ছায়া

গ্রামের নাম ছিল বটপাড়া। এই গ্রামের প্রত্যেকটা কোণে যেন একটা গা ছমছমে পরিবেশ বাস করত। পুবদিকের সেই পুকুর, বড় বটগাছ, আর তার পাশের শ্মশান—সব কিছুই যেন একটা গল্প বলে। গ্রামের মানুষজন এই জায়গাগুলো এড়িয়ে চলতো রাতের বেলায়। আর ঠিক এই রাতেই ফিরছিলেন সোমেশ্বর।

সোমেশ্বর পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক। শহরে পড়াশুনা করেছেন, তাই ভূতের গল্পে তিনি বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু সেই রাতে যেন তার মনটা কেমন একটা আশঙ্কায় ভরে গিয়েছিল। স্কুলের কাজ শেষে ফেরার পথে রাত অনেকটা গড়িয়ে গিয়েছিল। চারপাশ নিঝুম, হাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজে বাতাসে যেন চাপা কান্নার শব্দ মিশে ছিল।

সোমেশ্বর যখন গ্রামপথের পাশের সেই পুরোনো পুকুরের কাছে এসে পৌঁছালেন, তখন শুনতে পেলেন পাতার মর্মর শব্দের ফাঁকে ফাঁকে কে যেন আস্তে করে ফিসফিস করে কিছু বলছে। হঠাৎ তার মনে হলো, পুকুরের পাড়ে একটি ছায়ামূর্তি বসে আছে। ঘন কালো চুল, দীর্ঘ পোশাক, চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন সোমেশ্বর।


সোমেশ্বর মনে মনে ভেবেছিলেন, রাত অনেক হয়েছে, এখন বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু পা যেন এগোচ্ছেই না। ছায়াটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। ঠিক তখনই সেই ছায়া মূর্তিটি হাত তুলে ইশারা করল। অজানা এক আকর্ষণে সোমেশ্বর এগিয়ে গেলেন।

তিনি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কে? এত রাতে এখানে কী করছেন?"

মেয়েটি উত্তর দিলো না, শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। গলার স্বরটা ভাঙা ভাঙা, যেন অনেককাল কথা বলেনি এমন কেউ। হঠাৎ সেই মেয়েটি বলল, "তোমাকে কি বলিনি, এখানে রাতে কেউ আসে না?"

সোমেশ্বর একটু ভয় পেলেন, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আপনি এখানেই থাকেন?"

মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল, "আমি কোথাও থাকি না। আমায় সবাই ভুলে গেছে।"


পরের দিন সকালে, গ্রামের বয়স্ক লোকদের কাছে জানতে চাইলেন সোমেশ্বর। একজন বৃদ্ধা বললেন, "তুমি কি সেই পুকুরের পাশে এক মেয়েকে দেখেছ? ও তো ললিতা। কয়েক বছর আগে তার বিয়ের দিনেই সে ডুবে মারা গিয়েছিল। এখনো রাতের বেলায় তার ছায়া নাকি পুকুর পাড়ে বসে থাকে। কেউ ওর কাছে গেলে সে তার গল্প শোনাতে চায়।"

সোমেশ্বরের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।


পরের কয়েকদিনও তিনি পুকুরের পাশে গিয়ে বসে থাকলেন। প্রতিদিনই সেই ছায়া মেয়েটির সাথে দেখা হলো। ললিতা যেন তার সমস্ত কষ্ট আর দুঃখের গল্প বলতে শুরু করল। কেমন করে তার বিয়ের রাতে তাকে পুকুরে ফেলে দিয়ে সবাই চলে গিয়েছিল।

একদিন রাতে ললিতা বলল, "তুমি আমার গল্প শুনেছ, কিন্তু আমি চাই তুমি আমায় ভুলে যাও। এখানে বারবার আসো না।"

কিন্তু সোমেশ্বর তার কথায় পাত্তা দিলেন না।


সেদিন রাতে গ্রামে ঝড় উঠল। সে রাতেই সোমেশ্বরের আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। পরদিন সকালে পুকুরের পাশেই পড়ে ছিল তার জুতো, একটা বই আর একটা অর্ধগলিত খাতা, যেখানে লেখা ছিল:

"ললিতা সত্যি ছিল, সে শুধু আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। এই অপেক্ষার অবসান হলো। আমি যাচ্ছি তার সাথে।"

গ্রামের লোকেরা বলল, ললিতা তাকে নিজের সাথে নিয়ে গেছে। এখনো পূর্ণিমার রাতে পুকুরপাড়ে নাকি তাদের দুজনকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায়।

বটপাড়ার পুকুরের সেই গল্প এখনো হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়, যেন সত্যিই কোনো প্রেতাত্মা তার প্রিয়জনের অপেক্ষায় বসে আছে...........


193 Views
4 Likes
1 Comments
4.0 Rating
Rate this:
(1)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (1)

Reader photo
Unknown
20-Jun-2025, 07:22 PM

nice love story horror