ভোরে শিউলিগাছের ডালে বসে এক পাখি যেন উঁচু স্বরে চিৎকার করে উঠলো, “চল ঘরে, এখনো সময় আছে।” তবে এই সতর্কবার্তা কে শুনবে? নিতাই জ্যাঠার কথা অনুযায়ী গ্রামের শেষ মাথায় বটগাছটার তলায় রাতে আসতে বলেছিল যে, সেই কুণালকে। বটগাছটা যেন দিনের আলোতেও অন্ধকার, আর রাতের বেলা সেখান দিয়ে যারা যায়, তাদের মনে হয় যেন কেউ পিছু নিচ্ছে।
কুণাল একজন শহরের মানুষ, চাকরি সূত্রে গ্রামে এসে বসবাস করছে। সে মেধাবী, যুক্তিবাদী, কোন ভূতপ্রেতের কথা সে মানে না। তার ধারণা ছিল, এটা স্রেফ মানুষের কল্পনা, আর সেকারণেই সেদিন রাত দশটায় গ্রামের ওই অন্ধকার রাস্তা ধরে হেঁটে চলল বটগাছের দিকে। সাথে একটা ছোট লন্ঠন, যেন তার সাহস প্রদর্শন। বটগাছের তলায় পৌঁছে সে দাঁড়ালো, কিন্তু যেন কিছু একটা তাকে টানছে ভেতরের দিকে।
চারদিকে গভীর অন্ধকার, যেন বটগাছটা সব আলো শুষে নিয়েছে। হঠাৎই সে অনুভব করলো, একটা ঠান্ডা শীতল হাত যেন তার কাঁধে পড়লো। সে তাকিয়ে দেখলো, সামনে একটা বয়স্কা মহিলা, অন্ধকারে তার মুখ পুরোটা দেখা যায় না। চোখে যেন শুধুই একটা দৃষ্টি, যা তাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। “তুই এসেছিস, অপেক্ষা করছিলাম,” গম্ভীর স্বরে বলল সেই মহিলা। কণ্ঠস্বর যেন প্রতিধ্বনির মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
কুণালের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। মহিলার ঠান্ডা চাহনির ভেতরে কিছু ছিল, একটা নিরীহ অথচ অস্বাভাবিক কিছু। মহিলার চাহনি যেন ক্রমশ তাকে ভিতরে টেনে নিচ্ছিল। কুণাল পিছু হটতে গেল, কিন্তু তার পা যেন জমে গেল মাটির সঙ্গে। তার মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরোচ্ছিল না।
মহিলা আবার কথা বলল, “তুই তো জানিস না, কে আমি।” কুণালের মাথায় আগের রাতের একটা কাহিনী মনে পড়ে গেল, যেটা নিতাই জ্যাঠা তাকে বলেছিল - বটগাছটার নিচে কয়েক দশক আগে এক বিধবা মহিলা আত্মহত্যা করেছিল। সে ছিল গ্রামের একমাত্র লোক, যার সব সন্তান একে একে মারা গিয়েছিল, আর সে বেঁচে ছিল একেবারে একা। কথিত আছে, সে প্রতিশোধ নিতে সব মেয়েকে তাড়িয়ে বেড়াতো। যে মেয়েরা এই পথ দিয়ে রাতবিরাতে যেত, তাদের আর কখনো দেখা যেত না।
এই কথা মনে পড়তেই কুণালের মাথা ঘুরে গেল, কিন্তু মহিলার সেই চোখ যেন তাকে বন্দী করে ফেলেছে। সে কিছুতেই সেই চাহনি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছিল না। কুণাল তখন ভাবল, এটাই কি শেষ? সে কি তার জন্য অপেক্ষা করছিল?
সে যখন জ্ঞান হারাতে চলেছে, তখনই মহিলার কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এলো, “ভয় পাস না, তোর মেয়েটা ঠিক আছে। ওকে আমি আগলে রেখেছি।” কথাটা শুনে কুণাল আরও ভয় পেয়ে গেল, কারণ সে জানত না, মহিলাটি তার মেয়ের কথা কিভাবে জানল! তার মেয়ে তো শহরে থাকে।
হঠাৎ এক ঝলক আলোর মধ্যে, সেই মহিলা গায়েব হয়ে গেল। কুণাল তাকিয়ে রইলো অন্ধকারের দিকে। চারপাশে নীরবতা। সে কি সত্যিই কিছু দেখেছিল, নাকি সেটা তার কল্পনা?
সেদিন থেকে কুণালের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসল। সে রাত নামলেই দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কেউ আসবে।
চন্দ্রিমা রাতে তার প্রতীক্ষা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
85
Views
3
Likes
0
Comments
4.5
Rating