কুরআন নিয়ে কিছু কথা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
দুনিয়াতে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি ধর্ম মজুদ আছে। এই আড়াই হাজার ধর্মের মাঝে নিজেদের ঐশী কিতাব হাজির করতে পারে খুব অল্প সংখ্যক ধর্ম। আবার, এই অল্প সংখ্যক ধর্মের মধ্যে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার ঐশী কিতাব নাজিল হয়েছে ‘ইকরা’ তথা ‘পড়ো’ শব্দ দিয়ে।

পড়াশুনার সাথে ইসলামের রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনকে এমন এক জাতির কাছে পাঠিয়েছেন যাদের ছিল জ্ঞানকে ধারণের বিস্ময়কর ক্ষমতা। শুধু তা-ই নয়, ভাষাবিজ্ঞানের যাবতীয় কলা ছিল রীতিমতো এদের নখদপর্ণে। এরা হাঁটতে বসতে কবিতা বলতো। কারণে অকারণে কবিতা বানাতো। দুঃখ সুখে কবিতা লিখতো। যুদ্ধ-বিগ্রহে কবিতা রচনা করতো।

আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ’শ বছর আগে একটা জাতির মানুষ কুরআনের মতো এক সুবিশাল কিতাব ঠোঁটস্থ করে রেখেছে, রাসূলের মুখ নিঃসৃত লক্ষ লক্ষ হাদিসকে সনদসহ (কে বর্ণনা করেছে, কে কার কাছে জেনেছে/শুনেছে) বুকে গেঁথে রেখে সারা দুনিয়াময় ছড়িয়ে দিয়েছে—জ্ঞানের সাথে কীরকম অকল্পনীয় সম্পর্ক থাকলে এটা সম্ভব ভাবুন তো।

জ্ঞানের সাথে মুসলমানদের মিতালির এই সিলসিলা সারাটা জীবন চলমান ছিল। আজকের দিনে এই যে আমরা ইসলামি জ্ঞানের এতো শাখা-প্রশাখার সন্ধান জানি, এসব তো আসমান থেকে নাযিল হয়নি। আসমান থেকে শুধু কুরআনটাই নাযিল হওয়া। কুরআনকে সামনে রেখে ইসলামি জ্ঞানের বাদবাকি সমস্ত শাখা মানুষের হাত ধরে তৈরি।

ইসলামে জ্ঞানের কদর আছে বলেই আমরা ইমাম বোখারি রাহিমাহুল্লাহকে চিনি। চারটি প্রধান মাযহাবের ইমামদের যাবতীয় কাজ তো জ্ঞানকে কেন্দ্র করেই। ইমাম ইবন জারীর আত তাবারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম নববী, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী সহ অসংখ্য জ্ঞান-পিপাসু মানুষের কাজ আর পরিশ্রমের বদৌলতে ইসলামে জ্ঞানের শাখা আজ বিকশিত এবং সুশোভিত।

কিন্তু, এই সমস্ত মানুষগুলো কি নিছক কাকতালীয়ভাবে তৈরি হওয়া? তাদের পেছনে তাদের পরিবার, তাদের বাবা-মায়েরা কি পরিশ্রম করেনি? একজন ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ কি হাওয়া থেকে তৈরি হয়? একজন ইমাম বোখারি কি স্রেফ নিজের গুণেই বিকশিত?

প্রতিটা সভ্যতা নির্মাণের নিউক্লিয়াস হলো—পরিবার। একটা শিশুকে তুলনা করা যায় ময়দার খামিরের সাথে। ময়দার খামির দিয়ে যেমন রুটি বানানো যায়, লুচি বানানো যায়, যেকোনো রকমের পিঠাও বানানো যায়, একটা শিশুকেও গড়ে নেওয়া যায় পরিকল্পনা মতো। তাকে যা শেখানো হয় সে তাই শেখে। তাকে যা দেখানো হয় সে তাই দেখে। তাকে যা বোঝানো হয় সে তাই বোঝে।

আমরা হয়তো আমাদের সন্তানকে ইমাম তাইমিয়্যাহ আর ইমাম বোখারী বানাতে পারবো না। কিন্তু তাকে একজন ভালো মুসলিম হিশেবে বড় করা, তাকে দ্বীনের পথে মানুষ করা, তাকে তাকওয়াবান, ইনসাফকারী এবং সর্বোপরি আল্লাহর দ্বীনের ওপর মানুষ করা তো প্রত্যেক বাবা-মা’র ফরয দায়িত্ব।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই স্বর্ণযুগে আজ আমরা সেই দায়িত্ব পালনে কতোখানি মনোযোগি, তা কি নিজেদের একবার আমরা জিগ্যেস করবো? বাবার সামনে কম্পিউটার, মায়ের হাতে স্মার্টফোন, ছেলে মেয়েদেরদের হাতে ট্যাব। সবাই নিজ নিজ সোশ্যাল দুনিয়ায় বিভোর—এটা কি প্রতিটা মুসলিম পরিবারের দৈনন্দিন দৃশ্য নয়?

যে মোবাইল দিয়ে আজ আমরা বাচ্চাকে শান্ত করাচ্ছি, তার কান্না থামাচ্ছি, সেই মোবাইল যে একদিন আমাদেরকে কান্না করাতে পারে—ভবিষ্যতের সেই দৃশ্যটা নিয়ে আমরা কি একটু ভাবতে পারি?

বাচ্চাকে মোবাইল না দিলে সে বড়জোর একঘণ্টা কান্না করবে। সে বড়জোর দুই ঘণ্টা না খেয়ে থাকবে, সে বড়জোর একদিন মনমরা থাকবে। কিন্তু সে মারা যাবে না। তবে, যদি তাকে আপনি ফোন দিয়ে অভ্যস্ত করান, একটা বয়সে গিয়ে ফোনের অভাবে সে সত্যি সত্যিই মারা যেতে পারে। আজ খেলনা হিশেবে যেটা তার হাতে আমরা তুলে দিচ্ছি, একদিন সেটা তার জীবনের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বস্তুতে পরিণত হতে পারে।
22 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: