নন্দিনী বললো-" কেন তুমি চলে যাবে বলে তোমায় শেষ বিদায় জানাতে কি আসতে পারি না স্টেশনে?"
অশোক কাঁপা কাঁপা গলায় বললো-" কিন্তু নন্দিনী তুমিতো মারা গেছো....।"
এ কথা শুনতেই নন্দিনী এক বিকট অট্টহাসি হেসে বলে উঠলো-" মারা গিয়েছি নাকি মেরে ফেলা হয়েছে অশোক?"
অশোক বাকরুদ্ধ হয়ে ভয়ার্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। এরপর নন্দিনী আবারো বলতে লাগলো-" আমার কি এমন দোষ ছিল বলো তো অশোক! আমিতো তোমায় সত্যিকারেই ভালোবেসেছিলাম। তোমার জন্য নিজের সর্বস্ব তোমাকে সমর্পণ করে দেওয়া সত্ত্বেও তুমি আমার সাথে কেন এমনটা করলে বলতে পারো?
আমি যখন জানতে পারলাম তোমার ভালোবাসা আমার মাঝেই বেড়ে উঠছে তখন সেই আনন্দের খবরটা আমি সবার প্রথমে যাকে জানিয়েছিলাম সেই ব্যক্তিটা ছিলে কেবলই তুমি। একটা মেয়ের কাছে প্রথম মা হতে যাওয়ার অনুভূতিটা কেমন তা কেবল একটা মেয়েই জানে।
যখন আমাকে ভালোই বাসোনি কখনো তাহলে কেনই বা সেদিন এই খবরটা জানার পর আমাকে তুমি মিথ্যা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে অশোক বলতে পারো?
তোমাকে সেদিন যখন এই আনন্দের খবরটা দিলাম তখন তুমিই আমাকে বলেছিলে শহর থেকে দুই মাসের মধ্যে ফিরে এসেই আমাকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দেবে, আমাকে তুমি বিয়ে করে নেবে। কতই না আশা দেখেছিলাম আমি - আমাদের ছোট্ট একটা সংসার হবে । যেখানের সবটাই জুড়ে থাকবো তুমি, আমি আর আমাদের ভালোবাসা।কিন্তু এক মুহুর্তে তুমি সেই সমস্ত আশাটাকেই মেরে ফেললে অশোক! কিন্তু কেন? কি এমন ক্ষতি করেছিলাম আমি তোমার?
আমি তোমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে রইলাম। প্রতি মুহূর্তেই তোমার ফিরে আসার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতাম। কিন্তু সেই তো তুমি ফিরেই এলে তবে এখন অনেকটাই দেরী হয়ে গিয়েছে ।
এইদিকে দিনে দিনে যখন বাচ্চাটা আমার ভিতরেই বড় হতে লাগলো তখন আশেপাশে থাকা পাড়া প্রতিবেশীদের নজর এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। কারণ একটা অবিবাহিত মেয়ে বিয়ের আগেই সন্তান সম্ভবা হলে পুরো সমাজ ঐ মেয়ে আর তার পরিবারকে ঠিক কি চোখে দেখে তা হয়তো তোমার অজানা নয়।
একে একে গ্রামের সকলেই এসে আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করা শুরু করে দিলো। লজ্জায় রাস্তায় বের হতে পারতাম না। এই সমাজ আমার বাবা মা কে একঘরে করে দিয়েছে। আমি তখন আমার অসহায় বাবা মায়ের মুখের দিকে লজ্জায় তাকাতে পারতাম না। খুব ঘৃণা হচ্ছিলো তখন নিজের ওপর। কিন্তু তখনও আমি এই আশা নিয়েই বেঁচে ছিলাম যে তুমি নিশ্চয়ই এসে আমাকে এই অপমানের হাত থেকে বাঁচাবে। কিন্তু আমার ভাবনাকে তুমি ভুল প্রমাণিত করেই ছাড়লে।
এরপর আমাকে নিয়ে গ্রামে সালিশি বসলো। আমাকে নানারকম জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। জানতে চাওয়া হলো - কে এই বাচ্চার বাবা। একটা সময়ে যখন আমি সবটা সত্যি বলে দিলাম তোমার আর আমার ব্যাপারে তখন তোমারই কাকা আমাকে নষ্টা, দুশ্চরিত্রার তকমা লাগিয়ে দিলো। আমাকেসহ আমার পরিবারকে পুরো গ্রামের সামনে অপমান করলো।
গোটা গ্রামের সামনে এই ঘোর অপমান আমার বাবা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি সেদিন রাতেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। সদ্য বাবা হারা হয়ে আমার মাথায় যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। মা আমাকেই দায়ী করতে লাগলেন বাবার মৃত্যুর জন্য। লজ্জায়, অপমান আর ঘৃণায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু তাও পারলাম না। কেন জানো?- কারণ আমার জীবন তখন আর আমার একার ছিল না। আমার সাথে আরো একটা জীবন বেড়ে উঠছিলো তখন।
বাবার মৃত্যুতে গ্রামবাসীদের কেউ আসেনি সেদিন। আমি আর আমার মা ই বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস দেখো- বাবা মারা যাওয়ার দুদিনের মাথাতেই মা ও আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন বাবার কাছে। সদ্য পিতা-মাতা হারা অনাথ হয়ে জীবনের যেন সবথেকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম । যেই সমাজেই বড় হয়ে উঠলাম আজ সেই সমাজেই আমার মতো অনাথিনীর কোনো জায়গা রইলো না। একটা মানুষও এগিয়ে এলো না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।
তুমি শহরে থাকার এই দুই মাসে আমার ওপর দিয়ে ঠিক কি গিয়েছে তা হয়তো তুমি স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না। এরপর বাবা মাকে হারিয়ে যখন তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় একা একা দিন পার করতে লাগলাম তখন গ্রামের বখাটে ছেলে ছোকরা রা আমাকে প্রতিনিয়তই বিরক্ত করা শুরু করলো।
এরপর একদিন যা হলো তা আমি কল্পনাও করিনি কখনো।
চলবে....
প্রতারণা (৯ম পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
660
Views
3
Likes
0
Comments
5.0
Rating