নন্দিনী ও রাজুর সম্পর্ক শুরু হয়েছিল প্রেমের মাধ্যমে। কলেজে পড়াকালীন তারা একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। রাজু ছিল স্মার্ট, দারুণ কথা বলার ক্ষমতা ছিল তার। নন্দিনী ভাবত, সে তার জীবনের সেরা সঙ্গী পেয়েছে। কিন্তু বিয়ের পর যখন তারা একসাথে বসবাস শুরু করল, তখন নন্দিনীর চোখের সামনে নতুন একটি বাস্তবতা ফুটে উঠল।
বিয়ের প্রথম বছরেই রাজুর আচরণ পরিবর্তন হতে শুরু করল। সে ধীরে ধীরে উগ্র হয়ে উঠল। কাজের চাপ, অর্থনৈতিক সংকট—এইসব কারণে তার রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো। নন্দিনী প্রথম দিকে এসব সহ্য করে চলে, কিন্তু যখন রাজুর অত্যাচার সীমানা ছাড়িয়ে গেল, তখন সে বুঝতে পারল, এই সম্পর্ক আর টেকসই নয়।
একদিন রাতে, কাজ থেকে ফিরে রাজু নন্দিনীকে অকারণে গালাগাল করতে শুরু করে। “কিছুই ঠিকমতো করো না! খারাপ রান্না করেছ!” নন্দিনীর মনে হলো, সে যেন একজন দাসী। সে শান্তভাবে বলল, “রাজু, আমি চেষ্টা করছি। তোমার কথা শুনলে আমি উন্নতি করব।”
রাজু সেদিনের মতো শুইয়ে পড়ল, কিন্তু নন্দিনী তার আচরণের কারণে হতাশ হয়ে পড়ল। দিন যাত্রা করে গিয়েছিল, কিন্তু রাজুর অত্যাচার বাড়তেই থাকল। সে শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবে নন্দিনীকে ভেঙে দিচ্ছিল। একপর্যায়ে, রাজু নন্দিনীকে মারধরও শুরু করল। নন্দিনী বুঝতে পারল, তাকে আর চুপ করে থাকা উচিৎ নয়।
এক রাতে, যখন রাজু নেশা করে বাড়ি ফিরল, তখন সে নন্দিনীকে মারতে উদ্যত হলো। নন্দিনী ঘর থেকে বের হয়ে পাশের প্রতিবেশীর কাছে গেল। প্রতিবেশীরা রাজুকে সমর্থন করত না, কিন্তু তারা কিছু করতে পারছিল না। নন্দিনী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এবার সে রাজুকে শিক্ষা দেবে।
পরের দিন, নন্দিনী তার বোনের কাছে গিয়ে সবকিছু খুলে বলল। তার বোন তাকে সমর্থন দিল এবং বলল, “তুমি কেন তার সাথে থাকছ? তুমি নিজের জন্য কিছু করতে পারো।”
নন্দিনী সিদ্ধান্ত নিল, সে একা কিছু করতে হবে। সে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করল। প্রথমে পুলিশ রাজুকে ডাকল, কিন্তু রাজু তার উপর অমানুষিক অত্যাচারের জন্য কোন দোষ স্বীকার করল না। নন্দিনী তখন একজন আইনজীবীর সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।
নন্দিনীর আইনজীবী তাকে বললেন, “তুমি যদি সত্যিই এ সম্পর্ক থেকে বের হতে চাও, তবে তোমার প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। তুমি তোমার আহত শরীরের ছবি তুলে রাখো এবং দরকার হলে সাক্ষী হিসেবে প্রতিবেশীদের কাছে সাক্ষ্য নাও।”
নন্দিনী এসব কথা শুনে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হল। সে দিনরাত কাজ করে গেল, প্রতিটি মুহূর্তে রাজুর অত্যাচারের কষ্ট সহ্য করে। সে নিজের ক্ষতগুলোর ছবি তুলল, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে শুরু করল।
এক মাস পরে, নন্দিনী আদালতে মামলার জন্য উপস্থিত হলো। রাজুর আইনজীবী প্রথমে নন্দিনীর উপর চাপ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু নন্দিনীর কাছে সব প্রমাণ ছিল। সে সাহস করে তার বক্তব্য উপস্থাপন করল। আদালত শুনতে পাচ্ছিল রাজুর অত্যাচারের কাহিনী।
সর্বশেষে, আদালত রাজুকে কঠোর সাজা দিল। নন্দিনী অনুভব করল, সে এখন আর সেই ভীত শঙ্কিত মেয়ে নয়। সে একজন শক্তিশালী নারী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আদালত রাজুকে এক বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি নন্দিনীর ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের আদেশ দিল।
রাজু বুঝতে পারল, তার অত্যাচারের ফলস্বরূপ তাকে দণ্ডিত হতে হয়েছে। সে যে জীবনকে নন্দিনীর জন্য নিঃশেষ করে দিয়েছিল, সেই জীবন এখন তারই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। রাজু এখন শুধু আফসোস করতে পারছিল।
নন্দিনী জানত, এই জয় কেবল তার নয়, বরং সকল নারীর যারা অত্যাচারের শিকার হয়ে থাকে তাদের জন্য একটি উদাহরণ। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ভবিষ্যতে সে নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে। সে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে যুক্ত হলো, যারা নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছিল।
এদিকে, রাজুর সাজার পর নন্দিনী তার পুরনো জীবন থেকে দূরে সরে গিয়ে নতুন করে শুরু করল। সে একটি নতুন চাকরি পেল, নতুন বন্ধু বানাল। মাঝে মাঝে সে ভাবত, রাজু কি তার উপর কি কঠিন অত্যাচার চালিয়েছিল, কিন্তু সে জানত, সে এখন মুক্ত।
কিছুদিন পর, রাজু ছাড়া বাকি সবকিছু তার জীবনে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। কিন্তু তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সে শিখেছিল, ভালোবাসার নামে অত্যাচার মেনে নেওয়া উচিত নয়। নন্দিনী আজ একজন শক্তিশালী নারীর প্রতীক।
একদিন, নন্দিনী স্থানীয় এক নারীদের সম্মেলনে বক্তা হিসেবে দাঁড়াল। সে তার জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করল এবং সকলকে বলল, “আমরা যদি একত্রিত হই এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই, তবে আমরা কখনো অত্যাচারের শিকার হবো না। প্রতিটি নারীর উচিত তার নিজের স্বর উঠানো।”
সম্মেলনে উপস্থিত নারীরা তার কথায় অনুপ্রাণিত হলো। তারা একে অপরের হাতে হাত রেখে বলল, “আমরা আর কখনো নিঃশব্দ হব না। আমাদের কষ্টের গল্পগুলো বলবো এবং একে অপরকে সাহায্য করবো।”
নন্দিনী অনুভব করল, সে শুধু নিজের জীবনই পরিবর্তন করেনি, বরং বহু নারীর জীবনে এক নতুন আলো এনে দিয়েছে। এই নতুন পথচলা শুরু হয়েছিল রাজুর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে। এবং সে জানতো, এই লড়াই কখনো শেষ হবে না, বরং এটি কেবল শুরু।
নন্দিনী তার নতুন জীবনে এগিয়ে চলতে থাকল, আশা নিয়ে। সে জানতো, সাহস ও শক্তি দিয়ে সে সব কিছু জয় করতে পারে। একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল—এটি ছিল আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার অধ্যায়।
কঠিন সাজা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
132
Views
5
Likes
1
Comments
4.6
Rating