সন্দহের বীজ বপন

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:

রাহাত ও শারমিনের বিয়ে হয়েছিল ভালোবাসার মাধ্যমে। দু’জনের আলাপ হয়েছিল একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে। পরিচয়ের পর থেকেই দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা সময়ের সাথে সাথে গভীর হয়ে যায়। শারমিন ছিল শান্ত, ভদ্র আর দায়িত্বশীল। আর রাহাত ছিল রাশভারী, আত্মপ্রত্যয়ী, এবং মাঝে মাঝে কিছুটা সন্দেহপ্রবণ। তবে শারমিনের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম।

বিয়ের প্রথম কয়েক বছর সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। শারমিন রাহাতের প্রতি তার ভালোবাসা এবং দায়িত্ব পালন করছিল সাধ্যমতো। রাহাতও তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও শারমিনের প্রতি যত্নবান ছিল। তবে ধীরে ধীরে রাহাতের মধ্যে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করল।


রাহাতের কাজের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। কাজের চাপ, সহকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা, আর বাইরের সমাজের প্রভাব তার মনে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল। সে বুঝতে পারছিল না, কিন্তু তার এই অস্থিরতা ধীরে ধীরে শারমিনের প্রতি তার আচরণে প্রতিফলিত হতে লাগল।

প্রথমদিকে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে রাহাত শারমিনকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। "তুমি কার সাথে এতক্ষণ ফোনে কথা বলছিলে?", "তোমার মোবাইলের পাসওয়ার্ড কেন পাল্টালে?", "তোমার অফিসে নতুন কেউ এসেছে নাকি?"— এমন প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শারমিন প্রথমদিকে এসব নিয়ে তেমন কিছু ভাবেনি, কারণ সে জানত রাহাত তাকে ভালোবাসে এবং হয়তো কাজের চাপেই কিছুটা অস্থির।

কিন্তু রাহাতের সন্দেহপ্রবণতা দিন দিন বাড়তেই থাকে। শারমিনের যেকোনো কাজ, যেকোনো কথা, এমনকি তার আচরণকেও রাহাত সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। সে শারমিনের ফোন চেক করা শুরু করল, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার সাথে কথা বলছে, সেটা খতিয়ে দেখতে লাগল। শারমিন যতই তার নির্দোষিতা প্রমাণ করার চেষ্টা করুক, ততই রাহাতের সন্দেহ বাড়তে থাকে।


একদিন অফিস থেকে ফেরার পর রাহাত শারমিনকে জিজ্ঞাসা করল, "আজ তুমি কোথায় গিয়েছিলে?" শারমিন একটু অবাক হয়ে বলল, "আমি তো কোথাও যাইনি, বাসাতেই ছিলাম।" রাহাত তৎক্ষণাৎ পাল্টা উত্তর দিল, "তাহলে আমার সহকর্মী কেন বলল, তোমাকে সে বাইরে দেখেছে?"

শারমিন তখন ভীষণ কষ্ট পেল, কারণ সে জানত এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সে রাহাতকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু রাহাত তার কথা শুনতে চাইছিল না। এ ধরনের ঘটনা ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ককে দূরত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

রাহাতের সন্দেহপ্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সে শারমিনের যেকোনো পদক্ষেপ নিয়েই অভিযোগ করতে শুরু করে। শারমিন যদি বাজারে যেত, তবে রাহাত জানতে চাইত, "তুমি এতক্ষণ কেন বাইরে ছিলে?" যদি সে বন্ধুর সাথে দেখা করত, তাহলে রাহাতের প্রশ্ন আসত, "তোমার সেই বন্ধুটিকে কেন এতবার দেখা করতে হয়?"


শারমিনের জীবন যেন ধীরে ধীরে একটি বন্দি ঘরে পরিণত হচ্ছিল। সে যা-ই করুক না কেন, রাহাতের সন্দেহের চোখ তার উপর ছিল। এ ধরনের মানসিক চাপ তার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে চেষ্টা করেছিল রাহাতকে বোঝানোর, তার ভালোবাসা প্রমাণ করার, কিন্তু রাহাতের সন্দেহ তাকে ক্রমাগত আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল।

একদিন শারমিনের মনের ওপর এতটাই চাপ তৈরি হয় যে সে মায়ের সাথে দেখা করতে যায়। মাকে সে সব খুলে বলে, "মা, আমি আর পারছি না। রাহাত আমাকে নিয়ে সবসময় সন্দেহ করে। আমি যেন কোন অপরাধ করে ফেলেছি!"

শারমিনের মা তাকে শান্ত হতে বলেন, "বাবা, সংসার জীবন সহজ নয়। অনেক ধৈর্যের দরকার হয়। তুমি রাহাতের সাথে আবার কথা বল, হয়তো সে বুঝবে।"

মায়ের কথা শুনে শারমিন কিছুটা শক্তি ফিরে পায়। সে আবার রাহাতের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু রাহাত তখনও একই রকম সন্দেহপ্রবণ এবং তার অভিযোগের তালিকা যেন দিন দিন আরও দীর্ঘ হচ্ছিল।


একদিন রাহাত বাড়ি ফিরেই শারমিনকে তীব্র ভাষায় দোষারোপ করতে থাকে। সে বলে, "তুমি আমার পেছনে কী করছো? কার সাথে তোমার সম্পর্ক আছে?" শারমিন কান্নায় ভেঙে পড়ে, সে রাহাতকে বোঝানোর চেষ্টা করে, "আমি তোমার স্ত্রী, আমি তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবি না। তুমি কেন এমন বলছ?"

রাহাত শারমিনের কথায় কর্ণপাত করল না, বরং তার সন্দেহ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সে এমন সব কথাবার্তা বলতে শুরু করে যা শারমিনের হৃদয়কে আঘাত করে। রাহাতের এমন আচরণে শারমিন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে থাকে।

সেই রাত ছিল শারমিনের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারময় রাত। রাহাতের অবিশ্বাস, সন্দেহ, এবং বারবারের অপমান তার মনে এমন গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল যে সে জীবনের প্রতি সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তার মনে হলো, এই সম্পর্ক থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই।


পরদিন সকালে, রাহাত যখন ঘুম থেকে উঠল, তখন সে শারমিনকে দেখতে পেল না। পুরো বাসা খুঁজেও তার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। অবশেষে সে শোবার ঘরের পাশের রুমে ঢুকে যা দেখল, তা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য হয়ে থাকবে।

শারমিনের নিথর দেহটি ফ্যানের সাথে ঝুলে ছিল। তার গলায় দড়ি বাঁধা, আর চোখ বন্ধ। রাহাতের মনে হলো যেন তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। সে কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর চিৎকার করে উঠল, "শারমিন! না!" কিন্তু তখন সবকিছুই শেষ হয়ে গিয়েছে।


রাহাতের মনে তখনই উপলব্ধি হলো, তার সন্দেহই তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। শারমিন ছিল তার ভালোবাসার মানুষ, কিন্তু তারই কারণে শারমিন আজ নেই। রাহাতের মন তখন অনুশোচনায় ভরে যায়, কিন্তু ততক্ষণে সবকিছুই শেষ। শারমিন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে তার ভালোবাসার মানুষটির বিশ্বাস করতে পারেনি। তার সন্দেহের বীজই তাদের জীবনকে এভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে।

গল্পটি আমাদেরকে একটি গভীর বার্তা দেয়। সন্দেহ সম্পর্কের ভেতরে যে বিষ ঢেলে দেয়, তা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত্তিকে নষ্ট করে ফেলে। বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্মান ছাড়া কোনো সম্পর্কই টিকে থাকতে পারে না। সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস বা সন্দেহ না করে, ভালোবাসা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
107 Views
4 Likes
1 Comments
4.8 Rating
Rate this: