অভিশপ্ত লাল বাড়ি

রাতের গভীরতা যখন সবচেয়ে বেশি, আকাশে পূর্ণিমার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে, গ্রামের শেষ প্রান্তের পুরনো বটগাছের নিচে বসে গল্প বলছিলেন বয়স্ক হারাধন কাকা। তাঁর গল্প শুনতে গ্রামের ছেলেমেয়েরা ভয়ে ভয়ে একজোট হয়েছিল। কাকাবাবুর ভয়ঙ্কর গল্পের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল "রক্তরাঙা বাড়ি"।

অনেক বছর আগের কথা, গ্রামের উত্তরপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাল রঙের বিশাল জমিদারবাড়িটা এখনো শূন্য পড়ে আছে। মানুষ বলে, সেই বাড়িটা অভিশপ্ত। কেউ সে বাড়ির দিকে চোখ তুলেও তাকায় না। একসময় জমিদার ব্রজেশ্বর রায় সেখানে থাকতেন। তাঁর রক্তচক্ষু আর অত্যাচারে গ্রামের মানুষ অস্থির হয়ে পড়েছিল। জমিদারের অত্যাচারের শেষ হলো এক ভয়াবহ রাতে, যখন গ্রামের লোকেরা বিদ্রোহ করে জমিদারবাড়িতে ঢুকে তাঁকে হত্যা করে। সেদিন থেকে, লাল বাড়িটা ধীরে ধীরে এক রহস্যময় স্থানে পরিণত হতে থাকে।

বাড়ির দরজাগুলো সারারাত খোলা থাকে, কিন্তু কেউ কোনোদিনও দেখে নি যে সেখানে কেউ ঢুকেছে বা বেরিয়েছে। মাঝে মাঝে, পূর্ণিমার রাতে বাড়িটার ভেতর থেকে এক অদ্ভুত আলোর ঝিলিক দেখা যায়, কিন্তু যতবারই কেউ সেখানে যেতে চেয়েছে, ভয়ে পা পিছলে যায়। লোকজন বলে, বাড়ির ভেতর এখনো জমিদার ব্রজেশ্বরের আত্মা ঘোরাফেরা করে। মাঝে মাঝে শোনা যায় তাঁর তীক্ষ্ণ হাসির আওয়াজ, আর গভীর রাতে সেখান থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। কেউ সাহস করে সেখানে ঢুকতে চায় না, কারণ যে-ই সেখানে গেছে, সে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি।

একবার গ্রামের এক যুবক, নাম মনোজ, বন্ধুদের চ্যালেঞ্জে সেই লাল বাড়িতে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল। সে হাসতে হাসতে বলল, "ভুত-প্রেত কিছুই নেই, সব মানুষকে ভয় দেখানোর গল্প। আজ আমি প্রমাণ করে দেব!" তার বন্ধুরা ভয়ে ভয়ে তার পিছু নিল। মনোজ যখন বাড়ির ভেতর ঢুকল, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটায় আটকালো। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল।

ভেতরে ঢুকেই মনোজ বুঝতে পারল কিছু একটা অস্বাভাবিক। বাতাসে একটা থমথমে অনুভূতি, যেন কেউ তার দিকে নজর রাখছে। বন্ধুরা বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু কয়েক মিনিট পর ভেতর থেকে ভেসে এল একটা বিকট চিৎকার। সবাই ছুটে পালিয়ে গেল, কিন্তু মনোজ আর ফিরে এল না।

এরপর থেকে, লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ল যে, মনোজের আত্মাও এখন সেই বাড়ির অভিশপ্ত আত্মাদের দলে শামিল হয়েছে। কেউ কেউ বলে, পূর্ণিমার রাতে বাড়ির ভেতর থেকে মনোজের ভয়ার্ত মুখ দেখা যায়, আর তাঁর কণ্ঠে সেই চিৎকার এখনো শোনা যায়—যেন সে মুক্তি চায়, কিন্তু পায় না।

বটগাছের নিচে বসে হারাধন কাকার কথা শুনে সবার গা শিরশির করে উঠল। একেকজন একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। গ্রামের সেই লাল বাড়ির গল্প যেন কখনো পুরোনো হয় না। কে জানে, আজো সেখানে কেউ আছে কি না—একটু সাহস করলে হয়তো দেখা মিলবে সেই অভিশপ্ত জমিদারবাড়ির রহস্যের। কিন্তু সেই সাহস করবে কে?

লাইক করুন কমেন্ট করুন ফাইভ স্টার রেটিং দিন ফলো দিয়ে পাসে থাকুন
19 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই