জানি ঠিকই দেখা হবে (পর্ব-৯)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
জাওয়াদ জানে সাইয়ারাকে কিছু জিঙ্গাসা করলে সে কিছু বলবে না। তাই সামীরকে জিঙ্গাসা করলো এখানে কি হয়েছে। সামীর সাইয়ারার দিকে তাকালে সে ইশারায় বলতে মানা করলো। সাইয়ারার ইশারাটা জাওয়াদেরও নজর এড়ালো না। কিন্তু সামীর সাইয়ারার মানা করার তোয়াক্কা না করে জাওয়াদকে সব বলে দিলো। সবটা শোনার পর জাওয়াদ সাইয়ারাকে ঘরে যেতে বলে নিজেও ঘরে গেলো। মাঝখানে মোবাইলের কথাটা বলার সুযোগ হলো না কারোর। মাজেদা নিজেকে ওড়না দ্বারা আবৃত্ত করে জাওয়াদের জন্য পানি নিয়ে এলো। দৃষ্টি মেঝেতে রেখে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো স্বামীর সামনে। জাওয়াদ মাজেদার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিলো।
- নাটক করতাছো কে?
- কি কন আইন্নে? আমি নাটক করতাম কে?
জাওয়াদ নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে বললো..,
- তুমার বাই বাবি আইছে।
মাজেদা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো।
- খাওয়া-দাওয়া করছে।
মাজেদা পুনরায় হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
- কি দিয়া খাইছে?
- মুরগির ডিম বুনা, হেচি শাক আর ডাইল।
- তা রানছে কেডা?
মাজেদা চোখ তুলে একবার জাওয়াদকে দেখে পুনরায় চোখ নামিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল..,
- আমি রানছি।
জাওয়াদ মাজেদার দিকে ঘুরে বসে বললো..,
- ডিম দিয়া খাওয়াইলা কে? মুরগি রানবার তো পারতা?
- আসলে মুরগি কাইট্টা রানতে অনেক সময় লাগতো আর অনেক খাটনিও অইতো এইল্লেগ্গা রানছি না।
জাওয়াদ চোখ সরিয়ে একটা অবজ্ঞাপূর্ণ হাসি দিয়ে পুনরায় মাজেদার দিকে তাকালো।
- তুমি রানলে সময় লাগে খাটনি লাগে আর ছুডু ছেড়িডা রানলে লাগে না।
মাজেদা চমকে জাওয়াদের দিকে তাকালে তার রক্ত চক্ষু দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তার ইচ্ছা করছে না এই মহিলার সাথে কথা বলতে। তাই সে পরিষ্কার হতে চলে গেলো। মুখ মুছতে মুছতে ঘরে এসে দেখে মাজেদা খাবার নিয়ে বসে আছে। জাওয়াদকে দেখে মাজেদা খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তার প্রস্তুতি উপেক্ষা করে জাওয়াদ গামছাটা মেলে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। এতোক্ষনে সাইয়ারার ঘর থেকে মোবাইল পাওয়ার কথাটা চলে গেছে জামীরের কানে। এই মহৎ কাজটা করেছে জামীরের মা আর বোন। মোবাইলের ব্যাপারটা শোনার পর জামীরের মাথায় র*ক্ত উঠে গেলো। কোনো কিছু না ভেবে সাইয়ারা ঘরে গিয়ে সজোড়ে একটা চড় মারলো। চড় মারার সাথে সাথে সাইয়ারার ঠোট কেঁটে র*ক্ত বের হতে লাগলো। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলে চৌকির কোণায় লেগে মাথা কেঁটে গেলো। সাইয়ারার চোখ খানিকটা অশ্রুশিক্ত হলেও নিমিষেই শুকিয়ে গেলো। সাইয়ারা সামনের দিকে ঘুরে থাকায় তা নিজরে পড়লো না জামীরের। সে চিৎকার করে সাইয়ারাকে বকতে ব্যস্ত। জেবা তাড়াতাড়ি গিয়ে সাইয়ারাকে ধরলো। জাওয়াদ সাইয়ারার ঘরের দিকেই আসছিলো। জামীরের চিৎকার শুনে জাওয়াদ ছুটে এলো তার পিছনে জাভেদও। জাওয়াদ সাইয়ারার সামনে ঘুরে বসে থাকা দেখে কিছু একটা আন্দাজ করলো। জামীর পুনরায় সাইয়ারাকে মারতেই যাচ্ছিলো তার আগেই জাওয়াদ জামীরকে সরানোর জন্য পেছন দিকে টান দিলে জামীর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই জাভেদ ধরে ফেললো। সাইয়ারা ঠিক আছে কিনা দেখতে গেলে তার র*ক্তাক্ত মুখটা দেখে জাওয়াদ নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সোজা গিয়ে জামীরের কলার ধরলো।
- অমানুষ অইয়া গেছস নাকি। কি করছস ছেড়িডার দেখ।
কথাটা বলে কলার ধরে টানতে টানতে সাইয়ারার সামনে নিয়ে গেলো জাওয়াদ। মেয়ের র*ক্তাক্ত মুখটা হয়তো জামীরের রাগ কিছুটা কমালো। কিংবা কিছুটা অনুশোচনা তৈরি করলো তার মধ্যে। পেছন থেকে জালসান বলতে লাগলো।
- মারতো না তে কি করতো এই ছেড়িরে। মাথাত তুইলা রাখতো। কইতে একখান মুবাইল জুগাড় করছে। জিগা তোর বাস্তিরে মুবাইল কইত্তে আনছে।
- মা যেডা জানো না হেইডা লইয়া ছেড়িডার উপরে এইবা অত্যাচার করতাছো। হেরে মুবাইল আমি দিছি। আর আমিই কেউরে কইবার না করছি। এইরুম একটা পরিস্থিতির আন্দাজ আমি করছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতিডা যে এত্তানি খারাপ অইবো হেইডা কল্পনাও করবার পারি নাই। আমি জানতাম তুমরা পুরা দুনিয়ারে বিশ্বাস করলেও এই ছেড়িডারে বিশ্বাস করতানা।
কথাটা শেষ করে জাওয়াদ একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো। তারপর সাবইকে সেখান থেকে চলে যেতে বললো। সবাই চলে যাওয়ার পর জাওয়াদ একটা মলম এনে জেবার হাতে দিলো সাইয়ারার ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেওয়ার জন্য।
- মা রে আমাকে মাফ করে দে। আমি বুঝতে পারিনি তোর সাথে এমনটা হবে।
সাইয়ারা জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে একটা মলিন হাসি দিলো।
- আব্বু তুমি মন খারাপ করো না। এটা আমার জীবনে নতুন কিছু না। এটা তো আমার নিত্য দিনের সঙ্গী।
- তাই বলে তুই কেন এতো সহ্য করবি? অনেক হয়েছে এবার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে তুই আমার সাথে চলে যাবি ওখানের স্কুলে পড়বি।
- এটা হয় না আব্বু।
- কেন হয় না?
সাইয়ারা দৃষ্টি সরিয়ে বাইরের গাছগুলোর দিকে তাকালো।
- আমি এই উঠোনটাকে নিজের মতো করে সাজিয়েছি। এটাই আমার জগৎ। যা একান্ত আমার নিজস্ব। যেখানে কারোর হস্থক্ষেপ চলে না। যে সাম্রাজ্যের রানী আমি। সেই সাম্রাজ্য ছেড়ে আমি কোথায় যাবো বলো তো। শান্তি পাবো কি কোথায় গিয়ে।
সাইয়ারা চোখ ফিরিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকালো।
- জানো আব্বু ওই গাছগুলোকে যখন আমি দেখি নিজের মধ্যে একটা শক্তি অনুভব করি। কত ঝড় জলে কিছুটা নুড়িয়ে পড়লেও উঠে দাড়াতে ভোলে না। তোমার মেয়েটাও তেমন আব্বু। শত ঝড় সহ্য করতে পারে।
জাওয়াদ কিছু বলতে যাবে তার আগে সাইয়ারা বলে উঠলো।
- তোমার মেয়েটা সহ্য করতে পারে দেখে তাকে দুর্বল ভেবো না। তোমার মেয়েটার ধৈর্য ভেঙে গেলে সে সুনামি, ভুমিকম্প সব একসাথে বয়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
জাওয়াদের ফোনটা বেজে ওঠায় সে উঠে চলে গেলো। জেবা সাইয়ারার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো..,
- তুই একটু বিশ্রাম নে।
- এখন বিশ্রাম নিলে কি করে হবে, রাতের রান্না করতে হবে।
জেবা সাইয়ারার মাথা থেকে হাতটা সরিয়ে রাগি দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো।
- সে সব তোকে ভাবতে হবে না। তুই বিশ্রাম নে। আমি সব সামলে নিতে পারবো।
কথাটা বলে জেবা উঠতে গেলে সাইয়ারা জেবাকে হাত ধরে বসিয়ে দিলো।
- না আপু, আমিই করবো। তুমি ঘরে যাও। নইলে তোমার মা আবার আমাকে কথা শোনাবে। তোমার মায়ের অযথা কথা শুনতে আমার ভালো লাগে না।
জেবা সাইয়ারার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো।
- ঠিক আছে তুইয়ি রান্না করিস। কিন্তু কাঁটা-ধোঁয়া আমি করে দেবো।
সাইয়ারা মুচকি একটা হাঁসি দিয়ে তার সম্মতির কথা জানিয়ে দিলো।

জামীর আন্দাল পুকুরের পাড়ে বসে আছে। বারবার তার চোখের সামনে সাইয়ারার র*ক্তাক্ত মুখটা ভেসে উঠছে। নিজেই কষ্ট পাচ্ছে আর বারবার ভাবছে আজকের কাজটা না করলেই ভালো হতো। মেয়েটার প্রতি আরেকটু নরম হওয়া দরকার। কিন্তু যা ঘটে গেছে তা কি আর পাল্টানো যায়। আসল কথা হলো আমরা কোনো কিছু করার আগে বিবেচনা করি না এটা করা কি ঠিক নাকি ঠিক না। কিন্তু কাজটা করার পর যখন মনে হয় কাজটা করা ঠিক হলো না। তখন আফসোস করি কেন এটা করতে গেলাম। করা কাজটা আর পরিবর্তন না করা গেলেও এর আফসোস রয়ে যায় সারাজীবন। খানিকবাদে জামীর নিজেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলো। “এতে তার দোষ কোথায় সাইয়ারা যদি আগেই বলে দিতো তাহলে সে এটা করতো না।” আসলে আমরা মানুষরা নিজের দোষ না দেখে অন্যের দোষ বের করে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ায় পটু। এমনটাই ঘটলো জামীরের সাথে। সে নিজের অন্যায় সাইয়ারার দোষ দিয়ে মিটেয়ে নিতে চাইছে।
চলবে..
529 Views
12 Likes
3 Comments
3.1 Rating
Rate this: