শরৎকাল। গ্রামের নাম মোহনপুর, কলকাতা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। গ্রামটি বেশ নির্জন, চারপাশে গাছপালা আর ফাঁকা মাঠে ঘেরা। মাঝে মাঝে দূরে কিছুটা কুয়াশা জমে থাকে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। গ্রামের ঠিক বাইরে একটি পুরনো, অর্ধেক ভেঙে পড়া বাড়ি আছে। গ্রামবাসীরা বলে, সেই বাড়ির পাশেই একটি ঝিল আছে—"ঝিলের ধারে" নামে পরিচিত। ঝিলটি কুয়াশা আর গাছপালায় ঢেকে থাকে, আর স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করে, ঝিলের ধারে কোনো এক অভিশপ্ত আত্মা বাস করে।
মূল ঘটনা শুরু হয় সেদিন, যেদিন গ্রামের ছেলে রাজু হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায়। রাজু সাহসী ছেলে ছিল। সে প্রায়ই ঝিলের পাশে গিয়ে মাছ ধরত। সবাই জানত, ওখানে কেউ যায় না। একদিন রাজু মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে এল না। প্রথমে কেউ চিন্তা করেনি, কিন্তু যখন এক সপ্তাহ কেটে গেল এবং কোনো খোঁজ মেলেনি, তখন গ্রামে শোরগোল শুরু হলো।
রাজুর বন্ধুদের মধ্যে মিঠুন সবচেয়ে সাহসী ছিল। সে রাজুর নিখোঁজ হওয়াটা মেনে নিতে পারছিল না। মিঠুন ঠিক করল, সে খুঁজে বের করবে রাজু কোথায় গেল। গ্রামের বয়স্করা বারবার সতর্ক করলেও, মিঠুনের কানে তা গেল না। সে রাজুর খোঁজে ঝিলের ধারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
এক সন্ধ্যায় মিঠুন তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, কিন্তু কেউ ঝিলের ধারে যেতে রাজি হলো না। সবাই বলল, "ওখানে যেও না মিঠুন, অনেকেই ওখানে গিয়েছে, ফিরে আসেনি।" কিন্তু মিঠুন একরোখা। সে বলল, "আমি যাবই। কিছু না কিছু তো বের হবে।"
রাত গভীর হলে, মিঠুন একাই বেরিয়ে পড়ল। ঝিলের দিকে যেতে যেতে সে অনুভব করল, চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। পাখিদের ডাকও থেমে গেছে। গা ছমছম করা অনুভূতি হচ্ছে, তবুও সে এগিয়ে যাচ্ছে। ঝিলের কাছে পৌঁছে, সে দেখতে পেল ঝিলের জল কেমন যেন অস্বাভাবিকভাবে স্থির। ঝিলের পাশের বড় বটগাছটি কালো ছায়া ফেলে রেখেছে। হঠাৎ, মিঠুন শুনল, কারো পায়ের শব্দ। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কোনো পশু। কিন্তু শব্দটা যেন ঠিক তার পেছনেই আসছে।
মিঠুন পেছনে ফিরে তাকাল, কিন্তু কিছু দেখল না। একটু এগিয়ে যেতেই সে দেখতে পেল এক বৃদ্ধা ঝিলের ধারে বসে আছে, তার পায়ে চেইন বাঁধা। বৃদ্ধার মুখটা খুবই ক্ষীণ, আর চোখ দুটি যেন অন্ধকারে জ্বলছে। মিঠুন ভয় পেয়ে গেল, কিন্তু সে ভাবল, এই বৃদ্ধা তো গ্রামে কখনও দেখেনি।
বৃদ্ধা হঠাৎ বলল, "কী খুঁজছিস, ছেলে?"
মিঠুনের গলা শুকিয়ে গেল, কিন্তু সাহস করে বলল, "আমার বন্ধু রাজু হারিয়ে গেছে। তাকে খুঁজছি।"
বৃদ্ধা ধীরে ধীরে হেসে বলল, "তোর বন্ধু তো এখানেই আছে। ও তো আর ফিরবে না। এখানে যারা আসে, তারা আর ফিরে যায় না।"
মিঠুনের মাথার ভেতর শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বলল, "তুমি কী বলছ? রাজু কোথায়?"
বৃদ্ধা বলল, "ঝিলের জলে তাকিয়ে দেখ।"
মিঠুন ধীরে ধীরে ঝিলের দিকে তাকাল। প্রথমে কিছু দেখতে পেল না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই জলের নিচে রাজুর মুখ ভেসে উঠল, যেন সে ডুবে গেছে। মিঠুন ভয় পেয়ে চিৎকার করতে লাগল। সে পিছু হটতে লাগল, কিন্তু তার পা যেন মাটি থেকে উঠছিল না।
এমন সময় ঝিলের জল থেকে একটা শীর্ণ হাত বেরিয়ে এলো। হাতটা মিঠুনের দিকে বাড়িয়ে দিল। মিঠুন হতভম্ব হয়ে গেল। সেই বৃদ্ধা আবার বলল, "তোর বন্ধু তোকে ডাকছে। ওর কাছে যা, নয়তো তুইও অভিশপ্ত হয়ে যাবি।"
মিঠুন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকজন মিঠুনকে ঝিলের পাশ থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করল। মিঠুন জেগে উঠে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "রাজু… রাজু ওখানে…"
কেউই মিঠুনের কথা বিশ্বাস করতে চাইল না। তারা বলল, হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু মিঠুন জানে, সে যা দেখেছে তা সত্যি। ঝিলের ধারে যে অদৃশ্য শক্তি কাজ করে, তা অস্বীকার করা যায় না।
এরপর থেকে কেউ ঝিলের ধারে যেতে সাহস করল না। মিঠুন প্রায়ই রাতে চিৎকার করে জেগে ওঠে, রাজুর নাম ধরে। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করে, ঝিলের জল যেন নিজেই আত্মা টেনে নেয়।
বলা হয়ে থাকে, ঝিলের সেই বৃদ্ধা আসলে এক অভিশপ্ত আত্মা, যে মৃত্যুর পরও শান্তি পায়নি। যারা তার সান্নিধ্যে আসে, তারা আর ফিরে যায় না। মিঠুনের কথা সবাইকে আরও একবার সতর্ক করল—ঝিলের ধারে কেউ যেও না।
গল্পের শেষে, মিঠুন আর কখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হলো না। সে একপ্রকার পাগলের মতো হয়ে গেল, গ্রামে আর কোনোদিন হাসির শব্দ শোনা গেল না।
ঝিলের ধারে আড়ালের সেই মানুষ আজও অপেক্ষায় আছে নতুন কোনো আত্মার জন্য, যে তার ফাঁদে পা দেবে...
ঝিলের ধারে আড়ালের মানুষ
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
154
Views
4
Likes
2
Comments
4.7
Rating