নিঃসঙ্গ পরিবারের কান্না

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পর্ব ১: একান্নবর্তী পরিবার

মনির হোসেন এক সময় গ্রামের বড় জমিদার ছিলেন। তার চার সন্তান—মেহেদি, সোহেল, কনক, এবং আরমান—ও ছিল একটি সুখী পরিবার। পরিবারটি ছিল একসাথে, হাসি-খুশিতে ভরা। মনির হোসেন প্রতিদিন তার সন্তানদের সাথে গল্প করতেন, তাদের জীবনের সমস্ত সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতেন।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিবারের সদস্যদের মাঝে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। মেহেদি এবং সোহেল শহরে চাকরি করতে চলে যায়, কনক বিদেশে পড়াশোনা শুরু করে, আর আরমান গ্রামের জমির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পরিবারের সকলে নিজেদের কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে একে অপরের সাথে যোগাযোগ কমে যেতে থাকে।

পর্ব ২: সোনালী দিনগুলো

মনির হোসেনের স্ত্রী, রেহানা বেগম, তার সমস্ত জীবনের সঙ্গী ছিলেন। তার সাথে ছিল সুখী মুহূর্তের অভাব নেই। কিন্তু একদিন রেহানা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন। মনির হোসেন স্ত্রীর অসুস্থতার কথা ছেলেমেয়েদের জানাননি, কারণ তিনি জানতেন, ছেলেরা খুবই ব্যস্ত।

মনির হোসেন মনে করতেন, রেহানা বেগম সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু সময় চলে যাচ্ছিল, আর রেহানা বেগমের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকল। পরিবারের সবার কাছে ছেলের খবরের অপেক্ষা করে থাকা ছাড়া অন্য কিছু করার ছিল না।

পর্ব ৩: শেষ দিনগুলো

রেহানা বেগমের অবস্থার আরও অবনতি হয়, এবং অবশেষে তার মৃত্যু হয়। মনির হোসেন খুবই দুঃখিত ছিলেন, কিন্তু তিনি সন্তানদের কাছে খবর দেননি, কারণ তিনি চাইতেন না সন্তানরা ব্যস্ত জীবনের বাইরে এসে বাড়িতে ফিরে আসুক। তিনি কবর দেওয়ার পর একা একা বাড়িতে বসে থাকতেন, শুধু স্মৃতির মধ্যে ডুবে থাকতেন।

এদিকে, সন্তানরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত থাকায় তাদের মা’র মৃত্যুর খবর পাননি। মনির হোসেন চেয়েছিলেন, একদিন তারা জানবে এবং অনুভব করবে, তবে কোনো কিছুই ঘটল না। পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ না থাকার কারণে, তারা অনেকদিন ধরেই মনির হোসেনের সাথে যোগাযোগ করেনি।

পর্ব ৪: প্রিয় ছবির সন্ধান

একদিন, কয়েক মাস পর, মনির হোসেন শহরের মেহেদির কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে তিনি জানিয়েছিলেন যে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। মেহেদি যখন চিঠিটি পায়, তখন সে খুবই দুঃখিত হয়। কিন্তু তখনো বুঝতে পারে না কীভাবে এতদিন সঠিক খবর জানানো হয়নি।

মেহেদি দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসে। সে দেখে, তার বাবা একা বসে আছেন, তার মায়ের পুরনো ছবিগুলোর সামনে। বাবার চোখে চোখের জল জমে রয়েছে। মেহেদি বাবার কাছে এসে বসে, তাদের স্মৃতির কথা মনে করে কাঁদতে থাকে।

পর্ব ৫: সন্তানদের ফিরে আসা

মেহেদির ফিরে আসার খবর শুনে, সোহেল, কনক, আরমানও বাড়িতে আসে। সবাই একত্রিত হয়, তাদের মায়ের কবরের পাশে গিয়ে বসে, বাবার পাশে গিয়ে কাঁদতে থাকে। তারা বুঝতে পারে যে তাদের জীবনের ব্যস্ততার কারণে তারা তাদের মায়ের শেষ দিনগুলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

তারা বাবার সাথে কথা বলে, তার অনুভূতিগুলি ভাগ করে নেয়। বাবার সাথে বসে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা ভবিষ্যতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখবে, এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।

শেষ: অপূর্ণ ভালোবাসার মূল্য

সন্তানরা মনির হোসেনের পাশে থেকে তার শেষ বয়সে যত্ন নেয়, কিন্তু তাদের জীবনের এক অমূল্য সময় চলে গেছে। মনির হোসেন মৃত্যুর আগে সন্তানদের কাছে অনুভব করতে পারেন যে, তার পরিবার এখন একসাথে। কিন্তু এই একত্রিত হওয়ার আনন্দ মায়ের অভাব পূরণ করতে পারে না।

মনির হোসেনের বিদায়ের পর, সন্তানরা বুঝতে পারে যে, একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রতিজ্ঞা করে যে ভবিষ্যতে তারা কখনোই এমন ভুল করবে না, যাতে আর কোনো পরিবার এই ধরনের একাকীত্বের সম্মুখীন হয়।
93 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: