পর্ব ১: বাবার স্বপ্ন
রফিক মিয়া ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। ছোট্ট একটি গ্রাম, যেখানে দিনরাত পরিশ্রম করেই তার সংসার চলত। তার জীবনের একমাত্র আশা ছিল তার ছেলে, সজীব। রফিক মিয়া স্বপ্ন দেখতেন, একদিন তার ছেলে বড় হবে, শহরে পড়াশোনা করবে, আর তিনি গর্ব করে সবার কাছে বলবেন, "আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে।"
সজীব ছিল গ্রামের সবচেয়ে মেধাবী ছেলে। সে স্কুলে সবার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করত, আর তার বাবা তাকে নিয়ে সবার কাছে গর্ব করতেন। বাবা প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে ছেলেকে বলতেন, "সজীব, তুই শুধু পড়াশোনা কর, আমি কষ্ট করব তোর জন্য। তুই একদিন অনেক বড় হবি।"
কিন্তু রফিক মিয়ার আয় খুব সামান্য ছিল। কৃষি জমি থেকে যেটুকু আয় হতো, তা দিয়ে তাদের সংসার চালানোই ছিল কষ্টকর। তবুও তিনি ছেলের জন্য কোনো কষ্টের কথা মনে করতেন না। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
পর্ব ২: শহরে যাওয়া
মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর, সজীব শহরের কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু শহরে পড়াশোনা করার খরচ চালানো রফিক মিয়ার পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না। গ্রামের জমিটুকু বেঁচে দিয়ে তিনি ছেলেকে শহরে পড়তে পাঠালেন। রফিক মিয়া জানতেন, জমি বেচে দেওয়া মানে তার জীবনের সম্বলও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎ তার কাছে সবচেয়ে বড়।
সজীব শহরে পড়াশোনা করতে শুরু করল। শহরের ব্যস্ত জীবনে সে নিজেকে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করল। তার মাথায় ছিল একটাই কথা—বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। বাবার প্রতিটি ত্যাগের মূল্য দিতে হবে।
পর্ব ৩: কঠিন দিনগুলো
শহরে পড়াশোনা করতে গিয়ে সজীব বুঝতে পারল, শহরের জীবন অনেক কঠিন। টাকা-পয়সার টানাটানি সবসময় লেগেই থাকত। মাঝে মাঝে কলেজের ফি দেওয়ার জন্য রফিক মিয়া টাকা পাঠাতে পারতেন না। তখন সজীব নিজের খরচ কমিয়ে চলত। অনেক সময় খালি পেটে দিন কাটত। কিন্তু সে কখনো বাবার কাছে অভিযোগ করেনি।
অন্যদিকে, গ্রামে রফিক মিয়া দিনরাত খেটে নিজের জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। জমি বেচার পরও তার জীবন চলছিল খুব কষ্টে। কিন্তু তিনি সবকিছু ভুলে ছেলের ভালো রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকতেন।
প্রতিদিন সন্ধ্যায়, রফিক মিয়া কাঁপা গলায় ছেলেকে ফোন করে বলতেন, "কেমন আছিস বাবা? ঠিকমতো খাচ্ছিস তো?"
সজীব সবসময় হাসিমুখে বলত, "হ্যাঁ বাবা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক আছি।"
পর্ব ৪: বড় দুঃসংবাদ
কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়, হঠাৎ একদিন সজীব খবর পায় যে তার বাবা খুব অসুস্থ। রফিক মিয়া তখন ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। সজীব অবাক হয়ে যায়, কারণ বাবা তাকে কখনো অসুস্থতার কথা বলেননি। সবসময় কষ্টের কথা লুকিয়ে রেখেছেন, যাতে সজীবের পড়াশোনায় কোনো প্রভাব না পড়ে।
সজীব তৎক্ষণাৎ গ্রামে ফিরে আসে। বাড়িতে এসে দেখে, বাবা তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পথে। বাবার চোখে তখনও সেই পুরনো স্বপ্নের আলো। তিনি সজীবকে দেখে ম্লান হাসি দিয়ে বলেন, "তুই অনেক বড় হবি, বাবা। আমার স্বপ্ন পূরণ করিস।"
সজীব বাবার সামনে বসে, তার হাতে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কিন্তু বাবার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না। তিনি শুধু ছেলের সফলতা দেখতে চেয়েছিলেন, যদিও তিনি জানতেন, তার নিজের দিন ফুরিয়ে আসছে।
পর্ব ৫: শেষ বিদায়
রফিক মিয়া সেদিন রাতেই মারা যান। সজীবের কাছে পৃথিবী যেন থেমে গেল। বাবার সব স্বপ্ন, সব আশা, তার ত্যাগ—সবকিছুই তাকে যেন ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। সজীব ভেবে পাচ্ছিল না, কীভাবে সে এতদিন বাবার কষ্টগুলো বুঝতে পারেনি। তার বাবার সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত ভালোবাসা আজ তার চোখের সামনে কেবল স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।
বাবার মৃত্যুর পর, সজীব আরও শক্ত হয়ে পড়াশোনায় মন দেয়। সে জানত, বাবার স্বপ্ন পূরণ করাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাবার কথা মনে করে, তার ত্যাগের কথা স্মরণ করে।
শেষ: অপূর্ণ স্বপ্নের ভার
বছর কয়েক পর, সজীব একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সফলতার দিনে তার পাশে বাবা ছিলেন না। সজীব একা বসে বাবার কথা ভেবে অশ্রুপাত করে। তার বাবার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে, কিন্তু বাবার সেই স্বপ্ন দেখার দিনগুলো আজ আর নেই।
সজীবের মনে একটাই দুঃখ—বাবার সেই গর্বিত মুখ সে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না। বাবার প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি ভালোবাসা সজীবের জীবনে এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।
বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
73
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating