প্রতিদিন ভোরবেলা, যখন রাতের নীরবতা ভেঙে সূর্যটা আকাশে উঠে, তখন চর জাঙ্গালিয়া গ্রামের একজন কৃষক, রাকিবুল ইসলাম, ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হন। তার চোখে একটু ক্লান্তি, তবে হৃদয়ে অদম্য শক্তি। মাটি তার কাছে শুধুই মাটি নয়, এক জীবন্ত সঙ্গী, যার সাথে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। কৃষক জানেন, যে মাটি তাকে তার জীবনের আহার দেয়, সেই মাটির প্রতি তার ভালোবাসা কখনো কমে না।
সে দিনের শুরুতে, যখন পাখিরা গান গায়, কৃষক তার কাজ শুরু করেন। মাঠে হাল চাষ, বীজ বোনা, আর যখন মন চায়, একটু ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে তিনি মাটির গন্ধ নেন। যেন তার শরীরে, মনের ভিতরে এক সুর বেজে ওঠে। মাটির সঙ্গে তার সম্পর্কটা এমন, যেটি একমাত্র কৃষকই বোঝে। জমি চাষ করা তার কাছে একটা কবিতা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে এক নতুন সুর তৈরি হয়।
কিন্তু কৃষকের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি কষ্টও অনেক। আজকাল জমিতে কাজ করতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ট্রাক্টরের খরচ, সার ও কীটনাশকের দাম, সব মিলিয়ে কৃষকরা তাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পায় না। কৃষক জানেন, তার ফসল বাজারে যায়, কিন্তু সেখানে তার পরিশ্রমের মূল্য কখনো সঠিকভাবে দেয়া হয় না। তবুও, তিনি তার কাজ ছেড়ে দেন না। তার দৃঢ় বিশ্বাস—কৃষক যদি থেমে যায়, তবে দেশের শস্য ভাণ্ডার খালি হয়ে যাবে।
তার জীবন যেন এক যাত্রা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে তার কষ্ট আর সংগ্রাম গানের মতো ঢেউ খায়। কিন্তু তার মনে কোনো অভিযোগ নেই। বরং, তিনি বলেন, "যত দিন মাটি থাকবে, তত দিন কৃষক থাকবে। আমাদের কাজ না করলে, এই দেশ চলবে কীভাবে?"
কৃষক যখন মাঠে কাজ করেন, তখন তার মনে থাকে এক অদৃশ্য সুর, যে সুর তাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি দেয়। তার আঙ্গুলে যখন বীজ বোনা হয়, তখন মনে হয় যেন পৃথিবী নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। তার পরিশ্রম, তার শরীরের ঘামসবই যেন এক মহাকাব্য, যা সময়ের সাথে সুর মিলিয়ে বেঁচে থাকবে।
গ্রামের মানুষও তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে। তার সততা আর পরিশ্রমের কারণে কৃষক সবার প্রিয়। তার মতো কৃষকরা যখন পরিশ্রমের মূল্য না পেয়ে কষ্টে থাকে, তখনও তারা আশা হারায় না। তাদের বিশ্বাস, একদিন তাদের কাজের সঠিক মূল্য তারা পাবে। সেই দিনের অপেক্ষায়, কৃষক নিজেকে প্রস্তুত রাখেন এমন একটি দিনে, যখন কৃষকের সম্মান ফিরবে।
গল্পের শেষটা কিছুটা অন্ধকার হলেও, কৃষকের মনে আলো জ্বলতে থাকে। তার বিশ্বাস, তার মাটির সুর একদিন সকলের কানে পৌঁছাবে, এবং কৃষকরা তাদের মেহনতির সঠিক মূল্য পাবেন।
কৃষকের সংগ্রাম একটি অবিরাম প্রক্রিয়া, যা মাটির সাথে তাদের সম্পর্ক এবং জীবিকা অর্জনের জন্য নিরন্তর পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে। কৃষকের সংগ্রাম কেবলমাত্র তাদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, প্রশাসনিক অবহেলা এবং সামাজিক অসন্তুষ্টির বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই।
কৃষকের সংগ্রামের কিছু প্রধান দিক:
1. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বন্যা, খরা, সাইক্লোন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় কৃষকদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
2. অর্থনৈতিক সংকট: উৎপাদন খরচ বাড়ানো, সঠিক মূল্য না পাওয়া, ঋণের বোঝা এবং বাজেটের অভাব কৃষকদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ।
3. যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির অভাব: আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক কৃষক অনুন্নত পদ্ধতিতে কাজ করতে বাধ্য হন।
4. শ্রমিক সংকট: বিশেষ করে ছোট কৃষকরা ক্ষেত্রের কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পান না, ফলে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়।
5. সরকারি সহায়তার অভাব: অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকদের জন্য যথাযথ সরকারী সহায়তা, প্রণোদনা ও নীতি প্রয়োগের অভাব রয়েছে।
এই সংগ্রাম কৃষকদের জীবনে নিরন্তর চাপ তৈরি করে, কিন্তু তাদের পরিশ্রম, সাহস ও আত্মবিশ্বাস অনেক সময় এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। কৃষকের সংগ্রাম শুধু তাদের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ন বিষয়।
কৃষকের সংগ্রাম
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
170
Views
1
Likes
1
Comments
0.0
Rating