প্রতারণা (শেষ পর্ব)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
শেষের এই কথাটা শুনতেই অশোকের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো-" আমার পালা মানে? আমিতো তোমাকে খুন করিনি নন্দিনী। যারা করেছে তাদের তো তুমি শাস্তি দিয়েই দিয়েছো। বরং আমিতো তোমাকে ভালোবাসি বলো!"

অশোকের মুখে ভালোবাসার কথা শুনতেই নন্দিনী এক উপহাসের হাসি হেসে বললো-" ভালোবাসা! সেটা তোমার মতো প্রতারকের মুখে মানায় না অশোক। তুমি কি ভেবেছিলে আমি সত্যিটা কখনোই জানতে পারবো না।

গতকাল রাতে তোমারই বন্ধু রথীন তার মৃত্যুর আগে আমাকে সমস্ত সত্যিটা বলে দিয়েছে। সে বলে দিয়েছে যে তুমিই সেদিন রথীনকে পাঠিয়েছিলে আমাকে সহ আমার বাচ্চাটিকে মেরে ফেলতে। যাতে আমি কখনো তোমার সামনে স্ত্রীর অধিকার নিয়ে দাঁড়াতেই না পারি। কি তাইতো, অশোক?

আচ্ছা অশোক আমার কি এটাই ভুল ছিল যে আমি তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছি নাকি তোমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করাটা আমার অপরাধ হয়েছে?

আমিতো কখনোই তোমাকে বিয়ের জন্য জোর করিনি । বরং তুমিই তো আমাকে বিয়ে করার মিথ্যা আশা দেখিয়েছিলে। তাহলে আমার দোষটা কোথায় বলতে পারো? আমি আর আমার বাচ্চা যদি তোমার কাছে এতোটাই বোঝা ছিলাম তাহলে আগে থেকেই বলে দিলে পারতে। আমি আমার সন্তানকে তার মায়ের পরিচয়েই বড় করতাম। তোমার দুয়ারে কখনো হাত পাততে যেতাম না। কিন্তু তাই বলে তুমি নিজেরই সন্তানকে খুন করার কথা ভাবতে পারলে কি করে? "

অশোক এবার হাত জোড় করে নন্দিনীর সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলো। অশোক বললো-" নন্দিনী,দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি যেটা করেছি সেটা ভুল করেছি। অন্তত এই ভুলটাকে শুধরে নেওয়ার একটা সুযোগ তো দাও। "

অয়ন্তি রাগের স্বরে বলে উঠলো-" ভুল! এটাকে ভুল বলে না অশোক। তুমি যেটা করেছো সেটা পাপ। আর পাপের শাস্তি তো তোমাকে ভোগ করতেই হবে। শুধু আমাকে খুন করলেও না হয় তোমাকে ক্ষমা করে দিতাম কিন্তু আমার বাচ্চার খুনীকে আমি একজন মা হয়ে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবো না। তাই শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে, অশোক। আর এর একমাত্র শাস্তি হচ্ছে মৃত্যু। তাই মরার জন্য প্রস্তুত হও।"

একথা বলতেই নন্দিনী এক বিভৎস নারী মূর্তি ধারণ করে অশোকের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। নন্দিনীর ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে অশোক প্রাণপণে ছুটতে লাগলো। সে বার বার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে আর দৌঁড়াচ্ছে। এমন সময় হঠাৎই অশোক হোঁচট গেয়ে পড়ে গেলো রেল লাইনের ওপর। সেই সাথে সাথে অশোকের পা টাও আটকে গেলো রেল লাইনের পাতের মাঝে।

অশোক পিছনে তাকিয়ে দেখলো নন্দিনী তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে। অশোক অনেক কাকুতি মিনতি করতে লাগলো নন্দিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু নন্দিনী কেবলই এক দৃষ্টিতে অশোকের দিকে তাকিয়ে।

এমন সময় হঠাৎ করেই হুইসেল বাজাতে বাজাতে ট্রেন এসে পড়লো। কিন্তু তখনও অশোকের পা সেই রেল লাইনের পাতের মাঝেই আটকা পড়ে রইলো। অশোক সেই রেল লাইন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বহু বৃথা চেষ্টা করতে লাগলো। এদিকে ট্রেনও ক্রমশই এগিয়ে আসছে অশোকের দিকে। অশোক কি করবে বুঝতে না পেরে হাত নেড়ে ইশারা করতে থাকে ট্রেন চালককে- ট্রেনটা থামানোর জন্য।

কিন্তু আফসোস ট্রেন ততক্ষণে অশোকের অনেকটাই কাছে এসে গিয়েছে। ট্রেন চালক চাইলেও তার আর কিছুই করার ছিল না। তাই অবশেষে সেটাই হলো যা কিনা অশোকের ভবিতব্যে লেখা ছিল। চলন্ত ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে গেলো অশোক। মুহুর্তেই একটা আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে উঠলো স্টেশনের পরিবেশ। এরপর মুহুর্তেই মিলিয়ে গেলো সেই শব্দ।


এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে অশোকের ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এটাকে একটা ট্রেন দুর্ঘটনার কেস বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। আর সেই সাথে সাথেই এই মৃত্যুর তাণ্ডবলীলার রহস্যটাও চিরটাকাল রহস্যই থেকে যায়।

যদিও এই মৃত্যুর রহস্য একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর দুজন মাত্রই জানতো - অশোক আর নন্দিনী। কিন্তু সেই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করার মতো তাদের দুজনের কেউই আজ আর বেঁচে নেই।

-------------------------------০-------------------------------
859 Views
5 Likes
2 Comments
5.0 Rating
Rate this: