১৯৭১ সালের এক গ্রীষ্মের দিন। বরিশালে শান্তি পুরের এক ছোট্ট গ্রামে ১৪ বছরের কিশোরী মায়া একান্ত নিবিড় সুখে পরিবারসহ বাস করছিল। তার জীবন ছিল যেন পল্লীগ্রামের নির্ভেজাল প্রকৃতির মতোই নির্মল ও শান্ত। গ্রামের মেঠোপথ ধরে ছুটে বেড়ানো, আর পাকা শস্যক্ষেত্রের মাঝে দৌড়ে বেড়ানো ছিল তার নিত্যসঙ্গী। ধানক্ষেত ক্ষেত আর সরিষা সমারোহে ভরা ছিল এই ছোট্ট গ্রাম, যেখানে এক টুকরো শান্তির চাদর বিছানো ছিল প্রতিটি প্রান্তে।
মায়ার পিতা-মাতা ছিলেন এক সাধারণ কৃষক। প্রতিদিন সকালের আলো ফুটলেই তারা শস্যক্ষেতে কাজে বেরিয়ে পড়তেন, আর দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তাদের ঘরটি কাঠের তৈরি, ছনের চালা ছোট্ট জানালাগুলো থেকে ভেতরে সূর্যের আলো এসে পড়ত। মায়া তাদের একমাত্র সন্তান। পিতামাতার দৃষ্টি ছিল সবসময় তার ওপর নিবদ্ধ, যেন পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা এই ছোট্ট মেয়েটির মধ্যেই সঞ্চিত।
মায়া ছিল তার পিতামাতার আদরের ধন। তার সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল সন্ধ্যায়, যখন তাদের সবার একসঙ্গে বসার সময় হতো। মায়ের তৈরি গরম রুটি আর সুপের ঘ্রাণে ঘর ভরে উঠত, আর তাদের একসঙ্গে খাবার সময়ের গল্পগুলো হয়ে উঠত বিশেষ। মায়ার বাবা খুব ভালো গল্প বলতেন। তিনি ব্রিটিশদের গল্প বলতেন, বলতেন কিভাবে পূর্বপুরুষেরা এই ভূমিকে রক্ষা করেছিলেন শত্রুদের আক্রমণ থেকে। সেইসব গল্প শুনে ছোট্ট মায়র মনে হত, তার পরিবার পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী মানুষদের মধ্যে একজন।
গ্রামের মানুষজনও ছিল খুব আন্তরিক। প্রত্যেকেই একজন অন্যজনকে চেনে, এবং সুখ-দুঃখের সঙ্গী। প্রতিটি উৎসবে গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে উদযাপন করত। মায়ার বন্ধুরা ছিল গ্রামেই, আর তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করত, মেঠো পথ ধরে দৌড়ে বেড়াত, আর ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে খুঁজতো। প্রতিদিনের এসব খুশির মুহূর্তগুলোই ছিল মায়ার কাছে অমূল্য। তবে মায়া শুধু গ্রামের মেয়ে নয়; তার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত কৌতূহল ছিল পৃথিবীকে জানার, যা তার চোখে এক আলাদা উজ্জ্বলতা নিয়ে আসত।
কিন্তু সেই স্বাভাবিক জীবনে এক অশুভ ছায়া ধীরে ধীরে নেমে আসতে শুরু করল। গ্রামের বাইরে থেকে খবর আসছিল যে যুদ্ধের সুর এখন আর দূরে নেই। পাকিস্তানীদের বিষম গর্জন অত্যাচার ধীরে ধীরে সারা বাংলাদেশ ছড়িয়ে পড়েছে। সবার মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কা বিরাজ করছিল। বাজারে মানুষের কণ্ঠস্বর আগের মতো উচ্ছল ছিল না, বরং ভয় আর কৌতূহলের মিশ্রণ ছিল সেখানে।
মায়ার বাবা-মাও এই অস্থিরতার মধ্যে চিন্তিত ছিলেন। তাদের মনে একটা অজানা আশঙ্কা বাসা বাঁধ ছিল, কিন্তু তারা সেটা মায়ার সামনে কখনো প্রকাশ করেননি। মায়ার মা তাকে রাত্রে আদর করে ঘুম পাড়ানোর সময় বার বার মৃদুস্বরে বলতেন, “আমার মেয়েটি থাকবে নিরাপদে। তোমার জন্যই আমাদের সমস্ত শক্তি।”
একদিন হঠাৎ করে শোনা গেল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছাকাছি শহরগুলোয় প্রবেশ করছে। ভয়ে কাঁপতে থাকা গ্রামের মানুষজন দ্রুত ঘরে ফিরতে শুরু করল, বাজার শূন্য হয়ে পড়ল। মায়ার তার পিতার মুখে এক ধরনের উদ্বেগ দেখতে পেল, যা সে আগে কখনো দেখেনি। এক সন্ধ্যায় তার পিতা-মাতা অনেকটা সাঁতরে-সাঁতরে গ্রামের প্রান্তে গেলেন। সেখান থেকে মায়া দেখল, তারা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকলেন, যেন মনের সব কথাই বুঝে নিতে পারলেন এক নিমেষে।
এই পর্বের শেষে, এক অন্ধকারময় রাত নেমে এল। দূর থেকে কিছু কণ্ঠস্বর শুনতে পেল মায়া। সে তার মায়ের আঁচল ধরে লুকিয়ে রইল। তাদের ছোট্ট ঘরের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছিল,আর সেই আলোতে মায়া এক নতুন অজানা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে থেকে ভেসে আসা সৈন্যদের গর্জনে তার মন কেঁপে উঠল, কিন্তু সে জানত, এই শান্তির জীবন হয়তো আর থাকবে না।
অন্ধকারের আগমন
মায়ার জীবনের এক নির্মল অধ্যায় যেন সেই রাতেই চিরতরে শেষ হয়ে গেল। সন্ধ্যা পার হয়ে গভীর রাত। বনের ধারে, শান্তি পুরের ছোট্ট গ্রামের আকাশ তখন কালো মেঘে ঢাকা। দূরে ঝলমলে শহরের আলো, কিন্তু সেই আলো যেন আর মায়ার জীবনে কোনো উষ্ণতা আনবে না। বাড়ির ভিতর মৃদু আলোতে বাবা-মা বিছানার পাশে বসে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, মুখে চিন্তার গভীর ছাপ।"পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আরও কাছে আসছে,” কাঁপা কণ্ঠে বললেন মায়ার বাবা।
হঠাৎ করেই বাইরে শোনা গেল থমথমে বুটের শব্দ। গোটা পরিবেশ যেন এক ঝাঁকের আশঙ্কায় ভরে উঠল। কাঁপতে কাঁপতে মা একে বারে মায়াকে কাছে টেনে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়লো। “তুমি কিছুতেই ভয় পাবে না, বাবা বললো তুমি কিছু তেই ভয় পাবে না মায়া,” মৃদু কণ্ঠে বললেন তিনি, কিন্তু সেই কণ্ঠে লুকিয়ে ছিল আতঙ্ক। মায়া কিছু বোঝার আগেই বাইরে দরজায় শোনা গেল জোর ধাক্কা। দরজা ভেঙ্গে ভিতরে কাউকে না পেয়ে চলে গেল।
কিন্তু চার দিকে চিৎকার চেঁচামেচি শব্দ ভেসে আসছে।
মায়ার বাবা মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। পাকিস্তানি শত্রুদের দেশ থেকে নির্মুল করার প্রতিজ্ঞা করেছেন। মায়ার মা অনেক নিষেধ করলো,কিন্তু সে শোনার পাত্র নয়।
কিছু দিন পর হঠাৎ করেই আবার হানাদার বাহিনী চলে আসলো।
ঘরের দরজায় কড়া নাড়তে।
মায়ার চোখে মুখে ভীতির চিহ্ন ফুটে উঠল। মা দ্রুত এক নির্দেশ দিলেন, “তুমি আমার সাথে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসো। মা সঙ্গে সঙ্গে মায়ার র হাত ধরে তাকে নিয়ে দরজার দিকে দৌড়াতে লাগলেন। বাড়ির বাইরের অন্ধকার তাদের আড়াল করছিল, কিন্তু সেই অন্ধকার ছিল আরেক বিপদের সঙ্কেত।
দূরে শোনা যাচ্ছিল গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন আর সৈন্যদের গলা। একসময় মা মায়াকে বনের দিকে নিয়ে চললেন। কিন্তু ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাসে তাদের সঙ্গেই ঘটল দুর্ঘটনা। মায়ের হাত থেকে হঠাৎ করে আলগা হয়ে গেল মায়া, সে পড়ে গেল পিছনের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই সে দেখতে পেল, মা ভয়াবহ আতঙ্কে তাকিয়ে আছেন তার দিকে, কিন্তু সময় ছিল না, বিপদ এতটাই কাছাকাছি যে মায়া তাড়াতাড়ি দৌড়াতে লাগলেন আর অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
বন যেন নিঃশব্দ, কিন্তু সেই নিঃশব্দতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য সন্ত্রাস। মায়ার মনের মধ্যে ছেঁকে ধরেছিল ভয় আর অসহায়ত্ব। চারপাশে কোনো পরিচিত মুখ নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই। ধীরে ধীরে হাঁপাতে হাঁপাতে বনভূমির গভীরে প্রবেশ করল সে। গাছপালা, পাতার গন্ধ, মাটির সোঁদা গন্ধ – সবই যেন এক অপরিচিত রূপ ধারণ করেছিল।
বনের ভিতরে পা রাখার সাথে সাথেই শোনা গেল বুনো কুকুরের গর্জন আর দূরের বন্দুকের শব্দ। মায়া জানত না কোথায় যাবে, শুধু একটা চিন্তা মনের মধ্যে জেগে উঠল, “বেঁচে থাকতে হবে, কিছুতেই ভেঙে পড়া যাবে না।” বনের গভীরে গিয়ে সে একটা গাছের তলায় বসল, আশেপাশের পাতায় তার ছোট ছোট হাতের ছাপ পড়ছিল। রাতের শীতল বাতাস গায়ে লাগছিল, কিন্তু তার চোখে তখন শুধুই অতীতের সেই সুখের স্মৃতি ভেসে উঠছিল।
মায়া সেই রাতের অন্ধকারে প্রথমবার একাকী, এবং একান্তভাবে বুঝতে পারল যে, শৈশবের সেই দিনগুলি যেন কোনো অলীক কল্পনার মতোই মিলিয়ে গেছে। তার স্মৃতিতে ভেসে উঠছিল মা-বাবার মুখ, তাদের হাসি, গল্পের মুহূর্তগুলো। কিন্তু সেই সব কিছু এখনই কোনোভাবে তাকে ফিরে পেতে সাহায্য করবে না।
সেই রাতটি ছিল মায়ার জীবনের প্রথম পরীক্ষা। ভোরের আলো ফোটার আগে পর্যন্ত মায়া সেখানে, গাছের ছায়ায়, নিজেকে লুকিয়ে রাখল। মাথার মধ্যে ঘুরছিল বাবা-মার কণ্ঠস্বর, তারা যে তাকে নিয়ে কি পরিকল্পনা করেছিল, সে কি আবার তাদের দেখতে পাবে?
ভোরের আলো ফুটতেই, মায়া নিজের ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলল। একা বেঁচে থাকার ইচ্ছা যেন তার মনে একধরনের সাহস এনে দিল। বন থেকে বের হয়ে কোথাও একটা আশ্রয় খুঁজতে হবে। ঠিক তখনই মনে পড়ল তার বাবার কথা, “যুদ্ধ সবকিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু সাহস ধরে রাখতে হবে।”
সেই সাহসই তাকে অচেনা পথে চালিত করল।
নতুন আশ্রয়
বনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় হাঁটতে হাঁটতে মায়া অবশেষে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। পায়ের নিচের মাটি, আকাশের নিচের খোলা বাতাস এবং চারপাশের গাছের পাতাগুলি যেন তার ভয়ানক অভিজ্ঞতার স্মৃতি বহন করছিল। গভীর রাতে হঠাৎ দূরে কোথাও একটি আলো দেখল সে। দিশেহারা মনের মধ্যে একটুকরো আশা জাগল, হয়তো কোথাও কিছু নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারে। আর একটু এগিয়ে দেখল ছোট্ট একটি বাড়ি, চারপাশে মাটির দেয়াল আর সামনের উঠোনে কয়েকটি মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বাড়িটির সামনে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন, পরনে মাটির রঙের পোশাক, মুখে সাদাটে দাড়ি। তিনি লাঠি ভর দিয়ে উঠোনের মাটি খুঁড়ছিলেন। মায়া একটু থেমে দেখল, তিনি নিশ্চয়ই এই বাড়ির মালিক। সাহস করে সে তার দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু ভয়ে ঠোঁট কাঁপছিল তার। বৃদ্ধটি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, যেন তার আগমনের অপেক্ষাতেই ছিলেন।
“তুমি কি সাহায্যের জন্য এসেছো, মেয়ে?” শান্ত স্বরে বললেন বৃদ্ধ, যার নাম মুহাম্মদ আলী।
মায়া তার ভয়ের কথা আর মন থেকে সরাতে পারছিল না, তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নীচু করে বলল, “আমার নাম মায়া। আমার পরিবার থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। আপনিই কি আমাকে কিছুদিন আশ্রয় দিতে পারেন?”
মুহাম্মদ আলী একটি ছোট্ট হাসি দিলেন, যার মধ্যে ছিল সহানুভূতির স্পর্শ। “অবশ্যই পারি, মেয়ে,” বললেন তিনি। “আমাদের বাড়ি বড় না, কিন্তু যা আছে, তার মধ্যে তোমারও একটুকরো আশ্রয় মিলবে।”
মুহাম্মদ আলী এই কথাগুলো যেন মায়ার মনে এক ধরনের শান্তি এনে দিল। বহুদিন পর যেন সে কোনো নিরাপত্তার অনুভূতি পেল।মুহাম্মদ আলী তাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন, যেখানে ছোট্ট একটি রান্নাঘর, মাটির দেওয়াল, কাঠের খাট এবং কয়েকটি পুরোনো আসবাবপত্র ছিল।
কিছুক্ষণ পর মুহাম্মদ আলীর ছেলে মেহেদী সেখানে এলো। মেহেদীর বয়স প্রায় মায়ার সমান হবে, কিন্তু তার চোখে-মুখে ছিল প্রচণ্ড দৃঢ়তা আর অভিজ্ঞতার ছাপ।মেহেদীর চোখে ভেসে উঠল সহানুভূতির এবং ভালোবাসার অভিব্যক্তি। সে এসে মায়ার কাছে এসে বলল, “তুমি নিশ্চয়ই অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে এসেছো, কিন্তু তুমি এখানে নিরাপদে আছো।”
মায়ার চোখে জল চলে এলো, এই প্রথমবার তার মনে হলো কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করছে।মেহেদীর যেন তার একান্ত আত্মীয়ের মতো লাগছিল, যাকে সে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
মুহাম্মদ আলীর পরিবারে থাকতে শুরু করল মায়া, তাদের ছোট্ট বাড়িতে ধীরে ধীরে এক ধরনের সান্ত্বনা খুঁজে পেল সে। দিনে দিনে সে খামারের কাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠল, মুরগি ও গরুর খাওয়া, খেতের কাজ – সবকিছুতেই মেহেদীর সাহায্য করতে লাগল।মেহেদীর সঙ্গে কাজ করতে করতে তাদের মধ্যে এক গভীর বন্ধন গড়ে উঠল।মেহেদী তার বন্ধুত্বপূর্ণ এবং মৃদু ব্যবহারের মাধ্যমে মায়াকে জীবনের নতুন মানে বোঝাতে থাকল। মায়ার হৃদয়ে মেহদীর জন্য একটা গভীর ভালোবাসার টান অনুভব করতে লাগলো।
একদিন বিকেলে, যখন সূর্যের আলো খেতের উপর দিয়ে সোনালী আভা তৈরি করছিল,মেহেদী তাকে বসল আড়াল করে, নিজের জীবনের কাহিনী বলতে শুরু করল।মেহেদীর কথাগুলো হান্নাকে আরও প্রেরণা দিল। “যুদ্ধ আমাদের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে,” বলল মেহেদী, “কিন্তু আশা এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে লড়াই করতে হয়, তা যে পরিস্থিতিতেই হোক।”
মায়া তখন মেহেদীর হাত ধরে বলল, “তুমি আমার জীবনে যেমন আশ্রয় দিয়েছো, তেমনই আমার জীবনের প্রেরণা হয়েছো। আমি চিরকাল তোমার এই বন্ধনকে মনে রাখব।”
এই সময়ে তাদের জীবনে আসে নতুন এক চ্যালেঞ্জ। গ্রামের প্রান্তে থাকা এক সৈন্য দল গুজব শুনে আসে যে মুহাম্মদ আলীর বাড়িতে মুক্তি বাহিনীর মেয়ে লুকিয়ে আছে।
বন্ধুত্বের জোর
যুদ্ধের নৃশংসতার মাঝে, দিনগুলো যেন আরও কঠিন হয়ে উঠছিল। বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল একটা অমূল্য উপহার, আর সেই উপহারের ভাগীদার ছিল দুই বন্ধু—মায়া আর মেহেদী। খামারের কাজ, রান্নাবান্না, পশুপালন—প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মধ্যে যেন তারা একে অপরের সঙ্গ খুঁজে পেত। যুদ্ধের কারণে তাদের জীবনের সকল সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।মায়া এখন মেহেদীর কাছে শুধু একজন আশ্রিত নয়, বরং সে নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয় মানুষটি হয়ে উঠেছিল।
সকালের সূর্যের আলো যখন খামারের সবুজ গাছের পাতার ফাঁকে পড়ত, তখন তারা একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করত। মুরগির খাঁচা থেকে ডিম সংগ্রহ করা, বাগানে জল দেওয়া কিংবা ফসলের যত্ন নেওয়া—এই কাজগুলো তাদের দুজনের একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোকে মজবুত করে তুলত। কিন্তু তাদের এই স্বাভাবিক জীবনের ছায়ার আড়ালে ছিল এক ভয়ের ছাপ, যে কোনো সময় তাদের লুকিয়ে থাকার রহস্য ফাঁস হতে পারে।
একদিন সন্ধ্যাবেলা, যখন চারপাশে ধীরে ধীরে আঁধার ঘনিয়ে আসছিল,মেহেদী ছোট্ট একটি আগুন জ্বালিয়ে বসেছিল উঠোনে। পাশে বসে মায়া তার গল্প শুনছিল।মেহেদীর চোখে যেন গভীর কোনো স্মৃতির ছায়া ছিল। সে বলল, “তুমি জানো,মায়া, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন যুদ্ধের কথা আমি কখনোই ভাবিনি। আমরা সবাই ভেবেছিলাম যে শান্তি চিরদিন থাকবে। কিন্তু এখন দেখি এই পৃথিবীতে শান্তি যেন একটা বিলাসিতা। মনে হয় যেন প্রতিদিনের অস্তিত্বও একটা যুদ্ধ।“
মায়া চুপ করে শুনছিল, তার চোখের কোণ দিয়ে এক বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। “আমিও জানি এই যন্ত্রণা। প্রতিদিনের এই লড়াই আমাদের সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু তোমার পাশে থাকায় এই জীবনটা সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে।”
মেহেদী হেসে তার কাঁধে হাত রাখল। “তুমি আমারও বাঁচার কারণ,মায়া। আমি যদি কোনোদিন কাউকে আপন মতো মনে করে থাকি, তবে তা তুমি।“
তাদের বন্ধুত্ব যেন যুদ্ধের এই ভয়ংকর সময়েও এক ধরনের সাহসের প্রতীক হয়ে উঠছিল। তারা একে অপরের সঙ্গে আস্থা আর সাহস ভাগাভাগি করে নিচ্ছিল, যেন পৃথিবীর সকল অন্ধকারকে একসঙ্গে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। তাদের মধ্যে শুধু বন্ধুত্ব আর ভালো লাগা ছিল না। দু'জন দু'জনকে প্রচন্ড ভাবে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু কেউ সেই ভালোবাসার কথা কখনো বলতে পারে নি । শুধু দুজন দুজনকে সারা জীবন আক্রে ধরে বাঁচতে চায়।
একদিন রাতে, যখন তারা বাড়ির ভেতরে একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করছিল, হঠাৎ বাইরে থেকে হুড়মুড় করে দরজার শব্দ শুনতে পেল। মেহেদীর বাবা,মুহাম্মদ আলী, দ্রুত উঠে দরজা খুললেন। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল দুইজন সৈনিক, মুখে রূঢ়তার ছাপ। তারা জিজ্ঞেস করতে লাগল, “এই বাড়িতে কি কেউ লুকিয়ে আছে?”
মায়া আর মেহেদীর মনের ভেতর ততক্ষণে আতঙ্ক কাজ করছিল।মেহেদী তার হাত ধরে মৃদু ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেও না, আমি তোমার পাশে আছি।”মুহাম্মদ আলী শান্তভাবে বললেন, “এই বাড়িতে শুধু আমার ছেলে আর আমি আছি। আমরা নিরীহ কৃষক। কোনো আশ্রিতা নেই এখানে।”
কিছুক্ষণ সৈনিকরা চারপাশ দেখে চলে গেল, কিন্তু মায়ার মনের মধ্যে ভয়ের শেকড় আরও গভীর হয়ে গেঁথে গেল। তাদের জীবনের শান্তি যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। তারা জানত, এই বিপদের মাঝে কোনো ভুল হলে তাদের সকলের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাদের জীবনের এই অস্থিরতা সত্ত্বেও মায়া ও মেহেদী প্রতিদিন একসঙ্গে সময় কাটিয়ে নিজেদের মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করত। একদিন মেহেদী একটি পুরনো বাঁশি নিয়ে এলো এবং সে বাজাতে শুরু করল। মায়া তার বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে বলল, “তুমি এত সুন্দর করে বাজাও, আগে কখনো শুনিনি।”
মেহেদী হাসল এবং বলল, “এটাই তো আমার ছোটবেলার সঙ্গী ছিল, কিন্তু যুদ্ধের কারণে অনেক কিছু হারিয়ে গেছে।“
মায়ার মনে হল, যেন সে এই বাঁশির সুরের মধ্যে নিজের হারিয়ে যাওয়া সুখের স্মৃতিগুলোকে খুঁজে পেতে পারে। সেই সন্ধ্যায় তারা দুজন একসঙ্গে গান গাইল, পুরোনো দিনের কথা বলল এবং নিজেদের স্বপ্নের কথা শেয়ার করল।
কিন্তু যুদ্ধের এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তাদের এই ছোট্ট শান্তির মুহূর্তগুলোও যেন চিরদিনের জন্য টিকে থাকতে পারে না।মেহেদী একদিন রাতের বেলা এসে মায়া কে বলল, “তোমাকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। সৈন্যরা আমাদের সন্দেহ করছে। আমাদের বন্ধুত্বের জন্যই তোমাকে বাঁচাতে হবে।”
এই কথার মধ্য দিয়ে তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মায়া কি মেহেদীর কাছ থেকে দূরে চলে যাবে, নাকি তারা একসঙ্গে লড়াই করবে?
কঠিন সিদ্ধান্ত
যুদ্ধের ছায়া প্রতিদিন ঘন হয়ে আসছে।মুহাম্মদ আলী প্রতিটি দিন নতুন আতঙ্কে কাটাচ্ছেন, কারণ তারা জানেন, সৈন্যরা যেকোনো মুহূর্তে তাদের বাড়িতে হানা দিতে পারে।মেহেদীর মাধ্যমে শোনা খবরের সূত্র ধরে তিনি বুঝতে পারছেন, এই ছোট্ট শহরটি আর নিরাপদ নয়, বিশেষ করে মায়ার জন্য। মেহেদী তাকে যতটা সম্ভব লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু যে কোনো সময় তাদের গোপন আস্তানা ফাঁস হয়ে যেতে পারে। আর এই ঝুঁকির মুখে তিনি আর নীরব থাকতে পারলেন না।
এক সন্ধ্যায়,মায়া আর মেহেদী উঠোনে বসে মৃদু আলোয় গল্প করছিল।মুহাম্মদ আলী তাদের কাছে এসে কাশতে কাশতে বললেন, “আমাদের কথা বলা দরকার।” তার গলায় একটা কঠিনতা আর চোখে এক অসম্ভব দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।মেহেদী ও মায়া চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু সময় নীরব থাকার পর তিনি বললেন, “মায়া, তোমাকে এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। এই পরিস্থিতিতে এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়।”
এই কথাগুলো শোনার পর মায়ার মনের মধ্যে যেন বজ্রাঘাত হলো। তার সারা শরীর অবশ হয়ে এলো। মেহেদী দ্রুত বলল, “বাবা, আপনি কি বলছেন? আমরা তো এতদিন ধরে মায়া কে লুকিয়ে রেখেছি। সে আমাদের পরিবার, তাকে আমি যেতে দেব না।”
মুহাম্মদ আলী মেহেদীর কাঁধে হাত রেখে শান্তভাবে বললেন, “বুঝতে চেষ্টা করো, বাবা। এই যুদ্ধ আমাদের কোনো দয়া দেখাবে না। মায়াকে আমরা ভালোবাসি বলেই আমাদের উচিত তাকে রক্ষা করা। আমাদের নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে এখানে রাখাটা ভুল হবে। তাকে নিরাপদে অন্য কোথাও পাঠানোর ব্যবস্থা করা দরকার।”
মায়ার চোখে জল চলে এলো। এই কয়েক মাসে মেহেদী আর মুহাম্মদ আলী তার কাছে পরিবার হয়ে উঠেছিল। তাদের ছেড়ে চলে যাওয়া তার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছিল। সে বলল, “কিন্তু আমি কোথায় যাবো? আর তোমরা… তোমরা কি আমার জন্য বিপদে পড়বে না?”
মেহেদী তার হাত ধরে শক্ত করে বলল, “মায়া, তুমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। তুমি থাকলে আমি সাহস পাই। কিন্তু বাবার কথায় হয়তো কিছুটা সত্যি আছে। আমাদের একবার ভেবে দেখতে হবে।”
তারা কিছুক্ষণ নীরব থাকল। তাদের সবার মনের মধ্যে বিদায়ের এক অজানা যন্ত্রণা ফুটে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী বললেন, “আমার এক পুরনো বন্ধু রয়েছেন শহরের বাইরে একটি গ্রামে। তিনি সম্ভবত তোমাকে আশ্রয় দেবেন। সেখানে কিছুটা নিরাপদ থাকবে। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে জানি না, কিন্তু এই কঠিন সময়ে আমাদের নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”
মায়া মেহেদীর হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “আমরা কি আবার একদিন দেখা করতে পারব, মেহেদী? এই বিদায় কি চিরদিনের?”
মেহেদী একটা দির্ঘ্য নিঃশ্বাস ছেড়ে আকাশে দিয়ে তাকালো, চোখে অশ্রু টলমল করছে। “আমাদের দেখা অবশ্যই হবে,মায়া। তুমি আমার প্রতিশ্রুতি রাখবে, ঠিক আছে? এই যুদ্ধ একদিন শেষ হবে, তখন আমরা আবার একত্রে হব।”
সেই রাতে বিদায়ের মুহূর্তটি যেন তাদের জীবনের এক কঠিনতম সময় হয়ে উঠল।মেহেদী আর মোহাম্মদ আলী মায়ার জন্য কিছু খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একত্রিত করে দিলেন।মোহাম্মদ আলী বন্ধুর ঠিকানাটি হাতে নিয়ে মায়া তাদের শেষবারের মতো বিদায় জানাতে উঠোনে এসে দাঁড়াল। মেহেদী শক্ত করে তার হাত ধরে বলল, “মনে রেখো, তুমি আমার জীবন। তুমি যেখানেই থাকো, আমি তোমার জন্য ই বেঁচে থাকবো।”
মায়া বিদায় নেওয়ার সময় তার চোখে ছিল নির্ভীকতা, কিন্তু মনে ছিল এক অপার কষ্ট। প্রতিটি পা ফেলার সাথে তার বুকের মধ্যে অসহ্য এক ব্যথা ফুটে উঠছিল। সে যখন শেষ বারের মতো পেছন ফিরে দেখল, মেহেদী তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল, চোখে অশ্রু।
রাতের অন্ধকারে মায়ার একা পথ চলা শুরু করল, তার মন তোলপাড় করছে। এই যুদ্ধ তার জীবনকে ভিন্ন পথে চালিত করেছে, তাকে আলাদা করেছে তার প্রিয়জনদের থেকে। কিন্তু তার মনে ছিল মেহেদীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি—তারা আবার একদিন মিলিত হবে।
মুক্তির পথে
রাতের অন্ধকারে গভীর শ্বাস নিয়ে মায়া তার যাত্রা শুরু করল। মেহেদীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও মোহাম্মদ আলীর অনুপ্রেরণায় তার মনে এক অভূতপূর্ব সাহস জেগে উঠেছে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, সে বিভিন্ন শহর ও গ্রাম অতিক্রম করতে থাকে। প্রতিটি পা ফেলার সময় তার মনে তীব্র একটা যন্ত্রণা আর আশার সংমিশ্রণ তৈরি হয়। প্রতিটি নতুন শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়, যুদ্ধের কড়া শাসন তাদের চোখে-মুখে ছাপ ফেলেছে।
একটি ছোট্ট শহরে এসে সে একটি নিরাপদ জায়গায় রাত কাটানোর জন্য আশ্রয় চায়। কিছু গ্রামবাসী তাকে সাবধান করে দেয়, বলে, “এখানে থাকাটা খুব বিপজ্জনক। সৈন্যরা যেকোনো মুহূর্তে হানা দিতে পারে।” কিন্তু তার পায়ে হেঁটে যাওয়ার আর শক্তি নেই, তাই সে গ্রামের এক বৃদ্ধ মহিলার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বৃদ্ধা তাকে মৃদু সুরে বলে, “মা, তোমার চোখে সাহস আছে। এই পরিস্থিতিতে সাহস থাকা সহজ নয়।”
রাতের বেলা ঘুমানোর সময় বৃদ্ধা তাকে একটি ছোট্ট তাবিজ দেয়, বলে, “এটা আমার মায়ের দেওয়া ছিল। বলতেন, যুদ্ধে বেঁচে থাকতে হলে হৃদয়ে সাহস রাখতে হয়। তুমি এটা সঙ্গে রাখো।”
মায়া বৃদ্ধার কথা শুনে তার তাবিজটি হাতে ধরে মুঠোয় আঁকড়ে ধরে। সেই মুহূর্তে তার মনের মধ্যে এক অজানা শক্তি ভরে যায়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, এই যুদ্ধ তাকে টলাতে পারবে না।
সকাল হতেই সে বৃদ্ধাকে বিদায় জানিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে। প্রতিটি শহর পার হওয়ার সাথে তার মনে এক নতুন সংকল্প জন্ম নেয়। যুদ্ধ তাকে বারবার থামাতে চেষ্টা করছে, কিন্তু সে জানে,মেহেদী ও মোহাম্মাদ আলীর জন্যই তাকে টিকে থাকতে হবে। প্রতিটি গ্রাম পেরোবার সময় সে নতুন মানুষদের মুখোমুখি হয়, তাদের থেকে নতুন নতুন গল্প শুনে। কিছু গল্প তাকে অনুপ্রাণিত করে, কিছু গল্প তার ভেতরের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
একদিন বিকেল বেলা সে একটি গ্রামে পৌঁছায়, যেখানে যুদ্ধের আঘাতে সবকিছু প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়িগুলো ভেঙে পড়েছে, আর রাস্তার ধারে বাচ্চারা ক্ষুধায় কাতর। মায়ার মনে হলো, তার নিজের যন্ত্রণার থেকেও এই মানুষগুলোর কষ্ট অনেক বেশি। সে কিছু খাবার নিয়ে বাচ্চাগুলোকে দেয়, আর তাদের চোখে আনন্দের ঝলক দেখে তার মন কিছুটা শান্তি পায়।
সেই রাতে সে গ্রামে একটি আশ্রয়ে রাত কাটায়, যেখানে আরও কিছু যাত্রী তার মতোই যুদ্ধের কারণে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে একজন তরুণ দম্পতি ছিল, যাদের সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তরুণটি, নাম তার হাসান, তাকে বলে, “যুদ্ধ আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু আমাদের জীবনের আশা কেড়ে নিতে পারেনি। আমরা যদি একে অপরকে সাহায্য করি, তবে হয়তো এই অন্ধকার কেটে যাবে।”
মায়া হাসান ও তার স্ত্রীর কাছ থেকে সাহস পায় এবং তার যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যেতে নতুন উদ্যম খুঁজে পায়। পরদিন হাসান তাদের সঙ্গে তাকে কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানায়, বলে, “মনে রেখো, তুমি কখনো একা নও। এই যুদ্ধের মধ্যে থেকেও আমরা সবাই একসাথে আছি।”
মায়ার যাত্রাপথে বিপদ আরও ঘনিয়ে আসে। কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় সে একদল সৈন্যের সম্মুখীন হয়, তাদের গাড়ির ভিতরে কিছু মানুষ ছিল।সৈন্য দল গ্রামে তল্লাশি চালাচ্ছে। তারা মায়া কে আটকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। হঠাৎ করেই মায়া বলে মেহেদী চিৎকার শুনতে পেলো। মায়া দৌড়ে এসে দেখলো পাক সেনা চলে গেছে। কিন্তু কিছু মানুষ গুলি খেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
একটুখানি সামনে যেতেই দেখে মেহেদী রক্ত ভেজা শরীর নিয়ে পড়ে আছে। আস্তে আস্তে শুধু মায়া মায়া বলে ডাকছে।
হঠাৎ করেই কেউ হয়তো মায়ার হৃৎপিণ্ড টা ছিঁড়ে ফেলছে। মায়া মেহেদী বলে শুধু একটা চিৎকার দিল। বাতাসের আগে দৌড়ে গিয়ে মেহেদী কে জড়িয়ে ধরলো।
মায়া বলল- মেহেদী তোমার কি হয়েছে? কেন এতো রক্ত?
মেহেদী বলল-ওরা বাবা কে মেরে ফেলেছে।
আমি তোমাকে দেখে গাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করেছে।
মায়া চিৎকার দিয়ে মেহেদী কে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল- তুই বলছি না সারা জীবন এক সাথে থাকবো?
তুই বলেছিলি আমার জন্য বেঁচে থাকবি? তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও?
আমি যে তোকে নিজের থেকেও অনেক বেশি ভালবাসি!
মেহেদীর ঠোঁট দুটো কাঁপছে শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে।বলল- আমিও তো তো তোকে ভালবাসি।
মেহেদীর শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল মুখে কোন কথা নেই।
মায়ার চিৎকারে মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙ্গে পড়বে। চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে মেহেদীর চেহারার উপরে পড়ছে।
মায়া বলল- কেন আমার সাথে এমন হয়? আমার ভালোবাসার মানুষ গুলো কেন আমার থেকে হারিয়ে যায়?
মায়া একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল- যদি হারিয়ে যাবি তাহলে কেন সারা জীবন এক সাথে থাকার কথা দিছি লি? কেন আমাকে তোর সাথে নিয়ে গেলি না।
মায়ার শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কথা বলতে পারছে না। মেহেদীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে।
অবশেষে সে একটি বড়ো শহরে পৌঁছায়, যেখানে গোপনে প্রতিরোধের কিছু দল সক্রিয়। সেখানে সে আরও কিছু বন্ধু খুঁজে পায়, যারা যুদ্ধের শিকার এবং একই সাথে তার মতোই সাহসী। তাদের মধ্যে একজন, যার নাম রাফি, মায়ার গল্প শুনে বলে, “তুমি যে এতদূর এসেছ, তার মানে তুমি সত্যিকারের সাহসী। এই যুদ্ধ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। একদিন এই কালো মেঘ কেটে যাবে, কিন্তু আমরা যারা বেঁচে থাকব, তাদের মধ্যে তুমি সব চেয়ে বেশি সাহসী। এবং তুমিও এক জন মুক্তিযোদ্ধা। তোমার জীবনের সব কিছুই হারিয়ে ফেলেছে,তার পরও তুমি হেরে যাওনি
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হলো কিন্তু মায়ার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে আপন মানুষগুলো।
কখন বাবা মা আবার কখনো মেহেদীর। স্মৃতিগুলো প্রতিটা মুহূর্তে মৃত্যুর সমান যন্ত্রণা দিচ্ছে । বেঁচে ঠিকই আছে কিন্তু মরার মতো।
জীবন থেকে হারিয়ে গেছে স্বপ্নগুলো,সুখ গুলো আর আপন মানুষগুলো।
রক্তের নদী
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
103
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating