নিঃসঙ্গ বিদায়

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পর্ব ১: নিঃসঙ্গ জীবন

আব্দুল হাকিম ছিলেন একজন বৃদ্ধ মানুষ, জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তার পাশে কেউ ছিল না। একসময় তার বড় সুখী পরিবার ছিল। স্ত্রী, দুই ছেলে, আর মেয়ে নিয়ে তার জীবন ছিল পরিপূর্ণ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, সন্তানরা বড় হয়েছিল, পড়াশোনার জন্য শহরে চলে গিয়েছিল। তারপর তারা আর ফিরে আসেনি। স্ত্রী সালমা বেগম কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছিলেন, তখন থেকেই আব্দুল হাকিম একা।

তার বড় ছেলে রফিক বিদেশে কাজ করে। ছোট ছেলে কামাল শহরে চাকরি নিয়ে সেখানে স্থায়ী হয়েছে। আর একমাত্র মেয়ে রেবা বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে। মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েরা ফোন করলেও, কারও সঙ্গ পাওয়া তার জীবনে খুব দুর্লভ হয়ে উঠেছিল।

পর্ব ২: একাকীত্বের দিনগুলো

আব্দুল হাকিম গ্রামের বাড়িতে একাই থাকতেন। তার দিনগুলো কেমন যেন থমকে গিয়েছিল। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মসজিদে যেতেন, তারপর সারাদিন বাড়িতে একা বসে থাকতেন। একসময় তার পরিবারের হাসি-আনন্দে ভরপুর বাড়িটা এখন শূন্য এবং নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

মাঝেমধ্যে তিনি পাশের গ্রামের বাজারে যেতেন, যেখানে তিনি কিছু পরিচিত মানুষের সাথে
কথা বলতেন। কিন্তু সেসব কথায় আর আগের মতো আনন্দ খুঁজে পেতেন না। তিনি জানতেন, সবাই ব্যস্ত। কারও সময় নেই তার পুরনো গল্প শুনতে। তার মনে হতো, জীবনটা যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি সবসময় তার ছেলেমেয়েদের ফোনের অপেক্ষায় থাকতেন। ফোন এলে তিনি খুব খুশি হতেন, যদিও সেই কথাগুলো খুব সংক্ষিপ্ত হতো।

"বাবা, কেমন আছো?"
"আমি ভালো আছি বাবা, তুমি কেমন আছ?"
"আমি ভালো আছি।"

এই কথা-বার্তা ছাড়া তেমন কিছু হতো না। ছেলে-মেয়েরা হয়তো ব্যস্ত ছিল, কিন্তু আব্দুল হাকিমের মনে হতো, তার জন্য তাদের জীবনে আর কোনো জায়গা নেই।

পর্ব ৩: বৃদ্ধাশ্রমের পথে

একদিন তার ছোট ছেলে কামাল তাকে ফোন করে জানায়, "বাবা, আমি তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে চাই। শহরে বৃদ্ধাশ্রম আছে, তুমি সেখানে থাকলে ভালো হবে। সেখানকার লোকেরা তোমার যত্ন নেবে।"

আব্দুল হাকিম ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। ছেলে হয়তো তার মঙ্গলের কথা ভেবেই এমন প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু তার হৃদয় যেন ভেঙে গেল। তার সন্তান, যাকে তিনি জীবনভর লালন করেছেন, এখন তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে চায়। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "বাবা, আমি এখানেই ভালো আছি।"

কিন্তু ছেলে তার যুক্তি বোঝেনি। তারা মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে বাবা বৃদ্ধাশ্রমে থাকবেন।

পর্ব ৪: শেষ চিঠি

কামাল এবং রফিক মিলে বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে যায়। বৃদ্ধাশ্রমের জীবন ছিল আরও নিঃসঙ্গ। সেখানে অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু কেউ আব্দুল হাকিমের মতো ছিল না। তিনি প্রতিদিনই অপেক্ষা করতেন তার ছেলেদের ফোনের জন্য, কিংবা একবার দেখার জন্য। কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেল, কেউ আর খোঁজ নেয়নি।

একদিন তিনি মেয়েকে একটা চিঠি লেখেন:
"প্রিয় মেয়ে,
তোমাদের ছেড়ে আজ আমি খুব একা। তোমরা সবাই সুখে থাকো, এটাই আমার চাওয়া। জানি, আমি বুড়ো হয়েছি, তোমাদের জীবনের বোঝা হয়েছি। কিন্তু একবার যদি তোমাদের কাউকে দেখতে পেতাম, তাহলে আমার মন শান্তি পেত। অনেক ভালোবাসা রইল। তোমাদের বাবা।"

এই চিঠি শেষ করে আব্দুল হাকিম নিজের হাতের লেখা দেখে একটু হাসলেন। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, এবার হয়তো শেষ বিদায়ের সময় চলে এসেছে।

শেষ: নিঃসঙ্গ বিদায়

কয়েকদিন পর বৃদ্ধাশ্রমের কর্মীরা আব্দুল হাকিমকে তার বিছানায় নিথর অবস্থায় পায়। তার পাশে সেই চিঠিটা পড়ে ছিল, যা মেয়ের কাছে পাঠানোর আগেই তিনি চলে যান। মৃত্যুর আগে তার মুখে এক শান্তির ছাপ ছিল, যেন তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে তার জন্য কেউ আর আসবে না।

সন্তানদের কাছে তিনি বোঝা হয়েছিলেন, কিন্তু তার ভালোবাসা কখনো কমেনি। সেই ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থ ত্যাগ নিয়ে আব্দুল হাকিম একা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। তার মৃত্যুর পর, ছেলেমেয়েরা এসে বাবার শরীরকে শেষবারের মতো স্পর্শ করল, কিন্তু তখন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তারা জানল, এক অসীম ভালোবাসার মানুষকে তারা হারিয়ে ফেলেছে, যার অভাব কখনো পূরণ হবে না।
107 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: