★শেষ বিকেলের দেখা ★
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
শেষ বিকেলের সূর্যটা তখনও পশ্চিম আকাশে লুকোচুরি খেলা করছে। ছোট্ট শহরটার আনাচে-কানাচে তার রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক এমন সময়ে, রায়হান হেঁটে যাচ্ছে শহরের পুরনো লাইব্রেরির পাশ দিয়ে। ক্লাস থেকে ফিরছিল সে, কিন্তু মনের ভেতর কোনো এক অজানা কষ্টে তার মন ভারি। কিছু একটা হারিয়েছে সে, কিন্তু কী, সেটা বোঝার আগেই তার চোখে পড়ল লাইব্রেরির সামনের বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটি।
মেয়েটির নাম মায়া। পাতলা ফ্রেমের চশমার আড়ালে তার চোখ দুটি যেন কেমন এক রহস্যময় দৃষ্টিতে ভরপুর। সে ধীরে ধীরে বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছিল, অথচ তার দৃষ্টি দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। রায়হান থমকে দাঁড়াল। তার মনে হলো, এই মেয়েটির সঙ্গে কিছু বলতে হবে। কেন যেন তার মন বলছে, মায়ার কাছে তার অনেক দিনের হারানো কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে।
রায়হান ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তুমি কি প্রতিদিন এখানে আসো?”
মায়া চমকে তাকাল। তারপর হেসে বলল, “হ্যাঁ, বই পড়তে ভালোবাসি। এই লাইব্রেরির বইগুলো আমার প্রিয়।”
রায়হান হাসল। “তুমি কি জানো, এখানে আমি আগে বহুবার এসেছি। কিন্তু আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, এই জায়গাটা যেন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।”
মায়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। তবে তার চোখে একটা প্রশান্তির ঝিলিক ফুটে উঠল। "কী বলছেন আপনি! আমি তো শুধু পড়তে এসেছি।"
রায়হান তাকে মিষ্টি করে বলল, "তুমি জানো, জীবনেও এমন কিছু জায়গা থাকে যেখানে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। তোমাকে দেখে মনে হলো, তুমি সেই জায়গার মতো।"
মায়া একটু হেসে বলল, “কথা বলতে তুমি খুব পটু, তাই না? কিন্তু তুমি কি জানো, এই শহরে কেউই একে অপরকে চেনে না।”
রায়হান অবাক হয়ে বলল, “তোমার কথার মধ্যে কেমন যেন একটা সুর আছে, যেন তুমি আমার কথা বলছো। তোমার কণ্ঠে কেমন একটা নির্ভরতার ছাপ।”
মায়া একটু চুপ থেকে বলল, “তুমি হয়তো ঠিকই বলছো। অনেক দিন হলো কারো সঙ্গে এমন করে কথা বলা হয়নি। তবে আজ তোমার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে যেন বহুদিনের চেনা।”
রায়হান বলল, “তুমি কি জানো, তুমি আমায় কেন যেন একদম নিঃশব্দে স্পর্শ করছো। যেন মনে হচ্ছে, তোমার সঙ্গে কাটানো এই কয়েক মুহূর্তের জন্যই বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম।”
মায়া একটু হাসল। “এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না রায়হান। তবে কী জানো, জীবন অনেক সময় বড় অদ্ভুত হয়ে যায়। হঠাৎ হঠাৎ কিছু মানুষ মনের অনেক গভীরে গিয়ে বসে পড়ে।”
সেই বিকেলে তাদের কথাগুলো যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়া শেষ সূর্যের রঙের মতোই মিশে গেল। দুজনেই হাঁটতে হাঁটতে শহরের পুরনো গলিতে চলে গেল। রায়হান অনুভব করল, মায়ার সঙ্গ যেন তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
এরপর তাদের প্রতিদিন দেখা হতে লাগল। প্রতিটি দিন, প্রতিটি সন্ধ্যায় তাদের মনের জগতে আরও নতুন নতুন গল্পের জন্ম হতে লাগল। তারা বুঝতে পারল, দুজনেই একে অপরের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
একদিন রায়হান মায়াকে বলল, “মায়া, তোমার জন্য এই শহরটা বদলে গেছে। তুমি জানো না, কিন্তু তোমার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার জীবনের মূল্যবান সময়।”
মায়া কিছু বলল না, শুধু চুপচাপ তার হাতটা ধরে বলল, “তুমি কি জানো, কিছু অনুভূতি আছে যেগুলো বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। ঠিক যেমন আমি প্রতিদিন তোমার সঙ্গে হাঁটতে ভালোবাসি, কিন্তু কখনো তোমায় বলিনি।”
সেদিন তারা দুজনেই বুঝল, এই অনুভূতির নাম ভালোবাসা। হয়তো তারা একে অপরকে হারানোর ভয়ে কোনো দিন মুখ ফুটে এই কথাগুলো বলবে না, কিন্তু তারা দুজনেই জানে, তাদের মনের গোপন জগতে এই ভালোবাসার অনুভূতি চিরকাল থাকবে।
পরবর্তী কয়েকটা দিন তাদের আর দেখা হলো না। ব্যস্ততা, কাজের চাপ, জীবন এই কদিনে কেমন যেন হুট করেই বদলে গেল। কিন্তু একদিন বিকেলে মায়া আবার সেই পুরনো লাইব্রেরির বেঞ্চে ফিরে এল। দূর থেকে দেখতে পেল, রায়হান সেখানে অপেক্ষা করছে। দুজনের চোখে চোখ পড়ল। এক মুহূর্তে মনে হলো, এই কয়েকটা দিন যেন কিছুই বদলায়নি।
রায়হান মৃদু হেসে বলল, “তুমি জানো মায়া, কিছু মানুষ জীবনে আসেই শুধু থেকে যাওয়ার জন্য।”
মায়া চোখ নামিয়ে বলল, “হয়তো আমরাও তেমনই কিছু মানুষ, যারা একে অপরের জীবনের গল্পের অংশ হয়ে থাকব চিরকাল।”
শহরের শেষ বিকেলটা তাদের সেই মুহূর্তে এক চিরস্থায়ী স্মৃতি হিসেবে রেখে গেল, যেখানে তাদের ভালোবাসার গল্পটা চিরকাল জীবন্ত থাকবে।
140
Views
3
Likes
0
Comments
4.5
Rating