কখনো বদলাবে না।”

মিথিলা তার চোখের পানি লুকিয়ে চলে যায়। এরপর থেকে তারা আর কখনো দেখা করেনি।

রাকিব বিয়ে করে সুমাইয়াকে। সুমাইয়া ছিল শান্ত স্বভাবের এবং শিক্ষিত। তার মনের মাঝে স্বামীর জন্য এক অদম্য ভালোবাসা ছিল। সে রাকিবের সব প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করত। কিন্তু রাকিবের মন অতীতে বন্দি ছিল। সে সুমাইয়াকে আপন করে নিতে পারেনি। প্রতিদিন তার মনে হত, সে যেন মিথিলাকে ধোঁকা দিয়েছে। এই ভ্রান্তিবশত, সে সুমাইয়ার প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করতে শুরু করে।

“তুমি কীভাবে আমার জীবনের অংশ হলে, আমি এখনো বুঝতে পারছি না,” রাকিব প্রায়ই সুমাইয়াকে এই কথা বলত।

সুমাইয়া এই অবহেলা সহ্য করত। সে ভাবত, সময়ের সঙ্গে রাকিবের মন বদলাবে। কিন্তু দিন যতই গড়াতে থাকে, ততই রাকিবের রুঢ়তা বাড়তে থাকে।

একদিন, রাতের খাবারের সময় সুমাইয়া সাহস করে রাকিবকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি আমাকে একটুও ভালোবাসো না?”

রাকিব তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ভালোবাসা? সেই জায়গায় তুমি নেই। আমি তো অন্য কাউকে ভালোবাসতাম। তুমি শুধু আমার জীবনের একটা দায়। এর বেশি কিছু না।”

সুমাইয়া চুপ করে গেল। তার চোখে পানি জমল, কিন্তু সে রাকিবের সামনে কাঁদেনি। সে মনে মনে ভেঙে পড়লেও, রাকিবের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট ছিল।

এই অবহেলা এবং অপমান দিনের পর দিন চলতে থাকে। একসময় সুমাইয়ার শরীর এবং মন উভয়েই দুর্বল হয়ে পড়ে। সে আর এই পরিস্থিতি সহ্য করতে পারছিল না।

একদিন রাকিব অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এসে দেখল, ঘরের পরিবেশ অস্বাভাবিক শান্ত। সুমাইয়া কোথাও নেই। খুঁজতে খুঁজতে সে শোবার ঘরে ঢুকে দেখে, সুমাইয়া সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আছে। তার নিথর দেহ বাতাসে দুলছে।

রাকিব চিৎকার করে উঠল। তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। চোখে পানি চলে এল। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে সুমাইয়ার হাতে থাকা চিঠি খুলল।

চিঠিতে লেখা ছিল:
"আমি জানি, তুমি আমাকে কখনোই ভালোবাসোনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, একবার তোমার মুখে ভালোবাসার একটি কথা শুনতে। কিন্তু তা হয়নি। তোমার জীবন যেন শান্তিতে কাটে, এই কামনা করে আমি চলে গেলাম।"

এই চিঠি পড়ে রাকিবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার অবহেলা আর অহংকারই সুমাইয়ার জীবন শেষ করে দিল।

এরপর রাকিবের জীবনে শুধু একটাই সঙ্গী ছিল—অনুশোচনা। প্রতিদিন সে সুমাইয়ার কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকত। নিজেকে ক্ষমা করার চেষ্টা করত, কিন্তু পারত না।

মিথিলার স্মৃতিও তার মন থেকে মুছে যায়নি। কিন্তু সুমাইয়ার মৃত্যুর পর সে উপলব্ধি করে, জীবনের প্রতিটি সম্পর্কই গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা শুধু পাওয়া নয়, বরং দেওয়া।

একদিন, কবরের পাশে বসে রাকিব বলল, “সুমাইয়া, তোমাকে আমি বুঝতে পারিনি। তোমার প্রতি আমার অন্যায় আমি কখনো ভুলব না। যদি কোনোভাবে আমাকে ক্ষমা করতে পারো, তবে করো। আমার জীবন তোমার সেই ভালোবাসারই কাছে ঋণী।”

তবে সুমাইয়ার সেই ক্ষমা আর কখনো পাওয়া যাবে না। রাকিবের জীবন কেটে গেল অনুশোচনা আর দুঃখের মাঝে।

শেষ কথা:

প্রতিটি সম্পর্কের মূল্য আছে। অবহেলা আর অপমান কখনোই ভালোবাসা জন্ম দিতে পারে না। আমরা যাদের জীবনে আছি, তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়া আমাদের দায়িত্ব। কারণ সময় চলে গেলে, ফিরে আসে না।
136 Views
1 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: