পর্ব ১: জীবনের ছোট্ট সুখ
নাজমা বেগমের জীবনের একমাত্র আশা ছিল তার ছেলে, রাহাত। ছোট্ট গ্রামে থেকে শহরে গিয়ে রাহাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। নাজমা বেগমের স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই, সেই থেকে তিনি একাই ছেলেকে লালন-পালন করেছেন। জীবনে নিজের জন্য কিছু করতে পারেননি, কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তার কাছে একটাই স্বপ্ন—রাহাত একদিন অনেক বড় হবে, সফল হবে, আর তার কষ্টের দিন শেষ হবে।
রাহাত শহরে পড়তে গিয়ে মায়ের কাছে চিঠি লিখত মাঝে মাঝে, যেখানে সে তার নতুন জীবনের গল্প করত। মায়ের প্রতিটি চিঠি পড়ে নাজমা বেগম যেন স্বপ্ন দেখতেন যে একদিন রাহাত বাড়ি ফিরে আসবে, তার কষ্ট দূর হবে।
রাহাতও তার মায়ের জন্য কষ্ট করত। সে প্রতিদিন ভেবেই চলত, কীভাবে সে মাকে সুখী করতে পারবে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে মায়ের জন্য টাকা পাঠাত, যাতে নাজমা বেগমের কিছুটা হলেও ভালোভাবে জীবন কাটে।
পর্ব ২: কঠিন বাস্তবতা
কিন্তু রাহাতের শহরে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই নাজমা বেগমের শরীর খারাপ হতে শুরু করে। বয়সের কারণে তার শরীর ভেঙে পড়ছিল। কিন্তু সে তার ছেলেকে কিছুই জানায়নি, কারণ সে জানত, রাহাত যদি এসব শুনে, তাহলে তার পড়াশোনায় মন বসবে না। তাই প্রতিদিন সে তার অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করত, কিন্তু কখনও ছেলের কাছ থেকে টাকা নিতে চাইত না। সে ভাবত, রাহাতের নিজের জন্য টাকা দরকার।
প্রতিদিন মায়ের শরীর দুর্বল হতে থাকলেও, রাহাত তা বুঝতে পারছিল না। সে তখন পড়াশোনা আর কাজের চাপে ডুবে ছিল। মাঝে মাঝে মায়ের জন্য ফোন করত, মায়ের গলায় ক্লান্তি শুনতে পেয়ে জিজ্ঞেস করত, “মা, তুমি ঠিক আছ তো?”
নাজমা বেগম সবসময় হাসিমুখে বলত, “আমি ভালো আছি, বাবা। তুই পড়াশোনা কর, আমার জন্য চিন্তা করিস না।” কিন্তু তার ভেতরের কষ্টগুলো সে লুকিয়ে রাখত।
পর্ব ৩: প্রতীক্ষা
রাহাতের স্নাতক শেষ হওয়ার সময় চলে আসছিল, আর তার মায়ের শরীর আরও খারাপ হতে শুরু করে। ডাক্তাররা জানিয়েছিল, নাজমা বেগমের হার্টের সমস্যা রয়েছে, এবং দ্রুত চিকিৎসা না করালে তার অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে। কিন্তু নাজমা বেগম জানতেন, তার কাছে এত টাকা নেই যে, চিকিৎসা করাতে পারবেন। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, তিনি এসব ছেলেকে জানাবেন না। তার ছেলের ভবিষ্যৎই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, রাহাত তখন তার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মা তাকে সবসময় সাহস দিতেন, "তুই ভালো রেজাল্ট করবি।" মা’র প্রতি ভালোবাসা আর মায়ের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা রাহাতকে প্রতিদিন শক্তি জোগাত। সে ভাবত, "এই কষ্টের দিন শেষ হবেই।"
পর্ব ৪: মায়ের চিঠি
একদিন, রাহাত হঠাৎ একটা চিঠি পায় তার মায়ের কাছ থেকে। সেই চিঠিতে মা লিখেছেন, "বাবা, আমি হয়তো তোর সব স্বপ্ন দেখতে পারব না। তুই যদি এটা পড়ে থাকিস, তাহলে জেনে নিস, আমি তোর জন্য গর্বিত। আমি তোর সাফল্যের কথা শুনে যেতে চাইতাম, কিন্তু আমার শরীর আমাকে আর সেই সুযোগ দিচ্ছে না।"
চিঠিটা পড়ে রাহাতের হাত থেকে কাগজটা পড়ে যায়। তার মনে হলো, যেন পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়ল। সে দৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে যায়, টিকিট কেটে প্রথম বাসে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু তার মনটা ভীষণ অশান্ত হয়ে ছিল। সে ভাবছিল, কেন সে এতদিন মায়ের কষ্টের কিছু বুঝতে পারেনি।
পর্ব ৫: মায়ের কাছে ফেরা
রাহাত যখন বাড়িতে পৌঁছায়, তখন বাড়ির পরিবেশটা একেবারে অন্যরকম ছিল। বাড়ির দরজায় সবাই চুপচাপ বসে ছিল। নাজমা বেগম তখন ঘরের ভেতরে শুয়ে ছিলেন, নিস্তেজ শরীরে আর কোনো নড়াচড়া নেই। রাহাত মায়ের বিছানার পাশে এসে বসে, মায়ের নিথর হাত ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
মা’কে শেষবারের মতো দেখতে পেয়ে তার হৃদয় ভেঙে পড়ে। মায়ের সেই চিঠির প্রতিটি কথা তার মনের গভীরে গেঁথে যায়। তিনি তার মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, এই মানুষটিই তাকে এত বড় করেছে, নিজের সবকিছু দিয়ে তার ভবিষ্যৎ গড়েছে। কিন্তু আজ, যখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের দিনটা তার মাকে দেখাতে চাইছিল, তখন মা তাকে ছেড়ে চলে গেলেন।
শেষ: অপূর্ণ ইচ্ছা
রাহাত সেদিন জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেল—জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষদের কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। মায়ের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা তাকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। মা চলে গেলেও, তার প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি ভালোবাসার মুহূর্ত, রাহাতের হৃদয়ে গেঁথে রয়ে গেল।
মায়ের চিঠির শেষ লাইনগুলো রাহাতের চোখের সামনে ভাসতে থাকে: "তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব, বাবা। তুই আমার জন্য যা করেছিস, তা কোনো মা চাইলেই পায় না। আমি তোকে ভালোবাসি, সবসময়।"
রাহাতের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। মায়ের প্রতি এই অপূর্ণ ভালোবাসা তাকে সারাজীবন কাঁদিয়ে যাবে। কিন্তু সে জানে, মায়ের আত্মা তার পাশে আছে, তাকে সবসময় সঠিক পথে চালিত করবে।
মায়ের চিঠি
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
99
Views
1
Likes
0
Comments
0.0
Rating