সন্দেহ 😥

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
গরিব ঘরের মেয়েদের জীবনে নানা রকম প্রতিকূলতা আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তেমনই এক মেয়ে ছিল রূপা , দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার বাবা একজন দিনমজুর ছিলেন, মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই অভাব অনটনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা রূপার জীবনে স্বপ্নের জায়গা ছিল খুব কম। তবুও মেয়েটি ছিল সুন্দর, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী। তার সুন্দর ব্যবহারের জন্য সবাই তাকে ভালোবাসত। কিন্তু তার ভাগ্য যেন অন্য রকম কিছু ঠিক করে রেখেছিল।

রূপার বয়স যখন মাত্র বিশ বছর, তখন তার পরিবারে এক বড় পরিবর্তন আসে। গ্রামের একজন বড়লোকের ছেলের সাথে রূপার বিয়ে ঠিক হয়। বড়লোকের ছেলে আদিত্য, রূপাকে পছন্দ করেছিল এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে দেখে। সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেয় রূপাকেই জীবনসঙ্গিনী করবে। যদিও আদিত্যের পরিবার রূপার মত গরিব ঘরের মেয়েকে বউ হিসেবে মেনে নিতে একেবারেই রাজি ছিল না, কিন্তু আদিত্য জেদ ধরেছিল। অবশেষে, পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়েই আদিত্য রূপাকে বিয়ে করে।

বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর রূপা নতুন সংসারে আসলেও সেখানকার পরিবেশ তার জন্য ছিল অনেক কঠিন। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে প্রথম থেকেই সন্দেহের চোখে দেখত, কারণ তারা ভাবত গরিব ঘরের মেয়ে সম্পদ আর প্রতিপত্তির জন্যই তাদের ছেলের সাথে বিয়ে করেছে। রূপা এই সব কষ্ট সহ্য করেও স্বামীকে ভালোবাসত এবং তার প্রতি পূর্ণ আস্থা ছিল। আদিত্যও তাকে খুব ভালোবাসত এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সে রূপাকে সব দিক থেকে রক্ষা করবে।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ঘটে বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে। আদিত্য একটি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং হাসপাতালে নেয়ার পরেই মারা যায়। রূপার জীবনে যেন হঠাৎ করে অন্ধকার নেমে আসে। তার জন্য স্বামী হারানোর শোক অসহনীয় হয়ে ওঠে। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে এত বড় একটা দুর্ঘটনা তাকে একেবারে ভেঙে দেয়।

স্বামী মারা যাওয়ার পর রূপার জীবনের কষ্ট যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। আদিত্যের পরিবারের সদস্যরা প্রথম থেকেই তাকে মেনে নেয়নি, আর এখন স্বামী মারা যাওয়ার পর তারা তাকে বাড়িতে রাখতেও চাইছিল না। তাদের মধ্যে সন্দেহ ও ঘৃণার বীজ আরও গভীর হয়ে উঠল। তারা মনে করল, রূপার জন্যই তাদের ছেলে মারা গেছে। তারা তাকে দোষারোপ করতে শুরু করল যে, সে তাদের ছেলের কপালে অমঙ্গল নিয়ে এসেছে।

রূপা শ্বশুরবাড়িতে থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আদিত্যের পরিবারের লোকজন প্রতিদিন তাকে অপমান করতে লাগল। একদিকে স্বামীকে হারানোর কষ্ট, আর অন্যদিকে পরিবারের এই দুর্ব্যবহার রূপাকে পুরোপুরি বেঙ্গে দিচ্ছিলো । শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কখনও তাকে ভালো চোখে দেখত না, আর এখন তারা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল।

স্বামী মারা যাওয়ার কিছুদিন পর রূপা জানতে পারে যে, সে গর্ভবতী। এই খবর তার জীবনে এক নতুন আশার আলো হয়ে আসে। কিন্তু তার জন্য এই খবরও একটি নতুন বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। যখন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা জানতে পারে যে রূপা গর্ভবতী, তখন তারা তাকে আরও অপমান করতে শুরু করে। তারা অভিযোগ তোলে যে, এই সন্তান তাদের ছেলের নয়, রূপা নিশ্চয়ই কারও সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। এই মিথ্যা অপবাদ আর দোষারোপের ফলে রূপা আরও একবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা রূপাকে আর তাদের বাড়িতে রাখতে পারবে না। তারা তাকে গায়ে হাত পর্যন্ত তোলে এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। রূপা অনেক চেষ্টা করেও তাদের মন পরিবর্তন করতে পারেনি। সে তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও অন্যান্য পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে চেয়েছিল যে এই সন্তান আদিত্যরই, এবং সে তাদের ছেলে ছাড়া আর কারও সাথে কখনও সম্পর্ক করেনি। কিন্তু তার কথায় কেউ কান দেয়নি।

রূপা বুঝতে পারে যে, এই বাড়িতে তার জায়গা নেই। শেষ পর্যন্ত, নিরুপায় হয়ে সে তার বাবার বাড়িতে ফিরে আসে। বাবার বাড়ির অবস্থাও ছিল খুব খারাপ, তবে রূপাকে আশ্রয় দিতে তারা কোনোরকম দ্বিধা করেনি। বাবার বাড়িতে ফিরে এসে রূপা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। একদিকে তার নিজের পরিবারের অভাব-অনটন, অন্যদিকে সমাজের অপবাদ। গ্রামে ও আশেপাশের এলাকাতে রূপার ব্যাপারে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মানুষজন বলতে শুরু করে যে, রূপা তার স্বামী বেঁচে থাকতেই অন্য কারও সাথে সম্পর্কে লিপ্ত ছিল, আর সেই কারণেই সে গর্ভবতী হয়েছে।

রূপা এই অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেকবার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছে। কিন্তু তার পেটে যে সন্তান আছে, তার কথা ভেবে সে এই সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকে। নিজের সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে চায় সে, আর এই জন্যই নতুন করে বাঁচার শক্তি খুঁজে পায়।

সমাজের এই সমস্ত কটাক্ষ ও অপবাদ সত্ত্বেও রূপা তার বাবার বাড়িতে থেকে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সে তার সন্তানের জন্য একটা ভালো পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে, যদিও পরিস্থিতি ছিল খুব কঠিন। বাবা-মা তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তাদের নিজের জীবনেও ছিল অভাব আর সংকট। তবুও, রূপা নিজের সংগ্রাম চালিয়ে যায়।

কিছু মাস পর রূপা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। সন্তানের মুখ দেখে রূপা নতুন করে জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সে ঠিক করে, এই সন্তানকে একদিন অনেক বড় করবে এবং তার সম্মান ফিরিয়ে আনবে। সন্তান হওয়ার পর রূপার জীবন যদিও কিছুটা স্থিতিশীল হয়, তবুও সমাজের চোখে তার অবস্থান আগের মতই রয়ে যায়। মানুষজন তাকে এখনও সন্দেহের চোখে দেখে এবং নানা অপমানজনক কথা বলে।

রূপার জন্য এই সময়টা ছিল আরও কঠিন, কারণ সন্তান জন্মের পর তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, আর তার পরিবারও আর্থিক সংকটে ছিল। কিন্তু রূপা থেমে থাকেনি। সে নতুন করে জীবিকা নির্বাহের উপায় খুঁজতে থাকে। নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সে একের পর এক কাজ করতে শুরু করে। গ্রামের মেয়েদের সেলাই ও হাতের কাজ শেখাতে শুরু করে সে। একসময় তার কাজের প্রশংসা হতে থাকে এবং গ্রামের অন্য মেয়েরাও তার সাথে যুক্ত হয়। রূপা ধীরে ধীরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করে এবং তার সন্তানকে লালনপালন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে।

বছর কেটে যেতে থাকে, এবং রূপার সন্তান বড় হতে থাকে। সমাজের অপবাদ ও কটাক্ষ সহ্য করেও সে তার সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। তার সন্তান যখন স্কুলে ভর্তি হয়, তখন রূপার মনে হয় তার জীবনের কিছুটা হলেও স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সে সন্তানের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যত গড়তে চায় এবং তাকে একদিন সমাজের সেরা মানুষ হিসেবে দেখতে চায়।

রূপার এই সংগ্রামের গল্প আসলে শুধু তার একার নয়, বরং অসংখ্য মেয়েদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। যারা সামাজিক কটাক্ষ, পরিবারের অবহেলা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েও নিজেদের জন্য এবং তাদের সন্তানের জন্য বাঁচার লড়াই করে। রূপার জীবন এটাই প্রমাণ করে যে, সমাজ যতই অপমান ও অবহেলা করুক না কেন, একজন মায়ের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা তাকে শেষ পর্যন্ত জয়ী করে তোলে।

শ্বশুরবাড়ির অবহেলা, সমাজের অপবাদ, আর নিজের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা—এই তিনের মধ্যে দোদুল্যমান থেকে রূপা তার জীবনের পথে চলতে থাকে। দিনশেষে, সে প্রমাণ করে যে তার জীবন শুধুমাত্র দুঃখ-কষ্টের গল্প নয়, বরং একটি সংগ্রামের গল্প, যেখানে একজন নারী তার মর্যাদা, ভালোবাসা ও সন্তানকে নিয়ে লড়ে যায় সমাজের সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে।

রূপার এই জীবনযুদ্ধ তার সন্তানের জন্য যেমন এক অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে, তেমনি সমাজের অন্যান্য নারীর জন্যও এক উদাহরণ।
260 Views
3 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: