হঠাৎ একদিন মাঝ রাতে আমার ঘরে দুজন লোক ঢুকলো। তারা ঢোকা মাত্রই আমার মুখে রুমাল দিয়ে আমাকে অজ্ঞান করে একটা অন্ধকার কুটিরে বন্দি করে রাখলো।
জ্ঞান ফেরার পর আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায় আছি। তাও অনুমান করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ব্যর্থ হলাম। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঐ অন্ধকার কুটিরে বন্দি থাকার পর দেখলাম কুটিরের দরজা খুলে কেউ একজন আমার সামনে দাঁড়িয়ে ।
আর সেই কেউ একজন হলো স্বয়ং তোমার কাকা অশোকেশ্বর রায়। সে কুটিরে এসেই আমাকে কষে একটা থাপ্পর মাড়ার পর আমাকে বলতে লাগলো আমি যেন এই বাচ্চাটিকে নষ্ট করে দেই। নয়তো সে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলবে।
কিন্তু শত অত্যাচার করার পরেও আমি যখন বাচ্চাটিকে নষ্ট করতে অস্বীকার করি তখন তোমার কাকা আমাকে ঐ কুটিরেই আবার বন্দি রেখে চলে যায়।
অনাহারে অনিদ্রায় দুটো দিন পার করি। এরপর হঠাৎই একদিন মাঝ রাতে কুটিরের পাশ দিয়ে কারো আওয়াজ পেতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কুটিরের পিছনের একটা জানালার রড ভেঙে কেউ একজন কুটিরে প্রবেশ করতেই আমি ভয় পেয়ে যাই।
পরোক্ষণেই তাকিয়ে দেখি সেই ব্যক্তি আর কেউ নয় তোমারই খুব কাছের বন্ধু রথিন। রথিন সেদিন আমাকে দেখে বললো-" বৌদি আপনি চিন্তা করবেন না। অশোকই আমাকে পাঠিয়েছে আপনাকে এখান থেকে উদ্ধার করতে। আপনি চলুন আমার সাথে।
রথিনের মুখে এই কথা শোনার পর যেন আমি শত হতাশার মাঝেও আশার আলো খুঁজে পেলাম। আমি আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন না করেই রথিনের সাথে কুটির থেকে পালিয়ে গেলাম। কিন্তু তখন তো আর জানতাম না যে এটাই আমার সবথেকে বড় ভুল ছিল।
অন্ধকার রাতে বেশ কিছুটা এগিয়ে চলার পর রথিন আমাকে বললো-" বৌদি আপনি এখানে একটু দাঁড়ান। আমি এখনই আসছি। এই বলে রথিন রাতের অন্ধকারে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরেই দেখি রথিনের সাথে আরো দুজন লোক । তাদের চেহারা দেখে আমার মনে খটকা লাগলো। জিজ্ঞেস করলাম -" রথিন এরা কারা?"
রথিন বললো-" আমারই বন্ধু বান্ধব। চিন্তা কোরো না বৌদি। এরা খুব বিশ্বস্ত।"
আমি আর কোনো কথা বললাম না। এরপর আবার পথ চলতে শুরু করবো ঠিক তখনই রথিন একটা দড়ি নিয়ে এসে পিছন থেকে আমার গলায় ফাঁস দিয়ে ধরলো। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাকি দুজন লোক মিলে আমার হাত পা শক্ত করে ধরে রইলো। সেই নিস্তব্ধ অন্ধকার রাতে সেখানে আমাকে সাহায্য করার মতো কেউই ছিলো না তখন।
আমি প্রাণপণে নিজেকে আর নিজের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য ছটফট করতে লাগলাম। গলায় প্রচণ্ড জোরে ফাঁস পড়ার কারণে আমার চোখ থেকে জলের পরিবর্তে রক্ত বেরিয়ে আসছিলো। চোখের সামনেই আস্তে আস্তে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো তখন। শেষবারের মতো তোমার মুখটাই বার বারৎভেসে উঠছিলো আমার চোখের সামনে । কিন্তু আফসোস তুমিও তখন আমার কাছে ছিলে না।
বেশ কিছুক্ষণ বেঁচে থাকার বৃথা চেষ্টা করার পরেই শরীরটা আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে শুরু করলো। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা করছিলাম বেঁচে থাকার আশায়। কিন্তু না পারলাম নিজেকে বাঁচাতে আর নাতো পারলাম নিজের এই বাচ্চাটাকে যাকে কিনা এখনো পৃথিবীর আলো দেখানোটাই বাকি ছিল। তখন রথিন আর ওর সাথে থাকা সেই দুই খুনী আমাকে খুন করার পর আমার লাশটাকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে থাকা বটগাছের ডালে ঝুলিয়ে দিলো। যাতে সকলের দেখে এটাই মনে হয় যে আমি আত্মহত্যা করেছি।
এরপর পুলিশ আসলো, তদন্ত হলো কিন্তু আত্মহত্যা বলেই কেসটাকে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হলো । আর সেই সাথে সাথে আমার খুনীরাও নিস্তার পেয়ে গেলো।
আমার প্রতি এত বড় অন্যায় হওয়ার পরেও আইন যেখানে তাদের মতো অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে আমি নিজেই নিজের খুনী দের শাস্তি দিতে ফিরে এসেছি।
তোমার কাকা অলোকেশ্বর রায়, তোমার বন্ধু রথীন আর তার দুই সঙ্গীকে তো আমি শাস্তি দিয়েই দিয়েছি , এবার বাকি রইলো তোমার পালা।"
চলবে.....
প্রতারণা (১০ম পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
701
Views
4
Likes
0
Comments
5.0
Rating