বন্ধুত্ব

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
“আশা তুই কি ফ্রি ? গেট টুগেদার নিয়ে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম”
“হুম বল কয়জন হচ্ছে ? সবাইকেই আগের থেকে জানিয়ে দিস তাহলে আর সমস্যা হবেনা”
“শোন প্রোগ্রামটা আমার বাসায় করবো বুঝলি। ও অফিস থেকে টুরে বাহিরে যাবে আর ছেলেও তখন বন্ধুদের নিয়ে মালেয়শিয়া ঘুরতে যাচ্ছে ,বাসা একদমই ফাঁকা থাকবে”
“ওয়াও দোস্ত খুব মজা হবে। এতো বছর পর কয়েকজনকে দেখবো ভাবলেই মন ভালো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তোর উপরে এতো প্রেশার দিবোনা ,আমরা সবাই বাসা থেকে একটা করে আইটেম নিয়ে আসবো। তাতে সময় পাবো বেশি করে আড্ডা দেবার। ভালো কথা এসব ফোনে না বলে গ্রুপে শেয়ার করলেইতো বেশি ভালো হবে”
“তোর সাথে প্রাইভেট কথা আছে বলেই ফোন দিয়েছি , ওখানে এসব শেয়ার করা যাবেনা”
“কোনো সমস্যা হইছে নাকি ? কই কাল রাতেও কথা হলো কিছু টের পাইনিতো!”
“রাবু আর লিবাকে বলতে চাচ্ছিনা। অন্যরা কেউ ওদের পছন্দ করেনা , তুইতো ওদের খুঁজে বের করে এড করলি তাই তোকে জানালাম । এতদিন পরে খুঁজে পেলেও ওদের সাথে আমাদের ঠিক মিলেনা। ওরা পরিবেশ ,পরিস্থিতি অনেককিছুই কম বুঝে”
“এটা কেমন কথা হলো ? বন্ধুত্বের মাঝে এতো ফর্মালিটি কেনো আসছে রুমা ? রাবু নেটে নতুন এসেছে হয়তো অনেককিছু কম বুঝে আর লিবার মানসিক সমস্যা আমরা বন্ধুরা না বুঝলে কে বুঝবে ?”
“আরে প্রতি প্রোগ্রামে লিবা বাচ্চাদের কথা মনে করে কিছুই খেতে চায়না ,ওকে বক্সে ভরে খাবার দিতে হয় আর রাবুটা সবার পোস্টে কিসব কমেন্ট করে দেখেছিস ! প্লিজ দোস্ত বুঝার চেষ্টা কর ওদের সাথে আমাদের ঠিক খাপ খায়না”
“রুমা তুই কি ভুলে গেছিস লিবার স্বামী নাই! ,ভালোমন্দ খেতে গেলে হয়ত বাচ্চাদের জন্য কষ্ট হয় তাই হয়তো এমন করে। আর্থিক স্বচ্ছলতা বিরাট বিষয় আর রাবুটা মাত্র ভার্চুয়াল জগতে এসেছে , অনেককিছু কম বুঝে ,আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। এসব কি কোনো ব্যাপার ? বন্ধুদের দুঃসময়ে আমরা না থাকলে কেমন বন্ধু আমরা?”
“আশা তুই কিরে ? অনেককিছু তুইও কম বুঝিস! এতদিন ওদের অনেকের সাথে যোগাযোগ ছিলোনা গ্যাপ পড়ে গেছে আর ওরা স্ট্যাটাস বুঝেও না তুই কেনো এসব বুঝবি না ? চাকুরী নিয়ে পড়ে থাকিস নিজেকে আরেকটু আপডেট কর"
ফোন রাখার পর মনে মনে স্তব্ধ হয়ে ভাবতে গিয়ে দেখি সত্যি কথা বলেছে রুমা। অতি আধুনিকতার অনেককিছু আমিও কম বুঝি ।
মেট্রিক পরীক্ষার আগেই রাবুর বাবার মৃত্যুর পর পরীক্ষার পর ওরা গ্রামে চলে গিয়েছিল ,আর কখনো দেখা হয়নি। এমনকি স্কুল রি-ইউনিয়নে পর্যন্ত কখনো দেখিনি। লিবাটা স্বামীর সাথে বান্দরবন ছিলো ,তিন বছর আগে রোড় এক্সিডেন্টে স্বামী মারা যাবার পর তিন বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি আছে। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। শুনেছি শ্বশুর বাড়ি থেকে কিছু দেয়নি সব কন্যা সন্তান বলে। ভাইয়ের পরিবারে তিন সন্তান নিয়ে আশ্রিত বলে ভালো নাই। এই যুগে আসলে নিজের কিছু না থাকলে কে আর কাকে কয়দিন টানতে পারে! জীবনযাপন সবার জন্য কঠিন নাকি আমরা কঠিন করে তুলেছি! চারদিকে কেবলই ভাংগনের কথা শুনি অথচ আমাদের শৈশবে এই চিত্রগুলো এতটা ভয়ংকর ছিলো না।
রাবুর খবর কেউ পাইনি আর। কয়েকমাস আগে অফিসের কাজে চিটাগাং যাবার সময় ওর ছোট বোনের সাথে দেখা। নিজ থেকে পরিচয় না দিলে হয়ত চেনা সম্ভব হতোনা আমার ।শুনলাম ক্লাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মেয়েটা এখন একান্নবর্তী পরিবারের বড়ো বউ । প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা আর সংসার করে। ফোনে কথা হবার পর আমিই ওকে আমাদের স্কুল গ্রুপে এড করিয়েছিলাম কিন্তু কেউই তেমন উচ্ছ্বাস দেখায়নি । আগে সবাই পছন্দ করলেও সময়ের পরিবর্তনে সব কিভাবে যে বদলে গেলো ঠিক বুঝলাম না ! নাকি আমরা কি চাকচিক্যময়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি ? শাহরুখ খানের একটা সিনেমায় দেখেছি স্টার হবার পরেও স্কুলের বন্ধুকে ভুলেনি যদি-ও বন্ধু তার নাপিত পেশায় ছিল। আমার আমিত্ববোধে আক্রান্ত হয়ে সহজ সম্পর্কের দাম দিতেও ভুলেছি, স্কীকার করি আর নাই করি!
“আশা তোদের সাথে কত বছর দেখা হয়না ? খুব দেখতে ইচ্ছে করেরে ! আমিতো ভেবেছি আর কখনই তোদের সাথে যোগাযোগ হবেনা আমার। আচ্ছা তুই কি আগের মতোই আছিস না বদলে গেছিসরে ?”
“অবশ্যই বদলেছি রাবু , আগে চিকন ছিলাম এখন হাতি হইছি আর চাকুরী সংসার সন্তান সামলাতে গিয়ে খিটখিটে হয়ে গেছি তবে আমাকে স্বামী আর শ্বাশুড়ি সাপোর্ট দেয় বলে রক্ষা"
“আমার খুব গর্ব হয় তোকে নিয়ে। স্কুলে পড়ায় ফাঁকি দেয়া মেয়েটা এখন কত বড় চাকুরী করে! মনে আছে ক্লাস নাইনের অংকে খারাপ করার পর প্রমোশন না পেয়ে পুরো স্কুল কান্নাকাটি করে গরম করেছিলি ?”
“হুম দোস্ত সবই মনে আছে ,পরে গার্ডিয়ান ডেকে সেই অনুমতি পেয়েছিলাম ,তবে আমার বাচ্চারা এই কাজ করলে আমি কিন্তু রিকোয়েস্ট করতে যাবোনা দোস্ত হা হা হা "
“তুই কি মাইন্ড করেছিস আমি এসব বলায় ? আসলে স্কুলের সেইসব স্মৃতি খুব মনে পড়ে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে কেবল যুদ্ধ আর যুদ্ধ করেছি। স্মৃতিতে সেই স্কুলজীবনের বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু নাই আমার”
“আশ্চর্য মাইন্ড করবো কেনো ? সবার বকা খাবার পরেইতো পড়ায় মন দিয়েছিলাম আমি আর শোন বন্ধুদের সাথে এতো ফর্মাল হবার দরকার নেই বুঝলি!”
“জানিস আমি কিছু বললে বা লিখলে কেউ তেমন উত্তর পর্যন্ত দেয়না। আমার আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই , স্বামী গ্রামের একটা স্কুলের শিক্ষক তাই হয়তো! অবস্থার সাথে সাথে সবাইর মন ও বদলে গেছেরে !”
“তো কি হইছে ? বেশিরভাগইতো গৃহিণীই ! তুই যা ভাবছিস তা নয়—গ্যাপ পড়েছে তাই বুঝলি! দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে "
"আমি এতটা বোকা মানুষ না, আমি বুঝি কিন্তু অন্যরা ভুলে গেছে ভাগ্য আমাদের হাতে না"
রাবুর কথাটা বুঝেও না বুঝার ভান করলাম। এটা ঠিক যে সবার পরিবর্তন আমার ও চোখে পড়ে । আমি ওদের মতো করে ভাবতে পারিনা আর এটাও বুঝি ওরা আমাকে কিছু বলেনা আমার পায়ের নীচে খুঁটি মজবুত বলে । বিয়ের পর স্বামীর অবস্থানের সাথে বন্ধুদের কেন এড়িয়ে যেতে হবে? ওদের একটা সংগঠন আছে -সমাজসেবা করে বেড়ায়। খেয়াল করে দেখেছি যেখানে সমাজকর্ম করার বেশি চেয়ে হয় ফটোসেশন । বড়োলোকের বউদের সময় কাটানো নাকি সমাজকর্ম ঠিক বুঝিও না। এফবিতে ছবি দেখি, আমাকে ও ডাকে কিন্তু এসব মেকিতে আমার বিশ্বাস কম। অবশ্য আজকাল প্রচারের জন্য মুখিয়ে থাকে বেশিরভাগই। ভাইরাল হবার তীব্র নেশায় কতো কি দেখি! ওদের ভাবনায় আমি অনেক কিছু কম বুঝি, আমি ও যে তাদেরকে বুঝি সেটা বুঝতে দেই না। মাঝেমধ্যে সবার সাথে আড্ডা দিয়ে রিচার্জ হওয়াটা আমার মতো মানুষের কাছে মুখ্য।
অবশ্য দুই পক্ষই সঠিক—যার যার ভাবনায় !
“আশা শোন আমরা দুপুরে খাবার পর সিনেপ্লেক্সে ছবি দেখতে যাবো “
“তার চেয়ে চল রাবুকে একটা সারপ্রাইজ দেই ? দল বেঁধে সকালে নরসিংদী যাই? কাছেইতো সকালে গিয়ে রাতেই ফিরতে পারবো, বহুদিন ওকে দেখিনা আর গ্রামেও যাওয়া হবে ।“
“আশা আমাদের গ্রাম ভালো লাগেনা আর বাথরুম সমস্যা আছে। গ্রামের লোকজন কেমন করে তাকিয়ে থাকে!”
“আরে নায়িকারা গেলেতো তাকাবেই আর একদিনের ব্যাপার চল যাই ?”
না, ওরা কেউই রাজি হলোনা । মুখ ফুটে বলেই ফেললো গ্রামে দেখার আছেটা কি ? গ্রাম দূর থেকেই সুন্দর এসবে ওদের আগ্রহ একদম নাই ।
আমিও আর জোর করলাম না তবে গেট-টুগেদারের দিন লিবাকে জোর করে নিয়ে নরসিংদী রওয়ানা দিলাম। রাবু পাগলী রাগ করবে না বলে যাচ্ছি বলে তবে এটা জানি আন্তরিকতার অভাব থাকবেনা সেখানে । আন্তরিকতা থাকলে সেখানে অন্যকিছু আর লাগেনা। চারদিকের কৃত্রিমতা দেখে দেখে ক্লান্ত আমি । এই মেকি মুখোশের চাইতে অনেক অনেক দামী বন্ধুত্ব আর আন্তরিকতা। সবাই এক নির্মম প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে অথচ নিজেদের অতীতটা একদম ভুলেছে।স্কুলে কেউ অবস্থান দেখে বন্ধু ছিলো না তাহলে আজকে কেন এই আচরণ! ওদের মতো আমি এতটা পরিবর্তন করতে পারিনি নিজেকে। বন্ধুর অবস্থান দেখে বন্ধুত্ব জমে না। বন্ধু একটা অনুভূতির নাম সেখানে অন্যকিছু মুখ্য বিষয় হতে পারে না। আজকাল বেশিরভাগ মানুষই অদ্ভুত একটা রোগে আক্রান্ত। নিজেদের অবস্থান বদলানোর পর পুরনো দিন ভুলে যাওয়াকে আমার চোখে স্বাভাবিক মনে হয় না। দুইদিনের দুনিয়ায় এতটা ছক কষে চলাটা সুস্থতা না।
অবাক হলাম এক সময়ে যে বন্ধুত্ব খুব মুল্যবান ছিলো -- সেটা কখন যেনো মুল্যহীন হয়ে গেলো!
460 Views
12 Likes
1 Comments
4.5 Rating
Rate this: