আল্লামা সায়্যৈদ সুলাইমান নাদবী সংক্ষিপ্ত জীবনী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
জন্ম ও বংশ পরিচয়:- সাইয়্যেদ সুলাইমান নাদবী ২২ নভেম্বর ১৮৮৪ সালে ভারতের বিহারের নালন্দা জেলার দেশনা গ্রামে ( ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পাটনা জেলায় ) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা হাকিম সাইয়্যেদ আবুল হাসান ছিলেন একজন সুফি ও চিকিৎসক।
পিতা ও মাতার দিক থেকে হযরত সাইয়্যেদ সুলাইমান নাদবী (র:) ছিলেন হযরত ইমাম হোসাইন (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু) র বংশধর।
প্রাথমিক + উচ্চ শিক্ষা :- সেই সময়ের নিয়মানুযায়ী ঘরের মক্তবে গ্রামের ই শিক্ষক সাইয়্যেদ মাকসুদ আলী র থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন এবং পরে নিজের বড় ভাই সাইয়্যেদ আবু হাবিব (রঃ) এর কাছে প্রাথমিক আরবী শিক্ষা লাভ করেন। সাইয়্যেদ সাহেব ১৮৯৮ সালে ফুলওয়ারী শরীফ (পাটনা) গমন করেন এবং মাওলানা শাহ মহিউদ্দীন ও সুলাইমান ফুলওয়ারী র শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ফুলওয়ারী তে একবছর কাটিয়ে ১৮৯৯ সালে দারভাঙ্গাতে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ইমদাদিয়াহ তে পড়াশোনা করেন, ঠিক সেই সময়ে নাদওয়াতুল উলামার সপ্তম বার্ষিকী জলসা পাটনা শহরে অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই জলসায় সাইয়্যেদ সাহেব তাঁর পিতার সঙ্গে উপস্থিত হন।
সেই সময়ের অনুভূতি সাইয়্যেদ সাহেব নিজ কলমে মাসিক পত্রিকা মা'আরিফে ১৯৫০ সালে জুলাই মাসে তুলে ধরেন - উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাটনা তে নাদওতুল উলামা "র বার্ষিকী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে উৎসাহ ও উদ্দিপনা ছিল দেখার মতো। এটি ই ছিল প্রথম সম্মেলন যেখানে একত্রিত হয়েছিল উলামা মাশায়েখ তো অন্যদিকে ছিল ব্যারিস্টার, শিক্ষাবিদগণ (পার্থিব শিক্ষা র) । একতার প্লাটফর্ম থেকে তাদের মিলিত চিন্তা ভাবনা ছিল মুসলিম উম্মাহ কে নিয়ে। আমিও আমার পরিবারের বড়দের সাথে এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করলাম। এই সভার একটি চিত্তাকর্ষক দৃশ্য সেদিন অবলোকন করলাম যে, একজন কোট প্যান্ট পরিহিত ব্যারিস্টার বক্তৃতা করছেন, যিনি নিজেও কাঁদলেনএবং বড় বড় উলামা মাশায়েখ দের কাঁদালেন। অনুষ্ঠান শেষে আমার অদম্য ইচ্ছা ডানা মেলে উড়াল দিল এবং আমি লক্ষনৌ এসে পৌঁছালাম। নাদওয়াতুল উলামার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে গেলাম। এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতবর্ষের সেই সময়ে উলামা ও মহান ব্যক্তিদের কেন্দ্র ছিল।

শিক্ষ সমাপ্তি ও দস্তার বন্দী:- ১৯০৭ সালে সৈয়্যেদ সাহেব শিক্ষার শেষ বর্ষে ছিলেন।লক্ষনৌ এর রিফাহে আ'ম ক্লাবে দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার দস্তার বন্দী (পাগড়ী প্রদান)র জলসা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে দেশের মাশায়েখ , উলামা ও বুদ্ধিজীবীদের সমাগম ঘটে । সেখানে আল্লামা সুলাইমান নাদবী আরবী ভাষায় এমন জোরালো ভাষণ প্রদান করেন যে উপস্থিত সকলেই অবাক হয়ে যায়।
সৈয়্যেদ সাহেব হায়াতে শিবলী তে লেখেন যে, " আল্লামা হযরত শিবলী (র:) তাঁর ছাত্রদের এই অনুষ্ঠানে উপস্থাপনের জন্য কিছু বিষয় তুলে ধরে কার্যকর বক্তৃতা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সৈয়্যেদ সাহেব আধুনিক ও প্রাচীন বিজ্ঞান বিষয়ে বক্তৃতা করেন এবং বক্তৃতার সময় এমন একটি ঘটনা ঘটে যা সভাকে স্তম্ভিত কোরে তোলে এবং দর্শকদের চমকে দেয়। বক্তৃতার মাঝে কোন এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বললেন যে, আপনি যে বক্তৃতা উর্দূ তে করেছেন সেটা যদি আরবীতে করেন তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে নাদওয়ার শিক্ষার গুনমান কে স্বীকার করে নেব। তিনি স্টেজে উঠলেন এবং উর্দূ বক্তৃতা টি আরবীতে সাবলীলভাবে করতে লাগলেন। আল্লামা শিবলী (র:) তাঁর বক্তৃতা শুনে স্টেজে এসে জিজ্ঞাসা করলেন যদি অন্য বিষয়ের উপর আরবীতে বক্তৃতা করতে বলা হয় , তাহলে তুমি কি পারবে ? সৈয়্যেদ সাহেব হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন। জনতার মধ্যথেকে খাজা গোলাম আছছাক্বলাইন " যিনি তৎকালীন লক্ষনৌ এর একজন আইনজীবী ছিলেন " সৈয়্যেদ সাহেব কে "ভারতবর্ষে ইসলাম কিভাবে ছড়িয়েছে" এই বিষয়ের উপর তাৎক্ষণিকভাবে আরবীতে বক্তৃতা করতে বলেন। যখন বক্তৃতা শুরু করলেন মজলিস থেকে আহ্সানতা এবং আফরিন (কতই না সুন্দর) এর স্লোগান আসতে লাগলো, তখন মাওলানা শিবলী নু'মানী (র:) নিজের মাথার পাগড়ী খুলে সৈয়্যেদ সাহেব এর মাথায় পরিয়ে দেন।
কর্মজীবন :- ১৯০৭ সালে আন নাদওয়া পত্রিকা র সহযোগী সম্পাদক ও দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা র আরবী সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। অতঃপর তিনি কলকাতা গিয়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর সঙ্গে আল হেলাল পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগে কাজ করেন। ১৯১৪ সালের শুরুর দিকে পূনা গভর্মেন্ট কলেজে ফার্সি ভাষার এসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর হিসেবে যোগদান করেন এবং সে বছরই নভেম্বরে আল্লামা শিবলী (র:) ইন্তেকালের পর দারুল মুস্বননীফিন, আজমগড় (প্রথম ইসলামী ছাপাখানা এবং লাইব্রেরী) এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯১৬ সালে মাসিক পত্রিকা মা'আরিফ প্রকাশ করেন, যা এখনও প্রকাশিত হয়। মাদ্রাজে (চেন্নাই) মুসলিম এডুকেশনাল এসোসিয়েশনের উদ্যোগে ধারাবাহিক ইসলামী সভা আয়োজিত হয়। অক্টোবর ও নভেম্বর দুই মাস ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে ৮ টি অধিবেশন হয়। আলোচক ছিলেন সৈয়্যেদ সুলাইমান নাদবী। তিনি সীরাতে র উপর লিখিত ৮ টি ভাষণ প্রদান করেন।
এই ৮ ভাষণের সমষ্টি পরে খুত্ববাতে মাদ্রাজ নামে ১৯২৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
পাকিস্তানে অভিবাসন ও মৃত্যু :- জুন ১৯৪৬ সালে ভোপালে আমীরে জামিয়া এবং অন্যতম ক্বাজীর (বিচারপতি) পদ গ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পর যখন ভোপালের শাসন শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে কোন চাকরির সুযোগ ও ছিলনা সাথে দারুল মুস্বননীফিনে ফেরার প্রচেষ্টা । এমনকি জন্মভূমির সাথেও ছিল না কোন যোগাযোগ। হঠাৎ করাচী থেকে ফোন আসে যে, মেয়ে ও নাতী খুবই অসুস্থ। তখন তিনি পাকিস্তানে সফর করেন, এটি জরুরি ও অস্থায়ী সফর ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা অন্য কিছু ছিল। অস্থায়ী সফর স্থায়ী রূপে পরিবর্তিত হয় এবং সৈয়্যেদ সাহেব ১৯৫০ সাল থেকে নিয়ে ১৯৫৩ সাল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন এবং নিজ পরিবার কে ও সেখানে ডেকে পাঠান।
সেখানে তিনি ইসলামী শাসন তন্ত্রের খসড়া প্রণয়ন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। আল্লামা সৈয়্যদ সুলাইমান নাদবী (র:) জ্ঞান ও মা'আরিফাত , আন্তরিকতা ও তাক্বওয়া দ্বীন ও মিল্লাতের সেবায় পরিপূর্ণ জীবন কে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তাঁর পান্ডিত্যের গভীরতা ও সামাজিক কার্যকলাপ তাঁকে ভারতে পরিচিত করে তোলে। ভারতে থাকা কালিন সাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর দিনরাত কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। এসময় তিনি হৃদ রোগে আক্রান্ত হন, অবশেষে ২৩ নভেম্বর ১৯৫৩ সালে করাচী তে প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।
প্রকাশিত গ্রন্থ:- আল্লামা সৈয়্যদ সুলাইমান নাদবী (র:) ছিলেন আরবী ও সাহিত্যে প্রাজ্ঞ, সাথে তাওহীদ, উলুমুল ক্বুরআন, আক্বীদা শাস্ত্র, ইতিহাসে ছিলেন অভিজ্ঞ পন্ডিত। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল :-

১/সীরাতুন নবী।
২/ হায়াতে ইমাম মালিক।
৩/ ইয়াদে রফতেগাঁ।
৪/ খৈয়াম।
৫/ সীরাতে আয়েশা।
৬/ হায়াতে শিবলী।
৭/ খুত্ববাতে মাদ্রাজ ইত্যাদি।
তথ্যসূত্র:- হায়াতে সুলাইমান, সায়্যৈদুত্ব ত্বয়েফাহ, হায়াতে শিবলী।
31 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: