অশোক ঐ দিন রাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরেরদিন জ্ঞান ফিরে পেয়ে নিজেকে নিজেরই রুমে বিছানার ওপরে আবিষ্কার করলো সে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো আশেপাশে, সবটাই স্বভাবিক।
তবে গতকাল রাতের ঘটনা মনে পড়তেই হন্তদন্ত হয়ে লাফিয়ে উঠে বসলো অশোক। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখলো- ঘরে থাকা তার কাকা অলোকেশ্বর রায়ের ছবিটাও সেই একই জায়গায় সাজিয়ে রাখা আছে, যেটা কিনা গতকাল রাতেই তার সামনে দেয়াল থেকে নিজে নিজেই পড়ে গিয়েছিলো।
অশোকের চোখ মুখে তখনও ভয়ের ছাপ বেশ স্পষ্ট ছিল।
অশোকের এমন অবস্থা দেখে অশোকদের বাড়ির সবচেয়ে বৃদ্ধ পরিচারিকা গোপেশ তাকে জিজ্ঞেস করলো-" কি হয়েছে অশোক বাবা? তোমাকে দেখে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। আর গতকাল রাতে তুমি তোমার রুমের বাইরে ফ্লোরের ওপর কিভাবেই বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলে? কাল রাতে এমন কি ঘটেছে - সবটা খুলে বলো তো আমাকে।"
তখন অশোক ভয়ার্ত কন্ঠে তার গোপেশ কাকাকে গতকাল রাতের সবটা খুলে বলতে লাগলো , যার সাক্ষী কিনা ছিল অশোক নিজেই। অশোকের মুখে গতকাল রাতের সবটা শুনে গোপেশ কাকাও তো রীতিমতো অবাক।
সে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারলো না। তখন অশোককে বললো-" দেখো বাবা অশোক, গতকাল তোমার কাকার অকালমৃত্যুর জন্য তুমি হয়তো একটু বেশিই চিন্তিত হয়ে পড়েছো। সে তোমাকে খুব ভালোবাসতো কিনা। তাই হয়তো তুমি তার এভাবে অকালে চলে যাওয়াটাকে মেনে নিতে পারছো না। তাইই তুমি সব জায়গাতেই হয়তো তোমার মৃত কাকাকে দেখতো পাচ্ছো। তাই বলি কি তুমি এখন একটু বাইরে গিয়ে গ্রামটা ঘুরে আসো। দেখবে মনটাও হালকা হবে আর তোমারও বেশ ভালো লাগবে।"
অশোকও তার গোপেশ কাকার কথা মেনে নিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। এরপর সকালের খাওয়া দাওয়া করেই অশোক বেরিয়ে পড়লো গ্রামটা ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে। অনেকদিন পর শহর থেকে গ্রামে এসে বেশ ভালোই লাগছিলো অশোকের। পুরানো বন্ধু বান্ধব আর চিরচেনা পরিবেশের মাঝে এক অদ্ভুত আনন্দ খুঁজে পেলো অশোক।
গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার ছেলেবেলাকার স্মৃতিচারণ করতে লাগলো।
শহর থেকে এতদিন পর গ্রামে আসার পর অশোক দেখলো যে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে কিন্তু গ্রামের সৌন্দর্য সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।
সেদিন অশোকের ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছিলো। একে তো গ্রামের রাস্তা তার ওপরে ঘোর সন্ধ্যা। তাই চারপাশটাও বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাই বাড়ির উদ্দেশ্যেই অশোক রওনা দিচ্ছিলো ঠিক এমন সময় শুনতে পেলো কোনো এক নারী কণ্ঠে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।
ঘোর সন্ধ্যায় গ্রামের এই নির্জন রাস্তায় কারো উপস্থিতি ছিল অশোকের চিন্তা ভাবনার বাইরে। তাই আচমকা কারো আওয়াজ শুনে অশোক একটু ঘাবড়ে গেলো।
পরোক্ষণেই অশোক পিছনে ফিরে যাকে দেখলো এমন এক পরিবেশে তার সাক্ষাৎ পাওয়াটা অশোক কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। অশোক দেখলো তার পিছনে দাঁড়িয়ে যে অজ্ঞাত নারী তার নাম ধরে ডাকছিলো সে আর কেউ নয় স্বয়ং অশোকেরই ছোট বেলাকার বান্ধবী নন্দিনী। অবশ্য শুধু বান্ধবী বললে ভুল হবে। বান্ধবীর থেকেও বেশ গভীর সম্পর্ক ছিল তাদের মাঝে। এমনকি শেষবার যখন তাদের দেখা হয়েছিলো তখন অশোক নন্দিনীকে কথাও দিয়েছিলো যে শহরে যাওয়ার দুই মাস পরেই গ্রামে ফিরে নন্দিনীকে বিয়ে করবে।
তো যাই হোক এমন একটা পরিবেশে নন্দিনীকে দেখে অশোক যেন আকাশ থেকে পড়লো। অশোকের চোখ মুখে ফুটে ওঠা বিস্ময় দেখে নন্দিনী হেসে জিজ্ঞেস করলো -" কি হয়েছে তোমার? আমাকে দেখে কি তুমি খুশি নও। "
অশোক নিজেকে সামলে নিয়েই বললো -" আসলে হঠাৎ করে এভাবে তোমার সাথে দেখা হয়ে যাবে তা ভাবতেও পারিনি। অবশ্য আমি চেয়েছিলাম আজ কালকের মধ্যেই তোমার সাথে দেখা করতে যাবো কিন্তু তার আগেই তো তুমি স্বয়ং এসে আমার সামনে হাজির।"
অশোকের কথা শুনে নন্দিনী মুচকি হাসি হাসলো। আর বললো-" তোমার আসার কথা ছিল কবে আর এই বুঝি তোমার আসার সময় হলো?"
এটা বলেই অশোককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নন্দিনী দৌঁড়ে গিয়ে অশোককে জড়িয়ে ধরলো।
অশোকও নন্দিনীকে জড়িয়ে ধরলো। এরপর নন্দিনী কান্নামাখা স্বরে বলতে লাগলো -"জানো তুমি গ্রাম থেকে যেদিন শহরে চলে গিয়েছিলে সেদিন থেকেই প্রতিটা মুহূর্তে আমি কতটা অসম্ভব যন্ত্রনার মধ্যে কাটিয়েছি। বার বার তোমার কথা মনে পড়ছিলো। ইচ্ছে করছিলো তোমার কাছে ছুটে চলে যাই। কিন্তু তাও তোমার কোনো খোঁজখবর পেলাম না। খুব অভিমান হয়েছিলো যে শহরে যাওয়ার পর একটাবার আমাকে ফোনও করলে না। হয়তো শহরে গিয়ে আমাকে ভুলেই গিয়েছো।"
এবারে অশোক নন্দিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো -" তেমন কোনো ব্যাপার নয়। আসলে শহরে গিয়ে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগছিলো।
হঠাৎ করেই সবকিছুর ব্যস্ততার মাঝে এমনভাবে ফেঁসে গেলাম যে চাইলেও আর হুট করে শহর থেকে গ্রামে চলে আসতে পারিনি। আচ্ছা যাই হোক এখন তো এসে গেছি তাইনা! তাহলে এখন আর অভিমান করে থেকো না।" এই বলে অশোক নন্দিনীর কপালে একটা চুমো দিলো।
নন্দিনীও ততক্ষণে গলে জল। এরপর অশোক বললো-" চলো তোমাকে তোমার বাড়ি অবধি পৌঁছে দেই।" নন্দিনীও অশোকের সাথে পা মেলাতে শুরু করলো। আর চলার পথে দুজনেই বেশ গল্প করছিলো আর হাসছিলো। এদিকে দুজনে মিলে গল্প করতে করতেই যেই তারা তিন রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালো তখন অশোকের ফোনে একটা কল আসলো।
চলবে.....
প্রতারণা (৪র্থ পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
593
Views
3
Likes
0
Comments
5.0
Rating