মন আবেগী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
-ভাইয়া, হলো তোর? আরে রেডি হতে এত সময় নিলে বিয়ে করতে যাবি কখন? (প্রথম ছেলে)

-আচ্ছা আমি বুঝছি না তোর এত তাড়া কিসের? বিয়েটা করতে তো আমি যাবো নাকি? (দ্বিতীয় ছেলে)

-আরে ভাবির বোনগুলোকে লাইন মারতে হলে তো আগে যেতে হবে নাকি, এটা বুঝিস না। (তৃতীয় ছেলে)

-ওহ, এই ব্যাপার। তো তুই আমার শালিকাদের লাইন মারার জন্য আগে যেতে চাইছিস। (দ্বিতীয় ছেলে)

-তা নয় তো কী? (তৃতীয় ছেলে)

-তুই মনে  হয় গিয়ে ফিডার খাবি। (প্রথম ছেলে)

-না, আমি গিয়ে বিরিয়ানি গিলবো (তৃতীয় ছেলে)


এমন সময় নিচ থেকে এক মহিলার গলা শোনা গেল।

-আহান, রিওন......... রিক্তকে নিয়ে নিচে আয়। আমরা এখনই বেরোবো।

-এখন ওখানে গিয়ে কী করবি সেটা নিয়ে না ভেবে নিচে চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে (রিক্ত)

-তোরও তো দেখছি বিয়ে করার জন্য তর সইছে না। (আহান)

-আহান, গাট্টা খাবি কিন্তু। (রিক্ত)

-এখন গাট্টা খেয়ে মাথায় আলু বের হয়ে গেলে বিয়েবাড়িতে আর কোনো মেয়ে আমার ওপর ক্রাশ খাবে না।তার থেকে গাট্টাটা এসে মারিস।(আহান)

-🤦‍♂️🤦‍♂️🤦‍♂️(আহান)


__________________________



নানারকম আর্টিফিশিয়াল ফুল ও নেটের কাপড় দিয়ে সাজানো বাড়িটায় আজ সর্বত্র ব্যস্ততা বিরাজ করছে। কেউ সাজতে ব্যস্ত, কেউ সাজাতে, কেউ আবার খাবার বানাতে। মূলকথা সবাই এদিক থেকে ওদিক ছোটাছুটি করছে। কোন কাজ ছেড়ে কোন কাজ করবে। একটা বিয়ে বাড়িতে কী কম কাজ থাকে?

একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা সব কাজের তদারকি করছেন। তিনি বলে উঠলেন-


-আয়রা, একবার গিয়ে দেখতো আশার সাজা হলো কিনা? বরযাত্রী একটু পরই চলে আসবে।(মধ্যবয়স্ক মহিলা)

-যাচ্ছি আম্মু। (আয়রা)

আয়রা মায়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে উপরতলার কোণার ঘরটায় চলে গেলো। সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলে পার্লারের মেয়েগুলো ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আয়রা হাসিমুখে তার বড়বোনের কাছে আসে আর বলে-

-তোর হলো? (আয়রা)

-হ্যাঁ, হয়ে গেছে। তুই এখানে? তোর তো এখন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার কথা। (আশা)

-আরে দাঁড়াবো, দাঁড়াবো। আগে তোর বরকে তো আসতে দে। আজকে আমার কত প্ল্যানিং জানিস, জিজুর পকেট ফাঁকা করা তো আছেই সাথে তোর দেওরকে পটানো আর তার সাথে ডান্স করাও (আয়রা)

-ফাজিল একটা (আশা)

-ওটা তো আমি সবসময়ই। (আয়রা)


এমন সময় নিচ থেকে শোনা গেল হইচই -

"বর এসেছে, বর এসেছে"

-এইরে, বর চলে এসেছে। জিজু গেট ক্রস করে ফেলে তার আগেই আমাকে গেটের সামনে যেতে হবে। আপু, তুই থাক। একটু পরে আসছি আমি (আয়রা)

আয়রা এই বলেই দরজার দিকে ছুটলো। আর আশা বোনের পাগলামো দেখে হেসে ফেলল।



বিয়ের গেটের সামনে................


রিক্ত, আহান ও রিওন বরযাত্রীসহ বিয়েবাড়ির গেটে পা দিতেই কোথাথেকে একদল মেয়ে এসে বললো-

-এই, দাঁড়ান, দাঁড়ান দাঁড়ান। এখনই তো ভেতরে যাওয়া চলবে না।

-হ্যাঁ জিজু, আপনার বউ রেডি আছে। আপনি শুধু যাবেন, আর কাবিলনামায় সাইনটা করবেন। তাই এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই।

-এগুলো কিন্তু ভালো লাগে না। আমরা কতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো বলুন তো। (রিওন)

-আচ্ছা বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়াতে হবে না। আমাদেরকে খুশি করে দিন, আর ভেতরে চলে যান

-তাহলে বল শালিকারা, কতটুকুতে তোমরা খুশি হবে (রিক্ত)

-সেটা তো আমরা বলতে পারব না। আমাদের লিডার বলবে সেটা

-তো কে তোমাদের লিডার? (আহান)

-আশা আপুর মায়ের পেটের বোন। তবে সে তো এখনো আসেনি।

-ভাবির কাজিনরাই এত সুন্দর সুন্দর। না জানি বোন কত সুন্দর পরী হবে? (আহান মনে মনে)


এমন সময় মেয়েদের ভিড় সরিয়ে আয়রা সামনে এলো-

-দেখি দেখি সর সবাই,,। (আয়রা)

-এই তো আমাদের লিডার এসে গেছে।

-বাহ্ জিজু কে থামিয়ে রেখেছিস। সত্যি একটা কাজের মতো কাজ করেছিস তোরা। (আয়রা)


আহান আয়নার দিকে তাকাতে বড়সড় একটা ভিরামি খেল। যেন কোন এলিয়েন দেখেছে।

-তুমি!!!! (চিৎকার করে আহান)

আহানের চিৎকারে আয়রা তার দিকে তাকাতে তার চোখও অক্ষিকোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো।

-তুমি!!! (চিৎকার করে আয়রা)

- What the hell are you doing here! (আহান)

-Same question to you.. (আয়রা)

-তোরা একে অপরকে চিনিস? (রিক্ত)

-খুব ভালো করে। (দাঁতে দাঁত চেপে আয়রা)

-ভাইয়া, এই মেয়েটা এখানে কি করছে? (আহান রিক্তের উদ্দেশ্যে)

-এই আমার বাড়ি আমি থাকবো না তো কি তোমার আত্মা থাকবে? তুমি এখানে কী করছো সেটা বলো। (আয়রা)

-তোমার বাড়ি মানে? (আহান)

-আরে ও তো আশার ছোটবোন। (রিক্ত)

-What!!! (আহান)

-জিজু, এখন তুমি এটা বলো না, এই উজবুকটা তোমার ভাই (আয়রা)

-আরে ও ই তো আমার ভাই। (রিক্ত)

-কিহ্, এই দিন দেখার আগে আমি মরে গেলাম না কেন? (আয়রা)

-এই আয়রা আপু, কিসব উল্টোপাটা বকে যাচ্ছিস? আমাদের পাওনাটা কখন চাইবি?  (আয়রার কাজিনদের একজন)

-ওহ, হ্যাঁ, তাই তো। ওর ব্যবস্হা তো পরে করছি। আগে আমার কাজটা করি।(আয়রা)

-তো বলো শালিকারা, কত লাগবে তোমাদের? (আহান)

-উমমম............ বেশি নয়। ওই পঞ্চাশ হাজার হলেই হবে (আয়রা)

-What! (আহান)

-একটু বেশি হয়ে গেলো না শালিকা? ডিমান্ডটা একটু কমাও (রিক্ত)

-না,না যত বলেছি ততই দিতে হবে। এক টাকাও কমাবো না (আয়রা)

-মগের মুল্লুক পেয়েছে। ৫০ হাজার কেন ৫০ পয়সাও দেবো না। কী করবে করো। (আহান)

-Girls, Start your slogan. (আয়রা)

আয়রা এই বলার সাথে সাথে সব মেয়েরা বলা শুরু করলো-


-" টাকা নাই, বউ নাই "," টাকা নাই, বউ নাই "

-আচ্ছা আচ্ছা বাবা দিচ্ছি। বলছি শালিকারা, ত্রিশহাজার করলে হয় না। (রিক্ত) 

-না (মেয়েরা)

-আচ্ছা ঠিক আছে এই নাও, পঞ্চাশ হাজারই নাও (রিক্ত একটি টাকার বান্ডিল এগিয়ে দিয়ে)

-Yeaaaaaaaa.........(সব মেয়েরা চিৎকার করে উঠলো)

-what rubbish ভাইয়া, তুই ওদের কড়কড়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দিলি। (আহান)

-জিজু, বলছি তোমার এই উজবুক ভাইটার মুখটা একটু বন্ধ করতে বলো। না হলে কে বলতে পারে, তোমাকে বউ ছাড়াই বাড়িতে যেতে হয় (আয়রা)

-আহান, ভাই প্লিজ একটু মুখটা বন্ধ কর। ঝামেলা করিস না এখানে। (রিক্ত)

-😏 (আহান)

অবশেষে রিক্ত তার শালিকাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ির ভেতরে গেলো। সাথে আহান,রিওনসহ বাকি বরযাত্রীরাও ভেতরে প্রবেশ করলো। তবে যাওয়ার আগে, আহান আয়নার দিকে আড়চোখে একটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি  নিক্ষেপ করলো। আয়রা তা দেখে মুখ ভেংচালো।

এদের ঝগড়ার কারণ হলো এরা একে অপরের X. কলেজ লাইফে এরা রিলেশনশিপে ছিলো। তবে ছ' মাস যেতে না যেতেই এদের ব্রেকআপ হয়ে যায়। যার কারণে তারা একে অপরকে দু চোখে সহ্য করতে পারে না। তবে কিশোর বয়সে সৃষ্ট মনের অনূভুতিটা কি আদৌ ওরা দাফন করতে পেরেছে কি না, তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।


____________________________


আয়রা আশার ঘরে এসে ধাপ করে সোফায় বসে পড়ল।

-কিরে, কি হলো আবার? এমন বাংলার পাঁচের মতন মুখ করে রেখেছিস কেন? তোর জিজু কি কম টাকা দিয়েছে? (আশা)

-আরে না, যত টাকা চেয়েছি তত টাকাই দিয়েছে (আয়রা)

-তাহলে? (আশা)

-একটা উজবুকের সাথে অনেকদিন পর আবার দেখা হয়েছে? (আয়রা)

-আর সেটা কে? (আশা)

-তোর একমাত্র দেবর। (আয়রা)

-ও আহান? (আশা)

-হুম। (আয়রা)

-তুই ওকে চিনতিস নাকি? (আশা)

-অনেক আগে থেকে (আয়রা)

-কীভাবে? (আশা)

-সে অনেক কথা। পরে বলবো। এখন বল, আমার কি হবে? বিয়েটার সব আনন্দই নষ্ট হয়ে গেল ওই উজবুকটাকে দেখে। বাইরেও যেতে পারছিনা। গেলেই ওটার মুখ দেখতে হবে (আয়রা)

-কেন, তুই নাকি আমার দেবরকে পটাবি, তার সাথে ডান্স করবি। এখন কি হল? (আশা)

-ডান্স মাই ফুট,,,,,,ওর মুখটা দেখতেও আমি ইচ্ছুক নই। (আয়রা)


এরপর নিচ থেকে আশার ডাক পড়ে। সে নিচে যায় এবং একে একে বিয়ে সব রীতিনীতি পালনের মধ্য দিয়ে রিক্ত ও আশার শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়।

সব ঠিকঠাক থাকলেও আহান ও আয়রার মধ্যে কিছু ঠিক নেই। বিয়ের পুরো সময়টা তারা প্রায় ঝগড়া করেই কাটিয়েছে।


-তুমি কি জানো, তোমাকে ভারী মেকআপে পেত্নীর থেকেও বাজে লাগছে। (আহান)


আয়রার মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল।

-হ্যাঁ, লাগছে। তোমার কোন সমস্যা? (আয়রা)

-ছেলেদেরকে দেখানোর জন্য সেজেছো বুঝি? ও,,, সরি, সরি, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, দেখানোর জন্য তো ইয়াস আছেই। ওকে দেখানোর জন্যই তো এত সেজেছো তুমি। (আহান)

-হ্যাঁ, ওকে দেখানোর জন্য সেজেছি। তুমিও তো সেজেছো মিশিতাকে দেখানোর জন্য। তার বেলা?(আয়রা)

-তুমি যদি ইয়াসের জন্য সাজতে পারো, তাহলে আমিও মিশিতাকে দেখানোর জন্য সাজতে পারি। (আহান)

-খুব ভালো। এবার দয়া করে চুপ কর। (আয়রা)

-😏 (আহান)

এখন বাজে রাত আটটা। বিয়েটা মিটে গেলে এবার খাওয়াদাওয়া শেষ হয়। সেখানেও দুজনের ঝগড়া থেমে থাকেনি। এখন ছোটরা একটু নাচগান করবে। তারপর কনেবিদায়ের মাধ্যমে বিয়ের সমাপ্তি।

আয়রার নাচ করার একটুও ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু তার বোনের অনেক জোরাজুরিতে সে নাচ করতে রাজি হয়। তারা সবাই "Bol Churiya"গানে ডান্স করছিলো। ডান্সটা ভালোই হচ্ছিলো, কিন্তু নাচের মধ্যেই আয়রার একটি বোন আহানকে ডান্স ফ্লোরে নিয়ে আসে। তাই আহানসহ কিছু ছেলেও আয়রাদের তালে তালে নাচতে থাকে। আহান বারবার আয়রার কাছে যাচ্ছিল। এতে আয়রার ভালো লাগলেও সে মুখে প্রকাশ করে না।


যাইহোক, নাচগান শেষে এবার আসে সেই হৃদয় বিধায়ক মুহূর্ত-কনেবিদায়। এর মাধ্যমে একটি মেয়ে তার পুরোনো জগতকে ছিন্ন করে নতুন এক জগতে পা বাড়ায়। যা তার আগের জগত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোট থেকে আদরে বড় হওয়া মেয়েটা চলে যায় অজানা এক ঠিকানায়, অজানা মানুষের কাছে। আর নিজের বাড়িতে সে হয়ে যায় অতিথি।

অনেক কান্নাকাটির পর আশা এবং রিক্ত গাড়িতে গিয়ে বসে। আহান আগে থেকেই গাড়িতে বসে ছিলো। সে জেদ ধরেছে সে আজ গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি যাবে। সে ড্রাইভিং করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এমন সময় আয়রা হঠাৎ গাড়ির ভিতর দরজা খুলে আহানের পাশের সিটে বসে। আহান হতভম্ব হয়ে যায়। আর আশা ও রিক্ত পেছনের সিটে বসে পড়ে।


-এই মেয়ে, তুমি আমার গাড়িতে কেন উঠেছো? আর উঠোছো তো উঠেছো, আমার পাশের সিটে কেন বসছো? (আহান)


-আপনি কি ভুলে গেছেন বিয়ের দিন কনের সাথে কনের বোন তার শশুরবাড়ি যায়। আর সেদিন থেকে তারপরের দিন বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর নিজের family র সাথে ফিরে আসে। তাই আমাকে যেতে হচ্ছে। নাহলে আপনার বাড়িতে আমি মরে গেলেও পা রাখতাম না। (আয়রা)

-আচ্ছা, সেটা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু এই তিনটে গাড়ির এত সিট থাকতে তোমার আমার পাশে বসার কারণটা জানতে পারি? (আহান)

-গিয়ে দেখুন তো, আর কোনো গাড়ির একটা সিটও ফাঁকা আছে কি না। (আয়রা)


আহান চুপ হয়ে যায়। সে গাড়ি চলতে শুরু করে। চোখের নিমেষে তিন তিনটে গাড়ি ধুলো উড়িয়ে আয়রাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।


গাড়ি আপন গতিতে চলছে। আহান ড্রাইভ করার সাথে সাথে আড়চোখে মাঝে মাঝে আয়রাকে দেখছে। আয়রার অবাধ্য চুলগুলো হাওয়ায় বারবার তার মুখের সাথে বাড়ি খাচ্ছে। যার জন্য তাকে আরও মোহময়ী লাগছে। আহান মনে মনে বলল-

-এই মেয়ে আজকেও এর রূপ দিয়ে আমাকে ঘায়েল করছে। আবার দুর্বল হয়ে যাচ্ছি আমি ওর প্রতি। আমার কি ওর সাথে সব মিটমাট করে নেওয়া উচিত? এটা তো সত্যি যে আমার জন্যই আজ আমরা আর একসাথে নেই। আর আমি যে ওর সাথে ব্রেকআপের পর খুব একটা ভালো আছি তাও তো নয়।

আহান ডুব দিলো অতীতের পাতায়-


আহান ও আয়রা একটি ক্যাফেতে বসে আছে।

-এই দেখো তো আমাকে কেমন লাগছে? (আয়রা)

-মোটামুটি। (আহান)

-মোটামুটি, মোটামুটি মানে কি হ্যাঁ? আমাকে তোমার মোটামুটি লাগে। এখন যদি অন্য কোন মেয়ে তোমার সামনে আসে তখন তো মুখ দিয়ে এমনি বের হয়ে যাবে - Wow!!! (আয়রা)

-তো তোমাকে মোটামুটি লাগছে তো মোটামুটি বলবো না? আর অন্য মেয়ে যদি সুন্দর করে সেজে আমার সামনে আসে তাহলে তো Wow বলবোই। (আহান)

-তোমার কথাবার্তার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে আমাকে আর তুমি পছন্দ করো না। প্রথম প্রথম যখন ক্যাবলার মতন পেছনে পড়ে থাকতে,তখন তো খুব ভালো লাগতো আমাকে। আর এখন, আমি পুরনো হয়ে গেছি, তাই না? এখন নতুন কাউকে খুঁজতে হবে তোমার। (আয়রা)

-এই তুমি এত বেশি কথা বলো কেনো বলতো?আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কি ছিলো জানো? তোমার সাথে রিলেশনে যাওয়া। (আহান)

-হ্যাঁ, তো শেষ করে দাও না সব। করো ব্রেকআপ (আয়রা)

-ঠিকাছে ব্রেকআপ। (আহান)

-আমি ব্রেকআপ বললাম আর তুমি ব্রেকআপ করে দিলে। লাগবে না আমার তোমার মতন বয়ফ্রেন্ড। ব্রেকআপ (আয়রা)


__________________________


গাড়ি আহানদের বাড়িতে পৌঁছালে সবাই গাড়ি থেকে নামে এবং বাড়ির ভেতরে যায়। সেদিন রাতে সবাই অনেক ক্লান্ত ছিল। তাই বাড়ি পৌঁছানোর সাথে সাথে যে যার ঘরে ঢুকে যায়। আয়রার জন্য একটি আলাদা ঘর দেওয়া হয়।

পরদিন সকালে আয়রার একটু আগেভাগে ঘুম ভেঙে যায়। রুম থেকে বেরিয়ে এসে তার চোখে পড়ে তার বিপরীতপার্শী আহানের রুম। তার মাথার দুষ্ট পোকাগুলো একটু নড়ে ওঠে। সে আহনের রুমের দরজায় দুবার ঠকঠক করে। আহান ঘুম জড়ানো গলায় বলে -

-কে? (আহান)

আয়রা কোন জবাব দেয় না। উল্টে আবার গেট নক করে। আহান বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলতে যায়। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে আয়রা দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে পড়ে। আহান কাউকে না দেখতে পেয়ে বিরক্ত হয়ে দরজা লাগিয়ে আবার ঘুমাতে যায়। দু মিনিট পর আবার একই কান্ড। সে এবারও দরজা খুলে দেখে কেউ নেই। আহান এবার নিজে দরজাটি বাইরে থেকে লক করে একটি দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে পড়ে। আয়রা আবার দরজায় নক করতে আসলে আহান দরজা খুলে একটানে তাকে ঘরের মধ্যে এনে ফেলে।

-ও তাহলে তুমি। তাইতো বলি তুমি ছাড়া এ বাড়িতে এমন আর কে করবে (আহান)


আয়রা হতমতো খেয়ে যায়।

-সকাল সকাল এসব উটকো ঝামেলা না করলেই নয়? (আহান)

-করবো। আরও বেশি করে করবো। (আয়রা)

-এই তোমার লজ্জা করছে না? একে তো তুমি আমার কাছে ধরা পড়ে গেছো। আর তারওপর এখন বড় বড় কথা বলছো।কলেজ লাইফে তোমার জ্বালাতন সহ্য করেছি, আর এখন এখানে। সারা জীবন আমাকে জ্বালিয়েই গেলে তুমি। একটুও কি শান্তিতে থাকতে দেবে না আমায়? (আহান)



আহানের কথায় আয়না চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে।


-আচ্ছা অন্য সব কথা তো বাদই দিলাম, এটা না তোমার বোনের শ্বশুরবাড়ি, এখানে একটু ভদ্র ভাবে থাকতে পারছো না? (আহান)

-বোনেরই তো শশুরবাড়ি। নিজের তো আর নয়। অবশ্য হয়তো এটাই হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কেউ আমাকে আর শেষ পর্যন্ত চাইলো না। আর আপনাকে অনেক সরি। আমি আর কখনো আপনাকে ডিস্টার্ব করবো না। আসলে ভাবিনি তো, পর হতে হতে এমন এক পর্যায়ে চলে গেছি যে আমার দুষ্টুমিগুলোও এখন কারো কাছে বিষ লাগে, যার একসময় আমার এই বাচ্চামোগুলোকে ভালো লাগতো। পুরোনো জিনিস তো, ব্যবহার শেষ হলে তো ছুঁড়ে ফেলে দেয়াই হবে। প্রকৃতির নিয়ম। আমিই না বুঝে অনেক স্বপ্ন বুনে ফেলেছিলাম। (আয়রা এটা বলে চোখের কোণটা মুছে চলে গেলো)


আয়রার বলা শেষ কথাগুলো আহানের বুকে তীরের মতন গিয়ে বিধলো। আজ সে আয়রার কথায় বুঝলো আয়রা এখনও তাকে ভোলেনি। এতদিন তার মনে হতো সে হয়তো আয়রার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ভুল করেছে। কিন্তু আজ সেখান থেকে "হয়তো" শব্দটা পুরোপুরি উঠে গেলো। আয়রার কথার মাঝে আহান এতদিনের জমে থাকা আয়রার তার প্রতি ক্ষোভ ও অভিমান স্পষ্ট অনুভব করলো। সে নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজের ওপর ধিক্কার দিতে লাগলো।



____________________________


রিসেপশনের অনুষ্ঠান কিছুক্ষণ হলো শেষ হয়েছে। আয়রার এত মানুষের ভিড়ে ভালো লাগছিল না। এমনিই সকালে আহানের কাছ থেকে কথাগুলো শোনার পর তার মন ভালো নেই। তার শুধু এটা মনে হতে থাকে- "সত্যিই কি সে আহানকে জ্বালিয়ে গেছে? তাকে শাসন করে গেছে? আহান কি তার শাসনের মধ্যকার ভালোবাসার অস্তিত্ব টের পায়নি?"

আয়রা নিজের মনের দন্দ কাটাতে ছাদের কার্নিশে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর সে নিজের পাশে অন্য একজনের অস্তিত্ব টের পেল। আয়রা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো আহান তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।


-এখানে কি করছো? (আহান)

-কিছু না। এমনি দাঁড়িয়ে আছি (আয়রা)

-তোমরা চলে যাবে একটু পর? (আহান)

-হুম। ভালোই তো হবে। তোমাকে আর জ্বালাবে না কেউ। আসলে কি বলতো, Unfortunately we have met again. না হলে আবার আমার জ্বালাতন তোমাকে সহ্য করতে হতো না।  (আয়রা)

-একটা কথা বলব? আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করা যায় না? (আহান)

-আমি কখনোই সবকিছু শেষ করিনি। শেষ করতে চেয়েছো তুমি। খেয়াল করে দেখো, আমি অনেক চেষ্টা করেছি আমাদের সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার। কিন্তু তুমি চাওনি। তুমি নিজেই সব শেষ করেছ। তাহলে এখন কেন আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার কথা বলছ? (আয়রা)

-আমি মানছি আমার ভুল ছিল। কিন্তু তার জন্য আমি এখন অনুতপ্ত। I'm sorry. আমি তোমার শূন্যতা অনুভব করেছি। যা করেছি আমি সব রাগের মাথায় করেছি। আর তাছাড়াও তোমার জন্য আমার মনের অনূভুতিটা এ কদিনে একটুও মুছে যায়নি। আমি জানি তুমিও এখনো আমাকে ভালোবাসো। প্লিজ ফিরে এসো আয়রা। (আহান)

-আগে কথা দাও আমায় আর কখনও ছেড়ে যাবে না। তাহলে একবার ভেবে দেখতে পারি। (আয়রা)

-কথা দিলাম আর কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না। একটা বার, শুধু একটা বার সুযোগ দাও আমায়। (আহান অনুনয়ের সুরে)

-ঠিকাছে দিলাম একটা সুযোগ। তবে আমায় কখনও আঘাত করো না। প্রথম আঘাত পাওয়ার পর দ্বিতীয় আঘাত আর সহ্য করতে পারবো না। আমার হয়ে থেকো সবসময়। (আয়রা)

-(আয়রার ডানহাত নিজের মুঠোয় নিয়ে) শুধু আমি তোমার হয়ে নয়, আমরা একে অপরের হয়ে থাকবো। মানুষ ভুল একবারই করে। এরপর আর এমন করবো না৷ (আহান)


সমাপ্ত

©
ভুল ত্রুটি মার্জনীয়।
169 Views
5 Likes
3 Comments
5.0 Rating
Rate this: