গোধূলি বেলার গল্প

রাহুল
রাহুল
লেখক

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
গোধূলি বেলার গল্প**

বৃষ্টির দিনের মিষ্টি এক বিকেল। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের মৃদু আলোর ঝিলিক পড়ছে শহরের কোলাহলময় রাস্তায়। সেই বিকেলে বাসের এক কোণায় বসে ছিল অরূপ। হেডফোনে গান শুনতে শুনতে জানালার বাইরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখে সে ভাবছিল তার ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটানোর উপায়। হঠাৎ করেই পাশের সিটে এসে বসল একটি মেয়ে। মেয়েটির নাম রিয়া।

রিয়া ছিল একদম অন্যরকম। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত মায়া, আর ঠোঁটে এক হালকা হাসি। অরূপ প্রথমে একটু চমকে গেলেও খুব দ্রুত সামলে নিল। রিয়া হেসে বলল, "সরি, সিটটা ফাঁকা ছিল, তাই বসে পড়লাম।"

অরূপ একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, " আচ্ছা সমস্যা নাই।"

এই ছোট কথোপকথনের মাধ্যমে শুরু হলো তাদের পরিচয়। সেই বাসযাত্রায় তারা জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে লাগল। রিয়া বলল তার জীবনের স্বপ্নের কথা—একদিন সে একটি ক্যাফে খুলবে যেখানে শুধু বই আর কফি থাকবে। আর অরূপ বলল তার পছন্দের বিষয়ে—ছবি তোলা, প্রকৃতি আর ভ্রমণ।

বাস থামার আগে রিয়া অরূপকে একটি বইয়ের নাম বলল, "যদি কখনো সময় পাও, 'ঘরে বাইরে' পড়ে দেখো। এটা আমার খুব প্রিয়।" এই বলে সে বিদায় নিল।

সেদিনের পর অরূপ বুঝতে পারল, রিয়া যেন তার জীবনের এক নতুন আলো। সে সেই বইটি কিনল এবং পড়া শুরু করল। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় রিয়ার কথাগুলো তাকে মনে করিয়ে দিত। কিছুদিন পর অরূপ ঠিক করল, রিয়াকে আবার দেখতেই হবে। কিন্তু রিয়ার কোনো ঠিকানা বা ফোন নম্বর সে জানত না। শুধু মনে ছিল তার সেই মায়াময় হাসি।

অরূপ প্রতিদিন সেই রুটের বাসে উঠত, হয়তো রিয়াকে আবার দেখা যাবে। দিন যেতে লাগল, কিন্তু রিয়ার কোনো খোঁজ পেল না। কিন্তু একদিন, হঠাৎ একটি বইয়ের ক্যাফের সামন দিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখতে পেল রিয়াকে।

ক্যাফের ভেতরে গিয়ে অরূপ বলল, "তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে!" রিয়া চমকে উঠে তাকাল, আর অরূপকে দেখে হাসল। "তুমি তো!" বলে রিয়া বলল, "তুমি সত্যিই 'ঘরে বাইরে' পড়েছ?"

অরূপ হেসে বলল, "পড়েছি, আর সেই বইয়ের মধ্যেই তোমাকে খুঁজে পেয়েছি।"

এরপর তারা একসঙ্গে অনেক সময় কাটাল। রিয়া ক্যাফেতে অরূপকে তার নতুন নতুন বইয়ের সংগ্রহ দেখাত, আর অরূপ তার তোলা ছবি দেখাত। তাদের জীবনের গল্প যেন একটি বইয়ের মতোই খুলে গেল।

একদিন, একটি গোধূলিবেলায়, অরূপ ক্যাফের বারান্দায় বসে রিয়াকে বলল, "তুমি কি জানো, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়?"

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "তাহলে তো আমাদের গল্পটাও সুন্দর হতে হবে।" এই বলে সে হাত বাড়িয়ে দিল অরূপের দিকে।

অরূপ সেই হাত ধরে বলল, "তুমি পাশে থাকলে, আমাদের গল্প কখনো শেষ হবে না।"

গোধূলির আলোয় তাদের হাত ধরাধরি করে থাকা মুহূর্তটা যেন এক শিল্পীর আঁকা ছবির মতো সুন্দর লাগছিল।

--

রিয়া এবং অরূপের সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগল। প্রতিদিনের ছোটখাটো মুহূর্তগুলো যেন তাদের কাছে বিশেষ কিছু হয়ে উঠল। রিয়া ক্যাফের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অরূপ তার প্রতিটি পদক্ষেপে পাশে থাকত। ক্যাফেতে আসা প্রতিটি গ্রাহক, প্রতিটি বই এবং প্রতিটি কফির মগ যেন তাদের জীবনের গল্পে নতুন নতুন অধ্যায় যোগ করত।

একদিন রিয়া একটি নতুন পরিকল্পনার কথা বলল। সে একটি ভ্রাম্যমাণ বইয়ের ক্যাফে শুরু করতে চায়। অরূপ উত্তেজিত হয়ে বলল, "তাহলে তো আমরা পুরো দেশ ঘুরে ঘুরে আমাদের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে পারব।"

রিয়া হাসি মুখে বলল, "তুমি কি সত্যিই আমার এই পাগলামিতে সঙ্গ দেবে?"

অরূপ রিয়ার হাত ধরে বলল, "তুমি যেখানে যাবে, আমি সেখানে।"

তারা মিলে ক্যাফের জন্য একটি ভ্যানে পরিবর্তন আনতে শুরু করল। অরূপ তার ছবি তোলার দক্ষতা ব্যবহার করে ভ্যানটিকে সাজানোর কাজ করল, আর রিয়া বেছে নিল তার প্রিয় বইগুলো। তাদের প্রথম যাত্রা শুরু হলো এক পাহাড়ি এলাকায়।

সেখানে তারা দেখল, মানুষ কতটা বই থেকে দূরে সরে গেছে। রিয়া ও অরূপ মিলে একটি ছোট আয়োজন করল। তারা মানুষের সঙ্গে কথা বলল, তাদের পড়ার অভ্যাস ফিরে পাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করল। ভ্রাম্যমাণ ক্যাফেটি শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিল।

এক সন্ধ্যায়, পাহাড়ের চূড়ায় বসে অরূপ রিয়াকে বলল, "তোমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।"

রিয়া তার কাঁধে মাথা রেখে বলল, "আমার স্বপ্ন তো তুমি। তুমি না থাকলে হয়তো আমি এতদূর আসতেই পারতাম না।"

তাদের জীবন ছিল চলমান। প্রতিদিন নতুন জায়গা, নতুন মানুষ আর নতুন গল্প তাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে তুলছিল। তবে একদিন, একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। পাহাড়ি অঞ্চলের একটি ছোট গ্রামে ক্যাফে চালানোর সময় রিয়া হঠাৎ করে হারিয়ে যায়।

অরূপ হতভম্ব হয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। সে গ্রামবাসীদের কাছে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু কেউ কিছু জানে না। রিয়ার হারিয়ে যাওয়া যেন এক রহস্য। ক্যাফেতে রিয়ার রেখে যাওয়া একটি চিঠি অরূপের হাতে পড়ে।
"প্রিয় অরূপ,

তোমার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। তুমি জানো, আমি কখনোই খুব বেশি কিছু চাইনি জীবনের কাছ থেকে। কিন্তু তোমার সঙ্গে কাটানো সময় আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা কতোটা সুন্দর হতে পারে।

তবে আমার জীবনে এমন কিছু দায়িত্ব আছে, যা আমাকে একা সামলাতে হবে। এমন কিছু বাঁধা, যা আমাকে পেছনে টেনে ধরে রাখছে। আমি জানি, তুমি হয়তো এই কথাগুলো বুঝতে পারছ না। আর আমি তোমাকে এই কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু এটাই সত্যি—আমাদের পথ এখানেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

তুমি আমার জন্য যা কিছু করেছ, তার জন্য আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব। তোমার হাসি, তোমার যত্ন, তোমার প্রতিটি শব্দ—এসবই আমার হৃদয়ে চিরকাল থাকবে। আমি চাই, তুমি তোমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করো। কারণ তুমি সবচেয়ে বেশি যোগ্য এই সুখের।
ভালো থেকো, অরূপ।
148 Views
2 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: