অন্ধকারের পর আলো

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বিয়ের পর প্রথম কয়েকটি মাস খুব সুন্দর ছিল। রিয়া ভেবেছিল, তার স্বপ্নের জীবন শুরু হয়েছে। সুমনের সাথে তার বিয়ে পরিবারের পছন্দে হলেও, সে মনে করেছিল, ভালোবাসা সময়ের সাথে গড়ে উঠবে। সুমন শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, আর প্রথমদিকে তার প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল ছিল। কিন্তু সেই যত্নশীলতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

বিয়ের ছয় মাস পর থেকেই সুমনের আচরণ বদলাতে থাকে। সে রিয়ার সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার শুরু করে। কোনো কারণ ছাড়াই মেজাজ দেখানো, রিয়ার পোশাক নিয়ে কটূক্তি করা, এমনকি তার রান্নার সামান্য ভুলেও রাগ করা যেন সুমনের অভ্যাস হয়ে উঠেছিল।


এক সন্ধ্যায়, রিয়া সুমনের পছন্দমতো চা বানায়নি বলে সুমন ক্ষুব্ধ হয়ে চায়ের কাপ ভেঙে ফেলে। রিয়া ভেবেছিল, হয়তো সুমন কাজে চাপের কারণে এমন করছে। কিন্তু সেইদিন প্রথমবার সুমন রিয়ার গালে চড় মারে। রিয়া স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল, এটি হয়তো একবারের ঘটনা। সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো সুমন তার রাগের জন্য পরে ক্ষমা চাইবে।

কিন্তু ক্ষমার পরিবর্তে সুমনের আচরণ আরও খারাপ হতে শুরু করে। সামান্য বিষয়ে চিৎকার, তাকে অপমান করা, এমনকি শারীরিক নির্যাতনও নিয়মিত হয়ে উঠল। রিয়া একদিন তার মা-বাবাকে সব কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার ভেতরে ভয় কাজ করল—তারা হয়তো বলবে, "সব মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রথমদিকে এ রকম সমস্যায় পড়ে। ধৈর্য ধরো।"


রিয়া তার বিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। সে সুমনের পছন্দ অনুযায়ী সবকিছু করতে শুরু করেছিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সুমন দিন দিন আরও হিংস্র হয়ে উঠছিল। তার বন্ধুদের সামনেও সে রিয়াকে অপমান করতে ছাড়ত না।

একদিন সুমন রিয়ার হাতে টাকা দিয়ে বলল, "এই টাকা দিয়ে আমার বন্ধুদের জন্য মজাদার খাবার বানাও। মনে রেখো, কোনো ভুল যেন না হয়।" রিয়া মন দিয়ে রান্না করল। কিন্তু খাওয়ার সময় সুমন খাবারটিকে "অখাদ্য" বলে চেঁচিয়ে উঠল। সে রিয়াকে সকলের সামনে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিল।

রিয়ার চোখ দিয়ে কান্না ঝরছিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। কারণ তার মনে হচ্ছিল, বললেও কেউ তাকে বুঝবে না।


একদিন রিয়া ঠিক করল, সে আর এই নির্যাতন সহ্য করবে না। কিন্তু কোথায় যাবে? বাবা-মা কি তাকে গ্রহণ করবে? সমাজ কি তাকে ক্ষমা করবে? এসব ভাবতে ভাবতে তার রাত কেটে যেত।

এমন সময় তার কলেজের এক বান্ধবী, তৃণা, রিয়ার সাথে যোগাযোগ করল। তৃণা রিয়ার মুখ দেখে বুঝতে পারল, তার জীবনে কোনো গভীর সমস্যা চলছে। তৃণা তাকে জিজ্ঞাসা করতেই রিয়া কেঁদে ফেলল। সব কথা খুলে বলল।

তৃণা বলল, "রিয়া, নির্যাতন সহ্য করো না। এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তুমি সাহায্য চাইতে পার। আমাদের দেশে এখন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন আছে।"

তৃণার কথা শুনে রিয়া নতুন করে ভাবতে শুরু করল। তৃণা তাকে একটি নারী সহায়তা সংস্থার ঠিকানা দিল।


পরের দিন রিয়া সাহস করে সেই সংস্থায় গেল। সেখানে তার কথা শুনে সবাই তাকে সাহস দিল। তারা বলল, "তুমি চুপ করে থাকলে সুমনের এই নির্যাতন কখনো থামবে না। নিজের জন্য দাঁড়াও।"

রিয়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবল। সুমন যখন জানতে পারল যে রিয়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে যাচ্ছে, সে আরও ভয় দেখানোর চেষ্টা করল। কিন্তু এবার রিয়া ভয় পায়নি। সে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করল।


সুমন গ্রেপ্তার হলো। প্রথমবারের মতো রিয়া নিজের জীবন নিয়ে ভাবার সময় পেল। সে বুঝল, জীবন সুমনের নির্যাতনে আটকে থাকার জন্য নয়।

রিয়ার বাবা-মাও শেষ পর্যন্ত তাকে সমর্থন করল। তারা বলল, "আমরা জানতাম না, তুমি এত কষ্টে ছিলে। আমাদের সঙ্গে আগে ভাগেই বললে ভালো হতো।"

রিয়া নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য একটি চাকরি খুঁজে নিল। সে ধীরে ধীরে জীবনে এগিয়ে চলল। তৃণা সবসময় তার পাশে ছিল। রিয়া বুঝতে পারল, নিজেকে ভালোবাসা এবং নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আজ রিয়া একটি নারী অধিকার সংস্থায় কাজ করে। সে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্য নারীদের সাহস দেয়। তার গল্প শোনার পর অনেক নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা পেয়েছে।

রিয়া জানে, অন্ধকার একসময় আলোতে মিশে যায়। সে এখন নিজের আলো খুঁজে পেয়েছে।
93 Views
4 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: